Monday, 3 September 2018

আমার শার্লকিয়ানা ~ সেরা পাঁচ প্যাস্টিশ


লন্ডন, ১৮৯৫। ২২১বি বেকার স্ট্রিটের জানলার বাইরে পাক খাচ্ছে হলদেটে কুয়াশা। ফায়ারপ্লেসের কাছে চেয়ারটা টেনে নিয়ে ল্যান্সেটের পাতায় লন্ডনকে নড়িয়ে দেওয়া সাম্প্রতিক হত্যাকাণ্ডের নির্মোহ বিবরণ পড়ায় মগ্ন ডক্টর ওয়াটসন। ঘরের অন্য বাসিন্দা তখন লম্বা টেবিলে রাখা অসংখ্য শিশি-বোতলের মাঝে ঝুঁকে বকযন্ত্র থেকে ঝরে পড়া তরলটার রঙ-বদলানো খুঁটিয়ে দেখছেন। হঠাৎ রাস্তা থেকে ভেসে এল হইচই আর চিৎকারের শব্দ। পাথরে বাঁধানো পথে ক্লপ-ক্লপ আওয়াজ তুলে এসে দাঁড়াল একটা হ্যানসম। দুমদাম করে দরজা পেটানোর শব্দ এসে পৌঁছল ওপরে, দোতলার এই ঘরেও। ওয়াটসন উৎকর্ণ হয়ে বুঝলেন, মিসেস হাডসন দরজাটা খোলা মাত্র তাঁকে কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সিঁড়ি দিয়ে প্রায় ছুটে আসছে কেউ! ভারী জুতো আর জোরালো নিঃশ্বাসের আওয়াজটা দরজার কাছে এসে একটু থামল।
ঘরের দুই বাসিন্দাই দরজার দিকে তাকালেন। “তোমাকে আমার বোর হওয়া নিয়ে আর ভাবতে হবে না ওয়াটসন।” ব্যঙ্গাত্মক গলাটা ভেসে এল কেমিক্যাল-বোঝাই টেবিলটার দিক থেকে, “কোকেনের চেয়ে ভালো জিনিস এসে গেছে আমার কাছে।” দড়াম করে খুলে গেল দরজাটা। হাঁফ ধরা গলায় বলে উঠলেন নীল পোশাক পরা পুলিশ অফিসারটি, “আর একটা খুন হয়েছে। আপনাকে এখনই একবার আসতে হবে মিস্টার হোমস!”
বাকিটা পড়তে চান?
সখেদে জানাই, দ্য গ্রেট ডিটেকটিভের কোনো ধুঁয়াধার অ্যাডভেঞ্চার আমি লিখতে বসিনি। তবে শার্লক হোমসকে নিয়ে ফিকশন লেখালেখির একটি বিশেষ দিক নিয়েই লেখার জন্য আজকের ব্লগিং।

শার্লক হোমসকে নিয়ে ভক্তদের উন্মাদনা দেখে কিছুটা অসহায় ও অনেকটা ঈর্ষান্বিত হয়ে আর্থার কোনান ডয়েল তাঁকে রাইখেনবাখে ফেলে দিয়েছিলেন। কিন্তু তাতে জনতার হোমস-উন্মাদনা কমেনি। সুধী পাঠক জানেন, লোকজন হাতে কালো রঙের আর্মব্যান্ড পরে হোমসের জন্য শোকজ্ঞাপন তো করেইছিলেন, সঙ্গে ডয়েলকে খুনি তকমাও দিয়েছিলেন! এরপর কী কারণে ও কীভাবে ডয়েল হোমসকে পুনরুজ্জীবিত করেন, সে ইতিহাস অন্য কখনও আলোচনা করা যাবে। আপাতত আসি হোমস-কে নিয়ে লেখালেখির বর্গীকরণে।
কোনান ডয়েল শার্লক হোমসকে নিয়ে মোট ৫৬টি গল্প, এবং চারটি উপন্যাস লিখেছিলেন। প্রথমটি, ‘আ স্টাডি ইন স্কারলেট নামক উপন্যাস, প্রকাশিত হয় ১৮৮৭-র বিটনস ক্রিসমাস অ্যানুয়াল-এ। শেষ গল্প দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ শসকম্ব ওল্ড প্লেস প্রকাশিত হয় স্ট্র্যান্ড পত্রিকার এপ্রিল ১৯২৭ সংখ্যায় ও সংকলিত হয় হোমসকে নিয়ে লেখা ডয়েলের শেষ সংকলন দ্য কেস বুক অফ শার্লক হোমস-এ। হোমসিয়ান বা শার্লকিয়ানরা এই ৬০টি লেখাকে ক্যানন বলে অভিহিত করেন।
কিন্তু, আর্থার কোনান ডয়েলের আরও বেশ কিছু লেখায় এমন চরিত্র এসেছে যাদের নাম হোমস না হলেও চলন-বলন অনেকটাই শার্লক হোমসকে মনে করিয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞরা দাবি করেছেন, এই গল্পগুলো ছিল হোমসকে নিয়ে ডয়েলের মজাকিয়া মনোভাবের প্রকাশ। আগাথা ক্রিস্টিও এমনটা করেছেন কিন্তু মাউজট্র্যাপ-এ, যেখানে একটি নেগেটিভ চরিত্র এরকুল পোয়ারো-র আদলে গড়া!
এক্সট্রাক্যাননিকাল ওয়ার্কস নামে পরিচিত ডয়েলের এই লেখাগুলো হল:
(ক) ১৮৯৬-তে প্রকাশিত দ্য ফিল্ড বাজার’, যাকে হোমসকে নিয়ে লেখা প্রথম প্যারডি বলা চলে;
(খ) ১৮৯৮-এ প্রকাশিত দ্য লস্ট স্পেশাল’;
(গ) ১৮৯৮-তেই প্রকাশিত দ্য ম্যান উইথ দ্য ওয়াচেস’;
(ঘ) রানি মেরি-র পুতুলবাড়ি (ডলস হাউস)-র লাইব্রেরিতে রাখার জন্য সেই সময়ের সেরা ব্রিটিশ সাহিত্যিকেরা অনেকেই এক-একটি ক্ষুদ্র বইয়ে পূর্ণাঙ্গ কাহিনি লিখে দিয়েছিলেন (চিরঞ্জীৎ সেখান থেকে পয়েন্ট ব্রাভো-র আইডিয়া পায়নি তো? ভাববার বিষয়!)। ডয়েলও সেই উপলক্ষে একটি বই লেখেন। বইটি দ্য ফিল্ড বাজার-এর মতোই একটি প্যারডি, নাম হাউ ওয়াটসন লার্নড দ্য ট্রিক
(ঙ) ১৮৮৯-তে লেখা নাটক এঞ্জেলস অফ ডার্কনেস’, যা আদতে আ স্টাডি ইন স্কারলেট-এর মার্কিন অধ্যায়গুলোর ভিন্নতর, হোমসবর্জিত কিন্তু ওয়াটসন-সমৃদ্ধ, আরও বেশি রঙ-চড়ানো রূপ, এবং যেটি ২০০০ অবধি চেপে রাখা হয়েছিল!
(চ) ১৯০২-এ লেখা নাটক দ্য স্টোনার কেস’, যা আদতে ফেব্রুয়ারি ১৮৯২-এ প্রকাশিত গল্প দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য স্পেকলড ব্যান্ড-এর কিছুটা ভিন্নতর রূপ।
(ছ) ১৯২১-এ লেখা নাটক দ্য ক্রাউন ডায়মন্ড’, যা দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য মাজারিন স্টোন-এর চেহারা নিয়ে স্ট্র্যান্ড পত্রিকা, অক্টোবর ১৯২১-এ আত্মপ্রকাশ করে।
(জ) ১৯২৩ সালে ডয়েল দ্য রিটার্ন অফ শার্লক হোমস নামে আরেকটি নাটক লেখেন, যাতে তিনি দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য এম্পটি হাউস’, ‘দ্য ডিস্যাপিয়ারেন্স অফ লেডি ফ্রান্সিস কারফ্যাক্স’, ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ চার্লস অগাস্টাস মিলভার্টন’, এবং দ্য রেড-হেডেড লিগ থেকে মালমশলা নিয়েছিলেন।

ডয়েল যে হোমস-কে নিয়ে খুব একটা সিরিয়াস ছিলেন না, এটা সবচেয়ে আগে বুঝেছিলেন বিশ্ববিখ্যাত নাট্যকার ও অভিনেতা উইলিয়াম জিলেট। ডয়েলের অনুমতি এবং সাহায্য নিয়ে ১৮৯৯ সালে শার্লক হোমস: আ ড্রামা ইন ফোর অ্যাক্টস নামক নাটকটি লিখতে ও মঞ্চস্থ করতে গিয়ে (এই প্রসঙ্গে আবার ক্রিস্টির লেখা নাটক মাউসট্র্যাপ-এর কথা বলতে হচ্ছে। শুধু ওটিই যে বহু-বহু বছর চলেছিল তাই নয়, জিলেটের লেখা নাটকটিও ইতিহাস তৈরি করেছিল জনপ্রিয়তার দিক দিয়ে।) জিলেট জানতে চান, নাটকে হোমসের বিয়ে দেওয়ানো যাবে কি না। ডয়েলের উত্তর ছিল, হোমসকে নিয়ে যা-খুশি-তাই করাতে পারেন জিলেট, এমনকি হোমসকে খুন করালেও ডয়েল নাকি অখুশি হতেন না! ফলে আ স্টাডি ইন স্কারলেট’, ‘দ্য সাইন অফ ফোর’, ‘আ স্ক্যান্ডাল ইন বোহেমিয়া’, ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য এম্পটি হাউস’, ‘দ্য বসকম্ব ভ্যালি মিস্ট্রি’, ‘দ্য গ্রিক ইন্টারপ্রেটর’, ‘দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য নাভাল ট্রিটি’, এসব কাহিনি থেকে প্লটের অংশবিশেষ নেওয়ার পাশাপাশি জিলেট সম্পূর্ণ নিজের মতো করে অনেক কিছু জুড়েছিলেন। আর হ্যাঁ, ক্যাননের ৬০টি লেখায় না থাকলেও ওই নাটকের সৌজন্যে তিনটি জিনিস আমাদের মাথায় পাকাপাকি গেঁথে গেছে:
১] হোমসের ক্যালাবাশ পাইপ। ক্যাননে হোমস সবচেয়ে বেশি করে যে পাইপের সাহায্যে ধূমপান করেছেন সেটি হল ক্লে পাইপ (৬টি গল্পে), তারপরেই এসেছে ব্রায়ার পাইপ (৪টি গল্পে), চেরি-উড পাইপ (১টি গল্পে) । কিন্তু এই নাটকে যাতে সবচেয়ে দূরে বসা দর্শকও হোমসের মুখে পাইপটি দেখতে পান, সেজন্য জিলেট নিজের মুখে বসিয়ে নেন এই বিশেষ বাঁকা পাইপটি।
২] ঘরের মধ্যেও ডিয়ারস্টকার হ্যাট পরে থাকা।
৩] “এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার ওয়াটসন”! আজ্ঞে হ্যাঁ, গোটা ক্যাননে কোথাও এই লাইনটি লেখেননি স্যার আর্থার কোনান ডয়েল, কিন্তু এখন আমরা হোমস বলতেই এটা ভাবি, তাই না?
১৯০৫-এ জিলেট তাঁর অন্য একটি নাটকের আগে কার্টেন-রেইজার হিসেবে পরিবেশনযোগ্য একটি কমেডি লেখেন। দ্য পেইনফুল প্রেডিকামেন্ট নামক সেই ক্ষুদ্র নাটিকাটি দর্শকের প্রশংসা পায়। এই সাফল্য দেখে উৎসাহিত, অথচ ব্রিটিশ আইনকানুন সম্পর্কে ভীত এক উদ্যোগী লেখক অনামা থেকেই ১৯১৩-তে গ্রিক হেলাস পত্রিকায় শার্লক হোমস সেভিং মিস্টার ভেনিজেলোস নামক একটি গ্রিক ভাষায় লেখা উপন্যাস ধারাবাহিকভাবে প্রকাশ করেন।
আর এইভাবেই শুরু হয় ডয়েল ছাড়া অন্যান্য লেখকদের হোমসকে নিয়ে গল্প-উপন্যাস লেখা, যাকে আমরা প্যাস্টিশ (pastiche) নামক একটি আলাদা গোত্রে ফেলি। ১৯১৪ সালেই অ্যালফ্রেড হুইটেকার নামের এক ভদ্রলোক “দ্য কেস অফ দ্য ম্যান হু ওয়াজ ওয়ান্টেড” নামে একটি প্যাস্টিশ লিখে ডয়েলকে পাঠান। সেটা ডয়েলের এতই ভালো লাগে যে তিনি সেটি কিনে নেন ভবিষ্যতে ব্যবহারের জন্য! ডয়েলের মৃত্যুর পর যখন প্রকাশকদের মধ্যে অপ্রকাশিত হোমস-এর জন্য উন্মাদনা বেড়ে চলেছে, তখন তাঁর কাগজপত্রে এই লেখাটি পাওয়া যায়, এবং তুলকালাম হয়। অনেক পরে শার্লকিয়ান হেসকেথ পিয়ারসন মূল লেখককে চিহ্নিত করায় এটি প্যাস্টিশ হিসেবেই শেষ অবধি স্বীকৃতি পায়।
আমার আজকের পোস্ট, আমার মতে, সেরা পাঁচ হোমস প্যাস্টিশ নিয়ে।

১৯৪৪ সালে এলেরি কুইন-এর সম্পাদনায় প্রকাশিত হয় হোমসকে নিয়ে লেখা তিরিশটিরও বেশি প্যারডি কাহিনির সংকলনদ্য মিসঅ্যাডভেঞ্চার্স অফ শার্লক হোমস। পাঠক বইটি তখন, ও এখন যথেষ্ট উপভোগ করলেও কোনান ডয়েলের উত্তরাধিকারীরা ব্যাপারটা মোটেই ভালোভাবে নেননি। তাঁদের তরফে আরোপিত কপিরাইট-জড়িত আইনি বিধিনিষেধের ফলে হোমসকে নিয়ে প্যাস্টিশ লেখাটা বে-আইনি হয়ে যায়। এর পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৪৫-এ কোনান ডয়েলের অথরাইজড বায়োগ্রাফি লেখার জন্য ডয়েল এস্টেট লকড রুম মিস্ট্রি-র জগতে প্রায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী লেখক জন ডিকসন কার-এর সঙ্গে চুক্তি করে। এই কাজটি করতে গিয়ে কোনান ডয়েলের ছেলে অ্যাড্রিয়ান কোনান ডয়েল ঠিক করেন, ‘নতুন হোমস কাহিনি-র জন্য পাঠকদের মধ্যে থাকা এমন চাহিদার ফায়দা ডয়েল এস্টেটেরই তোলা উচিত। ফলে তাঁর ও জন ডিকসন কার-এর, কিঞ্চিৎ অস্বস্তিকর কোলাবরেশনের ফসল হয়ে এরপর লাইফ পত্রিকায় একটি,কোলিয়ারস ম্যাগাজিন-এ এগারোটি প্যাস্টিশ প্রকাশিত হয়। এই প্যাস্টিশগুলোর মাধ্যমেই শুরু হয় ক্যাননে উল্লিখিত হোমসের নানা অগ্রন্থিতঘটনা নিয়ে গল্প লেখার ধারাটি। ১৯৫৪-তে এই এক ডজন প্যাস্টিশ সংকলিত হয় “দ্য এক্সপ্লয়েটস অফ শার্লক হোমস” নামে। বইটি তখন পাঠক বা সমালোকচকদের অনুগ্রহ পায়নি। তবে এখনকার সহনশীল পাঠকেরা এই বইটিকে শুধু ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকেই নয়, বরং পাঠযোগ্যতার দিক দিয়েও সরেস বলে মনে করেন। তাই আমার প্রথম বই এটিই।
এতে থাকা গল্পগুলো হল:
(১) দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য সেভেন ক্লক্স;
(২) দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য গোল্ড হান্টার;
(৩) দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ওয়্যাক্স গ্যাম্বলার্স;
(৪) দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য হাইগেট মির‍্যাকল;
(৫) দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ব্ল্যাক ব্যারনেট;
(৬) দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য সিলড রুম;
(৭) দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ফোকস রথ;
(৮) দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য আব্বাস রুবি;
(৯) দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ডার্ক এঞ্জেলস’;
(১০) দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য টু উইমেন;
(১১) দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য ডেপ্টফোর্ড হরর;
(১২) দ্য অ্যাডভেঞ্চার অফ দ্য রেড উইডো।
অদ্রীশ বর্ধন এই গল্পগুলো বাংলায় অনুবাদ করেছিলেন। কিন্তু এখন আর তাদের...!

শার্লক হোমসকে নিয়ে নতুন গল্প লেখাটা সমস্যা তৈরি করলেও ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৬-এর মধ্যে বেসিল রথবোন-কে হোমস, এবং নাইজেল ব্রুস-কে ডক্টর ওয়াটসন বানিয়ে যে ১৪টি সিনেমা তৈরি হয়, তাদের সঙ্গে ডয়েলের মূল লেখার সম্পর্ক ছিল খুবই সামান্য, বা ছিলই না। ১৯৬৫ সালে এই ধারাতেই হলিউড আনে জেমস হিল পরিচালিত, জন নেভিল ও ডোনাল্ড হিউস্টন অভিনীত সিনেমা আ স্টাডি ইন টেরর। হোমসের দ্বারা জ্যাক দ্য রিপার চিহ্নিত হওয়া নিয়ে প্রথম সিনেমা এটিই। যাঁরা সিনেমাটি দেখেননি তাঁদের সনির্বন্ধ অনুরোধ করব সেটি দেখে নিতে। তবে আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কাজ করে এই সিনেমাটি। ১৯৬৬-তে প্রকাশিত এর সমনামী নভেলাইজেশন-এ ফ্রেমিং ডিভাইস হিসেবে আসে এই সময়ে এলেরি কুইনের একটি অ্যাডভেঞ্চার, আর তার সমান্তরালে চলতে থাকে পল.ডব্লিউ. ফেয়ারম্যান-এর লেখায় ১৮৮৯-এর লন্ডনে জ্যাক দ্য রিপারের পিছু নেওয়া শার্লক হোমসের একটি অ্যাডভেঞ্চার! আমার দ্বিতীয় বাছাই এই টু-ইন-ওয়ান প্যাস্টিশটি, যাতে হোমস ও এলেরি কুইন, দুজনেরই বুদ্ধির ঝলক দেখার সুযোগ মেলে।

শার্লক হোমসকে নিয়ে লেখার ক্ষেত্রে বাঁধ ভেঙে দাও এফেক্টের জন্য যদি কাউকে ধরতে হয়, তাহলে তিনি হলেন ফিল্মমেকার ও নভেলিস্ট নিকোলাস মেয়ার। ১৯৭৪ সালে মেয়ার লেখেন একটি উপন্যাস, যার নাম~ “দ্য সেভেন পার্সেন্ট সলিউশন: বিইং আ রিপ্রিন্ট ফ্রম দ্য রেমিনিসেন্সেস অফ জন এইচ ওয়াটসন, এম.ডি”।
সিগমুন্ড ফ্রয়েডের সাহায্য নিয়ে হোমসের কোকেনের নেশা কাটানো, হোমসের ছোটোবেলার এক অন্ধকার অধ্যায় ও তার মরিয়ার্টি-ফিক্সেশনের আসল কারণ উন্মোচন, চলন্ত ট্রেনের ছাদে অ্যাকশনের মাধ্যমে হোমসের ইউরোপীয় যুদ্ধ ঘটাতে চলা ভিলেইনদের পরাস্ত করা... এইসব মণিমুক্তোয় ঠাসা এই বইটির জন্য প্রতিক্রিয়া আজকের ফেসবুকীয় পাঠকের পরিভাষায় একটিই মাত্র শব্দে ব্যক্ত করা চলে: চুমু! স্বাভাবিকভাবেই আমার তৃতীয় পছন্দের বই এটিই। এটি নিয়ে ১৯৭৬ সালে হলিউড একটি সিনেমাও বানায়, তবে সেটার কপালে চন্দনের বদলে আধলাই জুটেছে বেশি। এই উপন্যাসের পর মেয়ার আরও দুটি উপন্যাস লেখেন, যেগুলো আমার কাছে মাঝারি স্তরের মনে হয়েছে। কিন্তু তাঁকে দেখে এরপর এমন কিছু প্যাস্টিশ লেখা হয় যার মধ্যে অসম্ভব খারাপ, ও অসম্ভব ভালো, এই দুই-ই আছে।

১৯৭৯ সালে মাইকেল ডিবডিন লেখেন তাঁর বিস্ফোরক, চরম বিতর্কিত প্যাস্টিশ দ্য লাস্ট শার্লক হোমস স্টোরি। এই বইটির ছত্রে-ছত্রে ছড়িয়ে আছে জ্যাক দ্য রিপার, মরিয়ার্টি, এবং অবশ্যই শার্লক হোমস। অত্যন্ত সুলিখিত, এবং দারুণভাবে ডয়েলের লেখার ধরন অনুসরণ করেও স্তম্ভিত করে দেওয়া এক অনিঃশেষ অন্ধকারের গল্প এটি। 
পোস্ট-মডার্ন ডি-কনস্ট্রাকশন বা অবিনির্মাণ তত্ত্বের উদাহরণ হিসেবে এই বইটি নিয়ে একদা দেশ-এ আলোচনা করেছিলেন গৌতম ভদ্র, এবং আমিও তাঁর সঙ্গে একমত। অবিস্মরণীয়, রিপার ও হোমসের কথা একসঙ্গে ভাবলেই ভাবতে বাধ্য হওয়া এই উপন্যাসটিকে নিজের পছন্দের প্যাস্টিশের তালিকায় চার নম্বর হিসেবে রাখলেও এটি আমি অবশ্যপাঠ্য হিসেবে রেকমেন্ড করব না।
হোমস-বনাম-রিপার নিয়ে এরপর লেখা, এবং পাঠক ও সমালোচকের দ্বারা বিপুলভাবে প্রশংসিত বই হল ২০০৯-এ প্রকাশিত লিন্ডসে ফে-র লেখা “ডাস্ট অ্যান্ড শ্যাডো: অ্যান অ্যাকাউন্ট অফ দ্য রিপার কিলিংস বাই ডক্টর জন এইচ ওয়াটসন”। বরং এই বইটিকে, হে পাঠক, যদি জোগাড় করতে পারেন, তাহলে অবশ্যই পড়বেন। আর হ্যাঁ, সঙ্গে দেখে নেবেন ১৯৭৯-তে বানানো ক্রিস্টোফার পামার ও জেমস ম্যাসন অভিনীত ব্রিটিশ-ক্যানাডিয়ান ফিল্ম মার্ডার বাই ডিক্রি। এই সিনেমাটি স্টিফেন নাইটের রিপার সংক্রান্ত তত্ত্ব মেনে বানানো হয়েছিল।

২০১১ সালে কোনান ডয়েল এস্টেট তাদের ইতিহাসে প্রথমবার ডয়েলছাড়া অন্য কারও লেখা প্যাস্টিশকে অনুমোদন দেয়। ইয়ং অ্যাডল্ট হরর ও মিস্ট্রি লেখার জন্য বিখ্যাত অ্যান্থনি হরোউইৎজ লেখেন “দ্য হাউজ অফ সিল্ক”। একেবারে খাঁটি কোনান ডয়েলের মতো করে শুরু হয় এই গল্পটি। চরিত্রদের সঙ্গে পরিচয় হয় আমাদের। হোমসের কাছে একটি সমস্যা নিয়ে আগমন হয় একজনের...
আর এরপরেই গল্পটা সাংঘাতিক দিকে বাঁক নেয়!
একটি বিশেষ বাড়ির ওপর নজর দেওয়ার জন্য মোতায়েন হওয়া হোমসের নিজস্ব খবরি বাহিনী তথা বেকার স্ট্রিট ইররেগুলার্স-এর এক সদস্য নৃশংসভাবে খুন হয়। খুনের দায়ে ফেঁসে হোমসের ঠাঁই হয় জেলে! এবং এই সবকিছুর পেছনে ফিসফিস করে উঠে আসে যে নামটা তা হল দ্য হাউজ অফ সিল্ক!
তারপর কী হল?
এই গল্প ডয়েল লিখতেন না। লিখতে পারতেন না বলব না, কারণ মানুষটি জীবনের অন্ধকার দিকের সঙ্গেও যে সবিশেষ পরিচিত ছিলেন, তা আমরা জানি। কিন্তু এই কাহিনির ক্রূরতা, এবং এর কেন্দ্রে থাকা অপরাধের প্রকৃতি তিনি কাগজে ফুটিয়ে তুলতেন না কিছুতেই!
এর সেজন্যই আমি এই বইটিকে অবশ্যপাঠ্য বলব। দ্য গ্রেট ডিটেকটিভযে শুধুই ভূতুড়ে কুকুর, দড়ি বেয়ে নামা সাপ, বা বনেদি চোর-ডাকাত নয়, বরং আমাদের মধ্যে লুকিয়ে থাকা ভয়ংকরতম অন্ধকারের মোকাবিলাও করতে পারেন, তা জানার জন্যই এই বইটা পড়বেন। প্লিজ।

কিন্তু, লাস্ট বাট নট দ্য লিস্ট, যে লেখাটির কথা এতক্ষণ আমি উল্লেখ করিনি সেটির প্রসঙ্গে পান পরাগ-এর সেই কিংবদন্তি বিজ্ঞাপনে শম্মি কাপুরের মতো বলতে হয়, “হাম তো আসলি বাত কহনা ভুলহি গয়েঁ!”
সেটা কী?
আমার মতে, হোমসকে নিয়ে লেখা সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ প্যাস্টিশ কোনো নভেল নয়, বরং একটি গল্প। সেও এমন এক গল্প, যার কোথাও হোমসের নাম নেই। কিন্তু যে গল্পটা পড়ার পর হোমস, মরিয়ার্টি, ইতিহাস, লাভক্র্যাফটের থুলু মিথোস, এগুলোকে আপনি নতুন চোখে দেখতে ও পড়তে বাধ্য হবেন। সেই লেখাটির নাম: “আ স্টাডি ইন ইমার‍্যাল্ড”, লেখক নিল গেইম্যান (যাঁকে আমেরিকান গডস, কোরালিন, দ্য গ্রেভইয়ার্ড বুক, স্টারডাস্ট ইত্যাদির রচয়িতা হিসেবে আপনি নিশ্চয় চেনেন।)।
২০০৪ সালে এই গল্পটি প্রকাশিত হয় শ্যাডোজ ওভার বেকার স্ট্রিট সংকলনে। অতঃপর আসে ২০০৪-এর হিউগো ও ২০০৫-এর লোকাস পুরস্কার, প্রশংসার প্লাবন, ইত্যাদি ইত্যাদি। এখনও পর্যন্ত ঠিক কটি সংকলনে এই গল্পটা স্থান পেয়েছে, জানি না। শুধু আমার কাছেই থাকা গোটা পাঁচেক বইয়ে এটা আছে, এবং আশঙ্কা হচ্ছে রবার্ট ব্লকের চিরকালীন ক্লাসিক “ইওর্স ট্রুলি, জ্যাক দ্য রিপার”-এর মতো এটাও গোটা পঞ্চাশেক সংকলনে জায়গা পাবে! এটি নিয়ে একটি মন-ধাঁধানো গ্রাফিক নভেল প্রকাশ করেছে ডার্ক হর্স কমিক্স
আমি প্রস্তাব করব, এই গ্রাফিক নভেলটি, বা গেইম্যান-এর অসামান্য গল্প-সংকলন ফ্রেজাইল থিংস জোগাড় করে এই গল্পটি পড়ে নিন। আর শুধু এটা নয়, শার্লক হোমসের এই পাঁচটি প্যাস্টিশই অবিলম্বে পড়ে ফেলার আহ্বান তথা অনুরোধ জানিয়ে আজকের মতো বিদায় নিচ্ছি।
নমস্কার।

Saturday, 1 September 2018

চোখের বাহিরে

'সেজ' নামক সুবিখ্যাত জার্নালের নভেম্বর ২০১৭ সংখ্যায় বুধাদিত্য চট্টোপাধ্যায় লিখেছেন, "We believe in the constructed world when resonance of the site reverberates in our ears and to our sonic sensibilities even long after the medial experience."
চলচ্চিত্রের আসল কথাটি সম্ভবত ধরা পড়েছে এই একটি লাইনেই, যেখানে দৃশ্যরা ফুরিয়ে গিয়েও শব্দের সৌজন্যে জেগে থাকে বন্ধ চোখের অন্ধকারে। এভাবে জিনিসটা আগে সেভাবে ভাবিনি, কিন্তু কাল রাতে কন্যার সৌজন্যে এটা হাড়ে-হাড়ে টের পেলাম।
কেন?

রাতে খাওয়ার শেষে, যখন পরিবারের দণ্ডমুণ্ডের কর্ত্রী টেবিল ত্যাগ করে টিভি বা মোবাইলে মনোনিবেশ করেন, তখন আঙুল ও থালা চাটায় মগ্ন আমি ও কন্যা দুনিয়ার নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা করি। আমাকে শুনতে হয় জাস্টিন বিবারের মুণ্ডপাত, বেনেডিক্ট কামবারবাচ কী অ...সাম, বিটিএস (একটি কোরিয়ান পপ গ্রুপ)-এর ছেলেগুলো কী কিউট, স্কুলে ক্লাসে কে কাকে কাগজের ফালি পাচার করতে গিয়ে টিচারের হাতে ধরা পড়েছে, ক্যাপ্টেন অ্যামেরিকার কী শেষ অবধি কারও সঙ্গে বিয়ে হবে... ইত্যাদি। মেয়েকে হজম করতে হয় উপনিষদের তত্ত্ব নিয়ে থ্রিলার লেখার সমস্যা, হতভাগা প্রকাশকেরা কেন আমার গল্পগুলো বই করার যোগ্য বলে মনে করছে না সেই নিয়ে চাপ, অফিসের খাজা দশা... ইত্যাদি।
কাল রাতে মেয়ে বলল, তাদের স্কুলের হবি ক্লাসের অংশ হিসেবে সে ও তার বন্ধু মিলে 'মণিহারা' পড়ছিল। লাইব্রেরির বইটি বড়ো ফন্টে ছাপা বলে "সেই জীর্ণপ্রায় বাঁধাঘাটের ধারে আমার বোট লাগানো ছিল।" থেকে "আমি কহিলাম, 'নৃত্যকালী।'" অবধি তারা পড়ে ফেলেছে, কিন্তু কিছুই বোঝেনি! আমি যারপরনাই রুষ্ট হলাম। ভাবলাম, রচনাবলি নামিয়ে গল্পটা ওকে আবার পড়াই। তারপর বুদ্ধি গজাল। বললাম, "বুঝতে গেলে দেখতে হবে। এক ঠাউরের লেখা ঠাওরাতে হলে আরেক গ্রেটের কাজ দেখতে হবে। তুই রেডি?"

তাহার মাতা সম্মুখস্থ বৈদ্যুতিন পর্দায় কোনো হতভাগ্যের ক্রন্দন দেখিবার ও শুনিবার অবসরে বার্তালাপও চালু রাখিয়াছিলেন। ইত্যবসরে আমরা ইউটিউবে প্রবেশ করিলাম, এবং অর্ধশতবর্ষাধিক প্রাচীন চলচ্চিত্রটি দেখিতে লাগিলাম। তিন কন্যার কাহিনির মধ্যভাগের অংশটিতেই মনোনিবেশ করিলাম। ক্রমে সেই অংশটি আসিল যেখানে:
"তখন ফণিভূষণ চোখ মেলিল এবং দেখিল, ঘরে নবোদিত দশমীর চন্দ্রালোক আসিয়া প্রবেশ করিয়াছে, এবং তাহার চৌকির ঠিক সম্মুখে একটি কঙ্কাল দাঁড়াইয়া। সেই কঙ্কালের আট আঙুলে আংটি, করতলে রতনচক্র, প্রকোষ্ঠে বালা, বাহুতে বাজুবন্ধ, গলায় কণ্ঠি, মাথায় সিঁথি, তাহার আপাদমস্তকে অস্থিতে অস্থিতে এক-একটি আভরণ সোনায় হীরায় ঝক্‌ঝক্‌ করিতেছে। অলংকারগুলি ঢিলা, ঢল্‌ঢল্‌ করিতেছে, কিন্তু অঙ্গ হইতে খসিয়া পড়িতেছে না। সর্বাপেক্ষা ভয়ংকর, তাহার অস্থিময় মুখে তাহার দুই চক্ষু ছিল সজীব; সেই কালো তারা, সেই ঘনদীর্ঘ পক্ষ্ম, সেই সজল উজ্জ্বলতা, সেই অবিচলিত দৃঢ়শান্তি দৃষ্টি। আজ আঠারো বৎসর পূর্বে একদিন আলোকিত সভাগৃহে নহবতের সাহানা-আলাপের মধ্যে ফণিভূষণ যে দুটি আয়ত সুন্দর কালো-কালো ঢলঢল চোখ শুভদৃষ্টিতে প্রথম দেখিয়াছিল সেই দুটি চক্ষুই আজ শ্রাবণের অর্ধরাত্রে কৃষ্ণপক্ষ দশমীর চন্দ্রকিরণে দেখিল, দেখিয়া তাহার সর্বশরীরের রক্ত হিম হইয়া আসিল। প্রাণপণে দুই চক্ষু বুজিতে চেষ্টা করিল, কিছুতেই পারিল না; তাহার চক্ষু মৃত মানুষের চক্ষুর মতো নির্নিমেষ চাহিয়া রহিল।"

ইন্টারেস্টিং ব্যাপার কী জানেন? এই বর্ণনা, বা পর্দায় দেখা জমাট ছায়া, এমনকি হাড়ের হাত দিয়ে বাক্সটা আঁকড়ে ধরার চেষ্টা, এসবে আমার মেয়ে ভয় পায়নি। কিন্তু পেছনে বেজে চলা সেই অদ্ভুত সুরটা (মণিমালিকা-র থিম), গল্পের শুরুতে স্কুলমাস্টারের ঘাটে এসে বসার সময় হাওয়ার শব্দ, সর্বোপরি ফণীভূষণের ভূমিকায় কালী ব্যানার্জির অপেক্ষার সময় পটভূমিতে বেজে চলা ধিকি-ধিকি বাজনা (দ্যাট ফেটফুল নাইট), এগুলো তাকে মারাত্মক ভয় দেখায়। রাতে শোয়ার পর ফ্যানের হাওয়ায় পরদার নড়াচড়া, শ্রীমতীর হাতের চুড়ির আলগা আওয়াজ, এমনকি এসি-র চলা-বন্ধ হওয়ার যে শব্দগুলো সে কখনও খেয়াল করেনি সেগুলোও কাল রাতে মণিহারার সেই সন্ধিক্ষণটি তার কাছে বারবার ফুটিয়ে তুলছিল।
তার চেয়েও ভালো জিনিস কী জানেন? যা একেবারে সুধারস হয়ে কানের ভিতর দিয়া মরমে পশিল?
"বাবা, রবীন্দ্রনাথ এরকম গল্প আরও লিখেছেন? আমাকে পড়তে দেবে?"
জয় বাবা সত্যজিতের চরণে সেবা লাগে বাবা!

Monday, 27 August 2018

কেউ কি আছেন? #১


উচ্চ মাধ্যমিকে সরকারি ইংরেজি বইয়ে একটা কবিতা ছিল। কবিতাটা পড়েননি এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। তবু লোভ সামলাতে না পেরে তুলেই দিলাম আরেকবার:
‘Is there anybody there?’ said the Traveller,
Knocking on the moonlit door;
And his horse in the silence champed the grasses
Of the forest’s ferny floor:
And a bird flew up out of the turret,
Above the Traveller’s head:
And he smote upon the door again a second time;
‘Is there anybody there?’ he said.
But no one descended to the Traveller;
No head from the leaf-fringed sill
Leaned over and looked into his grey eyes,
Where he stood perplexed and still.
But only a host of phantom listeners
That dwelt in the lone house then
Stood listening in the quiet of the moonlight
To that voice from the world of men:
Stood thronging the faint moonbeams on the dark stair,
That goes down to the empty hall,
Hearkening in an air stirred and shaken
By the lonely Traveller’s call.
And he felt in his heart their strangeness,
Their stillness answering his cry,
While his horse moved, cropping the dark turf,
’Neath the starred and leafy sky;
For he suddenly smote on the door, even
Louder, and lifted his head: —
‘Tell them I came, and no one answered,
That I kept my word,’ he said.
Never the least stir made the listeners,
Though every word he spake
Fell echoing through the shadowiness of the still house
From the one man left awake:
Ay, they heard his foot upon the stirrup,
And the sound of iron on stone,
And how the silence surged softly backward,
When the plunging hoofs were gone.
১৯১২ সালে, কন্সটেবল অ্যান্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ওয়াল্টার ডি লা মেয়ার-এর কবিতা-সংকলন ‘দ্য লিসেনার্স অ্যান্ড আদার ভার্সেস”। তাতেই আত্মপ্রকাশ করে, এবং তারপর থেকে অগণন বই ও সংকলনে স্থান পায় “দ্য লিসেনার্স” নামের এই কবিতাটা। এর থিম, সারসংক্ষেপ, কে এসেছিল, কেন এসেছিল... এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করতে হয়েছিল তখন। ‘থ্রি মেন ইন আ বোট’-এর নির্বাচিত অংশ (প্যাকিং), বা জিম করবেট-এর ‘কুঁয়ার সিং’ এর মতো করেই পড়েছিলাম কবিতাটা। কিন্তু অজস্র ভূতের, ভয়ের, রোমাঞ্চের, আছে-কি-নেই-এর গল্প পড়ার ফাঁকে ওই প্রথম লাইনটা মাথায় থেকেই গেছিল।
“ইজ দেয়ার এনিবডি দেয়ার?”
কেউ আছেন?

এই ব্যাকুল প্রশ্নটা মানুষ যুগ-যুগ ধরে ছুড়ে দিয়েছে অজানার উদ্দেশে। সমুদ্রের গভীরে আটলান্টিস বা নিবাতকবচদের খুঁজে বেড়ানো, অনন্ত মহাশূন্যে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার সন্ধানে অকাতরে অর্থ, শ্রম, মেধার বিনিয়োগ,... এমনকি মৃত্যুর পরেও থেকে যাওয়া কোনো রেশ, কোনো উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়ার চেষ্টা, সবেতেই আছে ওই একটা প্রশ্ন।
কেউ আছেন?
কিন্তু কেন? কেন আমরা নিজেদের বন্ধু, স্বজন, সহকর্মী, পেশাগত বা ব্যক্তিগত শত্রু, এদের নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে পারি না?
কেন আমাদের তার পরেও খুঁজতে হয় জলের নীচে লুকিয়ে থাকা মৎস্যকন্যা বা জায়ান্ট স্কুইডের মতো রহস্যময় কোনো প্রাণী?
কেন আমাদের চারপাশে এত মানুষ, এত কিছু থাকা সত্বেও আমরা ছুটে যাই নির্জন মরুভূমি বা পাহাড়চূড়ায়, আর তারপর রেডিও টেলিস্কোপ বাগিয়ে ক্র্যাব নেবুলায় খুঁজি প্রাণের স্পন্দন?
কেন আমরা নিজেদের ওজনদার অস্তিত্বের পরোয়া না করে ধাওয়া করি একটোপ্লাজম বা নড়ন্ত টেবিলের পেছনে?
এই প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারব না। “যাহা পাই, তাহা চাই না।” মানসিকতা থেকেই আজকের মানুষ রক্তমাংসের সম্পর্কের বদলে ভার্চুয়াল সম্পর্কে বেশি আগ্রহী, এমনটা অনেক বিদ্বান বলে থাকেন। আমি মুখ্যু, তাই এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাহসই করব না।
কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর আমাকে প্রায়ই দিতে হয়। ভাই-বোনেদের আসরে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায়, এমনকি মেয়েকে পড়াতে গিয়েও।
“ভূত বলে কি কিছু আছে?”
কেন আমাকে এই প্রশ্ন করা হয়, জানি না। সম্ভবত আমাকে প্রচুর বই পড়তে দেখে ভাবা হয়, আমি এই ব্যাপারে ‘অথরিটি’। মুশকিল হল, আমি ভূতের বা ভয়ের গল্প পড়েছি সহস্রাধিক। কিন্তু সত্যি-সত্যি এমন কিছু আছে কি না, বা থাকলে তার কী ধরনের প্রকাশ বা ম্যানিফেস্টেশন হয়, সেই নিয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে মাত্র খানতিনেক।
না, সেগুলো নিয়ে আমি কিচ্ছু লিখব না। ওগুলো লেখার নয়, বলার জিনিস, বিশেষত বাইরে যখন রাত ঝিমঝিম করবে, আর বৃষ্টিমাখা হাওয়া জানলায় আছড়ে পড়বে।
তাহলে আমি কী লিখব?
আমি লিখব একটি ঢপের চপের কথা, যার সামনে যাদবপুরের স্বর্গত মিলনদার ক্যান্টিনের ঢপ-ও ফেল মেরে যেত।

স্বামী অভেদানন্দ রচিত “মরণের পারে” বইটির সঙ্গে আপনার নিশ্চয় পরিচয় আছে সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন গালাগাল দেওয়ার বিষয় থাকে না, যখন নেইমার থেকে রাগা/নমো, রঞ্জন বাঁড়ুজ্জে থেকে আবাপ কিছুই আর চাংগায়নী সুধা হিসেবে কাজ করে না, তখন লোকে এই বইটার ওপর হামলে পড়ে। একথা অনস্বীকার্য যে গাঁজার ধোঁয়া বা একটোপ্লাজমে পরিপূর্ণ এই বইয়ের মতো খোরাক সচরাচর পাওয়া যায় না, কিন্তু মরা ঘোড়াকে চাবকানো আমার উদ্দেশ্য নয়। প্রায়ই ‘প্রামাণ্য’ হিসেবে উদ্ধৃত, আদতে অট্টহাসির মশলা এই বইটিকে নিয়ে আমি কিছু লিখব না। বরং আমি আপনাদের সামনে পেশ করব আসলি চিজ: জেরাল্ড ব্রিটল-এর লেখা “দ্য ডেমনোলজিস্ট: দ্য এক্সট্রাঅর্ডিনারি ক্যারিয়ার অফ এড অ্যান্ড লোরেইন ওয়ারেন”।

নামেই প্রকাশ, বইটি এডওয়ার্ড ওয়ারেন এবং লোরেইন ওয়ারেনের ডেমন-বিতাড়নমূলক কার্যকলাপের খতিয়ান।
প্রথম প্রশ্ন, ডেমন কী?
আদতে গ্রিক শব্দ ডেইমিনিয়ন মানে হল স্পিরিট (আত্মা?) বা দৈব শক্তি। একে সকর্মক একটি শক্তি বা উপস্থিতি হিসেবেই দেখা হত। প্লেটো একে সক্রেটিসের অনুপ্রেরণা-দাতা হিসেবেও চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু বাইবেলের আদিযুগে, এবং মধ্যযুগে তার কঠোরতর ব্যাখ্যা করার সময় স্থানীয় কিংবদন্তি ও ইহুদি বিশ্বাস বা সংস্কার মিশিয়ে একে এক ক্ষতিকারক শক্তি বলে বোঝানো হয়। এও বলা হয় যে দৈবশক্তির অপব্যবহারে ইচ্ছুক মানুষেরা এই ডেমনকে আহ্বান করে তাকে দিয়ে নানা কাজ করাতে পারেন।
আলোচ্য বইয়ে বর্ণিত নানা ঘটনা বা ‘কেস’-এ ডেমন বলতে বোঝানো হয়েছে এক অশরীরী উপস্থিতিকে, যে কোনো বাড়িতে এসে, কোনো বস্তু বা ব্যক্তির ঘাড়ে চেপে বা তাকে ‘পজেস’ করে ভয়ানক সব কাণ্ডকারখানা ঘটিয়েছে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন, এডওয়ার্ড ও লোরেইন ওয়ারেন কারা?

মার্কিন নেভি, ও পরে পুলিশের চাকরি থেকে অবসর নেওয়া এডওয়ার্ড ওয়ারেন ছিলেন এক স্বশিক্ষিত ওঝা। কথাটা শুনলে খেলো শোনাচ্ছে, তাই না? কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা তাই। ভদ্রলোক বই পড়ে বুঝে ফেলেন, মশারির বাইরে মশার মতোই আমাদের চেতনার বাইরের এক জগতে ভনভন করছে দুষ্ট আত্মা বা ডেমনেরা লোরেইন ওয়ারেন এডওয়ার্ডের স্ত্রী, এবং তাঁর ঘোষণামাফিক ক্লেয়ারভয়েন্ট (মানে দৃষ্টির অগোচরে ঘটা কার্যকলাপ বুঝতে সক্ষম) ও ‘লাইট মিডিয়াম’। শেষোক্ত বিশেষণটি গাত্রবর্ণ ভাববেন না, মিডিয়াম হলেন প্ল্যানচেট বা সিঁয়াস-এ আগত আত্মার একমাত্র মুখপত্র।
সব দেশে, সব কালেই মানুষের মনের দুর্বলতা বা ভয়কে নিয়ে ব্যবসা করেছেন মূলত ‘বাবা’-রা (যাদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ধ্বজাধারীরাও আছেন, কারণ ওগুলো সবই ভয়ঙ্কর রকম পুরুষতান্ত্রিক), মাঝেসাঝে ‘মা/দেবী’-রা, আর তাঁদের প্রবক্তা/দালালরা। কিন্তু ওয়ারেন দম্পতি অতি বিশিষ্ট হয়ে আছেন একটিই কারণে।
একমাত্র তাঁদের কীর্তিকলাপ তথা ডেমন-বিতাড়ন নিয়েই হলিউড নামিয়েছে এক-আধখানা নয়, বহু সিনেমা!
উক্ত বইটি সেইরকম রোমহর্ষক কিছু কেসের রেকর্ড।
কী রকম কেস?

১৯৫২ সালে ওয়ারেনরা ‘নিউ ইংল্যান্ড সোসাইটি ফর সাইকিক রিসার্চ’ প্রতিষ্ঠা করেন। সমমনস্ক লোকজন, এবং আমেরিকায় অ্যাপারেন্টলি গিজগিজ করা ভূতপ্রেতদের খুঁজে বের করা ও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দিব্যি তাঁদের দিন কাটছিল। কিন্তু ১৯৭০ সালে ওয়ারেন দম্পতি তাঁদের ক্যারিয়ারের প্রথম জাঁকালো কেসটি পান।
নার্সিং পাঠরত এক ছাত্রী উপহার পেয়েছিল একটি লালচুলো, ত্রিভুজাকার নাক-বসানো র‍্যাগ ডল। সে ও তার রুমমেট কিছু ঘটনার মাধ্যমে ‘আবিষ্কার করে’ যে পুতুলটা নিজের মতো চলেফিরে বেড়ায়! প্রথমদিকে ব্যাপারটাকে মেনে নিয়ে পুতুলটাকে তাদের জীবনের স্বাভাবিক অঙ্গ করেই নিতে চেয়েছিল সেই ছাত্রীটি। কিন্তু ক্রমে বোঝা যায়, পুতুলটা তাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। এক সন্ধ্যায় অন্ধকার ঘরে ওই রুমমেটের ফিঁয়াসের ওপর কেউ, বা কিছু হামলা করে। আলো জ্বালিয়ে দেখা যায়, ছেলেটির শরীর আঁচড়ে রক্তাক্ত, আর তার পায়ের কাছে পড়ে আছে পুতুলটি। এক সাইকিক মিডিয়াম তাদের বলে, অ্যানাবেল হিগিন্স নামের একটি মৃত মেয়ের আত্মা পুতুলটাকে ‘ভর করেছে’। অতঃপর, অকুস্থলে আবির্ভূত হন ওয়ারেন দম্পতি, এবং পুতুলটাকে নিজেদের মিউজিয়ামে নিয়ে গিয়ে কাচের বাক্সে পুরে প্রদর্শন করেন।

এই গপ্পো ও তার কাল্পনিক পূর্বাপর নিয়ে বানানো হয়েছে ‘অ্যানাবেল’ (২০১৪) এবং ‘অ্যানাবেল: ক্রিয়েশন’ (২০১৭) দু-দুখানা সুপারহিট হরর মুভি!
১৯৭১ সালে রোড আইল্যান্ডের হ্যারিসভিলে একটি বাড়িতে বাসিন্দা হয়ে আসেন পেরন পরিবার। তারপরেই শুরু হয় সমস্যা। বাড়িটি নাকি অভিশপ্ত। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে বাথশেবা শেরম্যান নামের এক মহিলা, যাকে স্থানীয় মানুষেরা ডাইনি বলে মনে করত, ওই বাড়ি তথা জমিকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। তার ফলেই পেরন পরিবার মহাসঙ্কটে পড়েন। কীভাবে ওয়ারেনরা এই অভিশাপ তথা বিপদ থেকে পরিবারটিকে বাঁচালেন (?), তাই নিয়ে তৈরি হয়েছে মেগাহিট ‘দ্য কনজিওরিং’ (২০১৩)।
উপরোক্ত দুটিকে যদি ফিল্মফেয়ার আর বাফতা-র সঙ্গে তুলনা করা যায়, তাহলে অস্কার আসে ১৯৭৬ সালে। নিউ ইয়র্কের অ্যামিটিভিলের বাসিন্দা জর্জ ও ক্যাথি লুৎজ-এর বাড়িতে এমনই ভৌতিক উপদ্রব শুরু হয় যে তাঁদের বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয় প্রাণের দায়ে। ওয়ারেনরা ফিল্ডে নামেন। তাঁদের বয়ান অনুযায়ী ডেমন-কে/দের কীভাবে খেদানো হল, এবং তার পর ওই বাড়ি ও এলাকা কীভাবে বারংবার অশুভ শক্তির দ্বারা আক্রান্ত ও পুনরায় মুক্ত হল, তাই নিয়ে হয়~
১] দ্য অ্যামিটিভিল হরর (১৯৭৯ এবং ২০০৫)
২] ১৯৮২, ১৯৮৩, ১৯৮৯, ১৯৯০, ১৯৯২, ১৯৯৩, ১৯৯৬, ২০১১, ২০১৩, ২০১৫-য় দু’টি, ২০১৬-য় চারটি, ২০১৭-য় তিনটি, এবং ২০১৮-য় (এখনও অবধি) একটি সিনেমা।
মোট ২১টি সিনেমার উপজীব্য/অনুপ্রেরণা হওয়ার মতো ডেমন-বিতাড়ন কি চাট্টিখানি ব্যাপার? আমাদের স্মরণজিতের এত-এত হিট লেখা থাকা সত্বেও তাই নিয়ে আজ অবধি হল মোটে দু’খানা সিনেমা, তাও একেবারে রদ্দি!
১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯-র মধ্যে ইংল্যান্ডের এনফিল্ডে একটি বাড়িতে পোল্টারগাইস্টের উপদ্রব হওয়ার খবর ডেইলি মেইল টাইপের কাগজে ফলাও করে বেরোয়। প্রেততত্ত্ববিদেরা বলেন, পোল্টারগাইস্ট মানে হল সেইরকম আত্মা যারা জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে, ভাঙচুর করে, এবং সবমিলিয়ে স্নায়ুর ওপর এমনই চাপ তৈরি করে যে লোকে দিশেহারা হয়। অকাল্ট নিয়ে উৎসাহী স্থানীয় জনতা থেকে শুরু করে সাইকিক সোসাইটি, এমনকি আমেরিকা থেকে ওয়ারেন দম্পতিও এতে কৌতূহলী হন। অন্য লোকেদের দর্শক নেন না বা ‘খান না’ বলে এই কেস নিয়ে বানানো সিনেমা ‘দ্য কনজিওরিং: ২’ (২০১৬)-তে এডওয়ার্ডকেই ডেমনদমনে পুরোধা বলে দেখানো হয়।
১৯৮১ সালে ব্রুকফিল্ড, কনেক্টিকাট-এর বাসিন্দা আর্ন জনসন ঝগড়া করার সময় রেগেমেগে তাঁর বাড়িওলা অ্যালান বনো-কে খুন করেন। ওয়ারেন দম্পতি বলেন, জনসন ভূতগ্রস্ত, বা ডেমন-পজেসড। আদালতের সামনে অবশ্য এই যুক্তি চলেনি। জনসনকে জেল খাটতে হয়।
১৯৮৬ সালে ওয়ারেন দম্পতি আরেকটি দমদার কেস হাতে পান ওয়েস্ট পিটসন, পেনসিলভ্যানিয়া-র স্মার্ল পরিবারের বাসস্থানটি নাকি ১৯৭৪ সাল থেকেই বিচিত্র শব্দ, দুর্গন্ধ, পোষ্যটিকে দেওয়ালে ছুড়ে মারা, এমনকি জ্যাক ও জ্যানেট স্মার্লের ওপর যৌন নির্যাতন ইত্যাদি কারণে বিশিষ্ট নানা রকম এক্সরসিজম, কড়া ডোজের আশীর্বচন, জল ছেটানো ইত্যাদির পর ওয়ারেনরা ঘোষণা করেন, তিনটি স্পিরিট ও একটি ডেমন ওই বাড়ির বাসিন্দা, এবং শেষোক্ত ডেমনটি বড়োই শক্তিশালী এর দুবছর পর ব্যাপারটা কমে আসে তবে টিপিক্যাল শেষ হয়ে হইল না শেষ স্টাইলে এই নিয়ে দ্য হন্টেড নামক বেস্টসেলার লেখা হয়, এবং ১৯৯১-এ একই নামের একটি সিনেমা বানানো হয়
১৯৮৬ সালেই ওয়ারেন দম্পতি আরেকটি জবরদস্ত কেস পান কনেক্টিকাট-এর সাউদাম্পটনে কারমেন ও অ্যাল স্নেডেকার একটি বাড়ি ভাড়া নেন, যেটি নাকি আগে ফিউনারেল হোম ও মর্চুয়ারি ছিল হঠাৎ করে আলো নিভে যাওয়া, মাংসপচা গন্ধ ভেসে আসা, কল চালু হয়ে জল পড়া ও তার রঙ রক্তের মতো হয়ে যাওয়া, অব্যাখ্যাত পায়ের ছাপ, আয়না ও আলমারি কেঁপে ওঠা, এমনকি স্নেডেকারদের ওপর যৌন নির্যাতন! ওয়ারেনরা নিজস্ব তদন্ত চালিয়ে ঘোষণা করেন, মর্চুয়ারিতে মৃতদেহের সঙ্গে নানা অস্বাভাবিক কীর্তিকলাপ চালাত আগের বাসিন্দারা, যার ফলে সেইসব মৃত মানুষের আত্মা এখানে থেকে প্রতিশোধ নিচ্ছে তবে স্নেডেকাররা রেহাই পাননি, বরং দুবছর পর তাঁদেরই ওই বাড়ি ছেড়ে যেতে হয় কেসটি নিয়ে, যথারীতি, তৈরি হয় ব্লকবাস্টার সিনেমা দ্য হন্টিং ইন কনেক্টিকাট
এসেক্স, ইংল্যান্ড-এর বাসিন্দা বিল র‍্যামসে-র বয়স যখন মাত্র ৯, তখন থেকেই হঠাৎ-হঠাৎ তাঁর চেহারা ও স্বভাবে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিত শরীরটা প্রথমে হয়ে যেত দারুণ ঠান্ডা, আর তারপরেই এক অদম্য রাগ, ও মানানসই রকম দানবিক বল তাঁর মধ্যে প্রকাশ পেত বড়ো হওয়ার পর সেগুলো কমে আসে বিয়ের বেশ কিছুদিন পর, র‍্যামসে যখন তিন সন্তানের গর্বিত পিতা, তখনই হঠাৎ তাঁর মধ্যে প্রকাশ পেতে শুরু করে সেইসব বৈশিষ্ট্য ঘুমের মধ্যে জান্তব গর্জন শুনে ঘর্মাক্ত শরীরে জেগে ওঠা, আর তারপর বোঝা, যে সেই আওয়াজের উৎস তিনিই শরীর লোমশ হয়ে ওঠার অনুভূতি নিঃসীম ক্রোধে কাছের জনকে আক্রমণ করতে চাওয়ার ইচ্ছে এই প্রবণতাগুলো বাড়তে-বাড়তে এমন জায়গায় পৌঁছয়, যে হাসপাতাল বা পুলিশের স্তর পেরিয়ে র‍্যামসে আরও উঁচু স্তরের সাহায্য চান ওয়ারেনরা ইংল্যান্ডে আসেন, র‍্যামসেকে পর্যবেক্ষণ করেন, বলেন যে র‍্যামসেকে পজেস করা ডেমন তাকে নেকড়ে তথা ওয়্যারউলফ করে তুলছে, এবং শেষে র‍্যামসেকে আমেরিকায় ডেকে এনে এক্সরসিজম করান

এমন গাদাগাদা রঙ-চড়ানো ঘটনা আছে বইটায় ওয়ারেন দম্পতি নাকি দশ হাজারেরও বেশি এমন কেস দেখেছেন, তবে বইটা গোটা পঞ্চাশেকের কথা বলেছে, যাদের মধ্যে উপরোক্ত ম্যাগনাম কেসগুলো ছাড়াও ছিল সিমেট্রিতে দেখা স্পিরিট এসেন্স’, নানারকম খুচরো পজেসন, ইত্যাদি-ইত্যাদি
বইটি, এবং ওয়ারেন দম্পতির কার্যকলাপ আমার কাছে অভেদানন্দের বইটি, বা কোনান ডয়েলের ভিমরতিগ্রস্ত লেখালেখির চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকারক লেগেছে কেন জানেন? কারণ, তথাকথিত অশুভ শক্তির সঙ্গে লড়ার নামে খুব-খুব খারাপ কাজ করেছে বা তাকে উৎসাহ দিয়েছে এই বইটি
সুধীজন উপরোক্ত কেসগুলো পড়েই বুঝবেন, ঘটনাগুলো আসলে কী এই বিষণ্ণ ও বিপন্ন মানুষগুলোর দরকার ছিল সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং কারও প্রয়োজন ছিল পরিবারের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা সেক্সুয়াল প্রিডেটরদের হাত থেকে সুরক্ষা যেকোনো মনস্তত্ত্ববিদ, কাউন্সেলর, এমনকি বাস্তববুদ্ধি-সম্পন্ন নার্স ও ডাক্তাররাও এটুকু বুঝবেন অথচ তা না করে কী করা হল?
(১) ল্যাটিন বাইবেল, এবং রোমান ক্যাথলিক বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত আরও একঝাঁক আচার বা সংস্কারকে মহৎ বলে তুলে ধরা হল বাইবেল ল্যাটিন হওয়া জরুরি, ইংরেজি বা চিনা ভার্শন ডেমনদের ভয় দেখাতে যথেষ্ট নয়।
(২) ডেমনরা আরেকটি জিনিসকে ব্যাপক ভয় পায় বলে দাবি করা হল। তা হল চার্চের বিশপ বা ফাদার-দের দ্বারা আশীর্বাদ-প্রাপ্ত হোলি ওয়াটার। জলটিকে পূতপবিত্র করার মতো আশীর্বাদ কোনো স্নেহময়ী মা বা ধর্ষিতাকে আশ্রয় দেওয়া নান-এর হলে হবে না, সেটা বিশপ বা ফাদারেরই হতে হবে, তাঁরা পেডোফাইল বা নারী নির্যাতনের মদতদার, যাই হোন না কেন।

এই ভণ্ডামি আর মিথ্যের ভাণ্ডার নিয়ে আমি আর লিখতে চাইছি না। এইসব লোকের কীর্তিকলাপ দেখেই মনে হয়, মানুষের চেয়ে ভয়ঙ্কর আর কিছুই হয় না। এবং এই বইগুলো পড়ে সত্যিটা জানাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের খোঁজ চলতেই থাকে, ধূলোভরা আয়নায় দেখা দেওয়া অচেনা ছায়ায়, ফাঁকা ঘরে বিনা হাওয়ায় দুলে ওঠা ক্যালেন্ডারে, রাতের নিরুপদ্রব ঘুমের মধ্যে কপালে একটা ভেজা হাতের ছোঁয়ায়।
কেউ কি আছেন?
আবার ফিরব এই বিষয়ে অন্য বই, অন্য ঘটনা নিয়ে, তাই একে প্রথম ভাগ বলে আপাতত ইতি টানছি।