Saturday, 20 January 2018

অ্যাডভেঞ্চার!

শব্দটা পড়ামাত্র কি আপনার রক্ত-চলাচল দ্রুততর হয়ে উঠেছে?
আপনি কি এমন কোনো জায়গার কথা ভাবছেন, যার সম্বন্ধে অনেক কিছু লেখা হয়েছে কয়েকশো বছর ধরে, যার সন্ধানে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়ে গেছেন অনেক অভিযাত্রী... কিন্তু, আজও যা রয়ে গেছে তথাকথিত সভ্য পৃথিবীর নাগালের বাইরে?
“চাঁদের পাহাড়”, “হিরেমানিক জ্বলে”, “পাহাড় চূড়ায় আতংক”-র চেয়ে বেশি কিছু পড়ার একটা হালকা ইচ্ছে কি শীতের রোদের মতো আপনার পিঠ, কান হয়ে মাথায় পৌঁছতে চাইছে?

১৮৭১ সাল। ওয়েলশ সাংবাদিক হেনরি মর্টন স্ট্যানলি ফিরে এলেন আফ্রিকার গহনতম অরণ্য থেকে। নীল নদের উৎস খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া স্কটিশ মিশনারি ডেভিড লিভিংস্টোন-কে খুঁজে বের করেছেন তিনি! সেই বৃত্তান্তই প্রকাশিত হল খবরের কাগজে।
‘ডার্ক কন্টিনেন্ট’ নামে পরিচিত আফ্রিকার অন্দরমহলের সবুজ অন্ধকারের একটা স্পষ্ট ছবিও ফুটে উঠতে থাকল বাইরের পৃথিবীর চোখে।
নীল নদের পশ্চিম তীরে, থেবেস-এর উলটোদিকে অবস্থিত ‘ভ্যালি অফ দ্য কিংস’ খনন করে তখন নতুন করে লেখা হচ্ছে ইতিহাসের অনেক কথা।
মধ্য আমেরিকার জঙ্গলের বুক থেকে মাথা তুলছে মায়া সভ্যতার বিভিন্ন পরিত্যক্ত স্থাপত্য।
এমনকি, হোমারের বর্ণনায় পড়া যে ট্রয় তখনও স্রেফ কিংবদন্তির বিষয় হয়ে ছিল, তাকেও ততদিনে খুঁজে পাওয়া গেছে আনাতোলিয়ার বিগা উপদ্বীপে!
এক রোমান্টিক তরুণ, যে জুলু যুদ্ধ ও বোয়র যুদ্ধে অংশ নিয়েছে, জঙ্গলের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া গ্রেট জিম্বাবোয়ে সভ্যতার ভাঙাচোরা অবশেষ নিজের চোখে দেখেছে, তার ওপর এসবের কেমন প্রভাব পড়তে পারে?
হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের মাথায় সাহিত্যের পোকাটা কামড় বসিয়েছিল অনেক আগেই। কিন্তু ১৮৮৩ সালে প্রকাশিত রবার্ট লুই স্টিভেনসন-এর লেখা সুপারহিট উপন্যাস ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’-এর চেয়েও ভালো লেখা লিখতে পারবেন, এই মর্মে ভাইয়ের সঙ্গে পাঁচ শিলিং-এর বাজি ধরে ফেলেন তিনি। সেই খুচরো পাপের বশে, স্কটিশ অভিযাত্রী জেমস থমসন-এর জনপ্রিয় বই ‘থ্রু মাসাই ল্যান্ড’ থেকে তথ্য নিয়ে, বিখ্যাত ব্রিটিশ হোয়াইট হান্টার ফ্রেডরিক হেনরি সেলাস-এর আদলে কেন্দ্রীয় চরিত্র অ্যালান কোয়াটারমেইন-কে গড়ে, হ্যাগার্ড একটা রোমহর্ষক উপন্যাস লিখলেন
সেপ্টেম্বর ১৮৮৫-তে ‘দ্য মোস্ট অ্যামেজিং বুক এভার রিটেন’ তকমা গায়ে এঁটে যে বইটি আত্মপ্রকাশ করল, সেটি ইতিহাস তৈরি করে

বইটি ছিল “কিং সলোমন’স মাইনস”।


“কিং সলোমন’স মাইনস” এতটাই জনপ্রিয় হয় যে প্রকাশক বইটা ছেপে কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। শুধু জনপ্রিয়ই নয়, সাহিত্যে একটি আস্ত জঁর তৈরি হয় এই বইয়ের সৌজন্যে, যাকে হারানো জাতি/সভ্যতা-র সন্ধান নামে চিহ্নিত করা যায়।
একটা মানচিত্র সম্বল করে, কয়েকজন বন্ধু ও এক পোড়খাওয়া অভিযাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে অজানার অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া আপনজনকে খুঁজে বের করার চেষ্টা, পদে-পদে আসা বিপদের সঙ্গে সাহস আর বুদ্ধি দিয়ে বোঝাপড়া করা, অব্যাখ্যাত রহস্যের সম্মুখীন হওয়া, বিশ্বাসঘাতকতা, ট্র্যাজেডি দিয়ে সাজানো “কিং সলোমন’স মাইনস” বইয়ের পাতায় নাক-গোঁজা পাঠকদের পাশাপাশি আরো অনেককেই যে প্রভাবিত করেছিল, একথা বলাই বাহুল্য।
কিন্তু সাহিত্যের সীমা ছাড়িয়ে, অজানার আহ্বানে সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে সত্যিই ইতিহাস গড়ে দেন যে মানুষটি তাঁর নাম: লেফটেন্যান্ট কর্নেল পার্সিভ্যাল হ্যারিসন ফসেট



১৮৮৬ সালে রয়্যাল আর্টিলারি-তে লেফটেন্যান্ট হিসেবে যোগ দেন ফসেট। ১৯০১ সালে তিনি রয়্যাল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটি-র সদস্য হন অভিযান চালানো আর ম্যাপ বানানোর কৌশল আয়ত্ত করতে।
কেন?
যাতে, সার্ভেয়ার-এর ছদ্মবেশে উত্তর আফ্রিকায় ঘোরাঘুরি করে ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিস-এর হয়ে তথ্য সংগ্রহ করার সময় তাঁর নকল চেহারাটা যেন ধরা না পড়ে!
অভিযাত্রী হিসেবে ফসেটের দক্ষতা রয়্যাল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটিকে এতটাই প্রভাবিত করেছিল যে ১৯০৬ সালে ব্রাজিল-বলিভিয়া সীমান্তে একটি দুর্গম জঙ্গুলে জায়গার ম্যাপ বানানোর জন্য তাঁকেই পাঠানো হয়। মাত্র ৩৯ বছর বয়সী ফসেট সেই অভিযান চলাকালীন শুধু ম্যাপ-ই বানাননি, সঙ্গে দেখেছিলেন অনেক তখনও অবধি অজানা পশু-পাখি, এবং মেরেছিলেন একটি ৬২ ফুট লম্বা অ্যানাকন্ডা!


সাহস, ধৈর্য, স্থানীয় উপজাতিদের সঙ্গে ভদ্র ও সম্মানজনক ব্যবহার, এবং মনের জোর সম্বল করে ১৯০৬ থেকে ১৯২৪-এর মধ্যে ফসেট দক্ষিণ আমেরিকায় মোট সাতটি অভিযান চালান, যাদের বিবরণ ঠাঁই পেয়েছিল ‘এক্সপ্লোরেশন ফসেট’ বইয়ে। রিও ভার্দে এবং হিথ নদীর উৎসও খুঁজে বের করেছিলেন ফসেট
আমাজন অববাহিকা থেকে পাঠানো তাঁর নানা ডিসপ্যাচ তথা রিপোর্টের ভিত্তিতে, এবং তাঁর অনমনীয় স্বভাবের ছায়ায় এক চরিত্র গড়ে সেই সময়ে দুনিয়ার জনপ্রিয়তম লেখকদের একজন তাঁর অন্য এক সৃষ্টির নামমাহাত্ম্যের আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে কিছু লেখার সুযোগ পান।


হ্যারি রুনট্রি’র অলঙ্করণে সমৃদ্ধ হয়ে, ১৯১২-র এপ্রিল থেকে নভেম্বর মাস জুড়ে ‘স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিন’-এ ধারাবাহিক ভাবে, ও তারপর বই হয়ে বেরোয় স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের অদ্বিতীয় উপন্যাস “দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড”। ফসেটের আদলে ডয়েল জন্ম দেন প্রফেসর জর্জ এডোয়ার্ড চ্যালেঞ্জার-এর। মেপল হোয়াইট ল্যান্ডের উদ্দেশে বেরিয়ে, প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীদের সঙ্গে চ্যালেঞ্জার, লর্ড রক্সটন, সাংবাদিক ম্যালোন-এর সাক্ষাতের সেই রোমহর্ষক কাহিনি পড়েননি, এমন কেউ কি আছেন?



কিন্তু, অজানা জগতের মানচিত্র গড়া, তথা সেইসব জায়গা ও তার মানুষদের লোকচক্ষুর সামনে নিয়ে আসার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে সভ্য দুনিয়ায় খ্যাতি ও শ্রদ্ধার পাত্র হওয়া সত্বেও, ফসেটের অদম্য মানসিকতা তাঁকে নিশ্চেষ্ট হয়ে ঘরবন্দি হতে দেয়নি।
তাছাড়া, বিশ্ব জুড়ে বেজে ওঠা যুদ্ধের দামামা, হত্যালীলা, ইনফ্লুয়েঞ্জা এপিডেমিকে এক বিরাট সংখ্যক মানুষের মৃত্যুর মধ্যেও অতীতের পাতা উলটিয়ে অজানা সভ্যতা মানুষের চোখের সামনে আসাও তো থেমে থাকেনি।
২৪শে জুলাই ১৯১১ মার্কিন ঐতিহাসিক হিরাম বিংহ্যাম পেরু-র মাচুপিচু অঞ্চলে পাহাড়ের ওপরে, ষোড়শ শতাব্দীতে পরিত্যক্ত হওয়া, ইনকাদের অতুলনীয় স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের সাক্ষ্য দেওয়া এক দুর্গশহর বা সিটাডেল খুঁজে পান। সভ্য পৃথিবীর নজর তৎক্ষণাৎ আমাজনের অন্ধকার জঙ্গল থেকে সরে আসে আন্দিজের ওই পাহাড়চুড়োয়।
১৯১৯-২০-তে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র ওয়েস্টার্ন ডিভিশনের সুপারিন্টেন্ডিং আর্কিওলজিস্ট রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় সিন্ধু নদের কাছে, লারকানা জেলায় মোহেঞ্জোদারো নামের জায়গাটায় খুঁজে পান এমন একটা ধ্বংসস্তূপ, যা এক ঝটকায় উপমহাদেশের ইতিহাসকে পিছিয়ে দেয় কয়েক হাজার বছর।
ভ্যালি অফ দ্য কিংস-এর ‘কেভি ৬২’ নামে চিহ্নিত জায়গাটিতে লর্ড কারনাভন-এর উদ্যোগে, হাওয়ার্ড কার্টার-এর নেতৃত্বে চালানো খননের ফলে ৪ঠা নভেম্বর ১৯২২ যে সিঁড়ির ধাপগুলো খুঁজে পাওয়া যায়, তারাই সভ্য পৃথিবীকে নিয়ে যায় অতুল সম্পদ আর অজস্র রহস্য, এমনকি অভিশাপে ঘেরা তুতানখামেনের মমির কাছে!
সোনা আর রহস্যের ওই আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায় সব্বার। বিশেষত, আমেরিকা আর ইংল্যান্ডের সেইসব মানুষেরা, যাঁরা ফসেটের ডিসপ্যাচের ভিত্তিতে বহু-বহু বছর ধরে গুজব আর কিংবদন্তি হয়ে থাকা একটা জায়গাকে শেষ অবধি খুঁজে পাওয়ার রাস্তা দেখতে পেয়েও এতদিন তাকে ঠিক গুরুত্ব দেননি, এবার কোমর বেঁধে নেমে পড়েন।
কী বলেছিলেন ফসেট?


ব্রাজিলের মাতো গ্রসো এলাকায়, এবং আমাজন অববাহিকায় অভিযান চালানোর সময় স্থানীয় একাধিক উপজাতির মুখে ফসেট অরণ্যের গভীরে লুকিয়ে থাকা একটি শহরের কথা শুনেছিলেন। শহরটিকে তিনি ‘লস্ট সিটি অফ জেড (Z)’ নাম দেন।
ইতিমধ্যে, ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ ব্রাজিল-এ ফসেট একটি ডকুমেন্ট (ম্যানুস্ক্রিপ্ট ৫১২-পার্ট)-ও পেয়েছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর এক পর্তুগিজ ভাগ্যান্বেষী জোয়াও ডা সিলিভা গিমারেজ-এর লেখা ওই ডকুমেন্টে ছিল বাহিয়া প্রদেশে ১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ডা সিলভা’র নিজের চোখে দেখা এক পরিত্যক্ত শহর, বিভিন্ন মূর্তি, চিত্রলিপিতে ঠাসা একটা ভাঙা মন্দির, ইত্যাদির বর্ণনা।
ফসেটের ডিসপ্যাচে নথিভুক্ত এই কথাগুলো তুতানখামেনের সমাধি আবিষ্কারের পর হঠাৎই ১৫৩৭ সালে স্পেনের কনকুইস্তাদরদের শোনা ‘এল ডোরাডো’-র গল্পকে নতুন চেকনাই দেয়।
সেই গল্পে প্রথমে ছিল স্থানীয় এক উপজাতির প্রধানের কথা, যিনি বিশেষ তিথিতে সর্বাঙ্গে সোনার গুঁড়ো মেখে এক বিশেষ হ্রদের জলে স্নান করতেন। ক্রমে সেই গল্পটা পল্লবিত হতে-হতে হয়ে যায় এমন এক শহরের আখ্যান, যেখানে সবকিছু সোনা দিয়ে তৈরি।
ফসেটের কাঠখোট্টা ডিসপ্যাচ হঠাৎ করে সেই শহরের অস্তিত্বকে বাস্তব করে তোলার ইঙ্গিত দেয়, যার সন্ধান চালিয়েও ব্যর্থ হয়েছেন অজস্র অভিযাত্রী, যার খোঁজে বেরিয়ে অরণ্যের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে আস্ত এক-একটা বাহিনী।

১৯২৫ সালে লন্ডনের একঝাঁক সম্পন্ন মানুষের আর্থিক সাহায্য নিয়ে ফসেট ‘জেড’-এর সন্ধানে একটি সুপরিকল্পিত অভিযান চালান। তাতে তাঁর সঙ্গী ছিলেন তাঁর ছেলে ও ছেলের বন্ধু। বিশ্বাসী, অত্যন্ত কষ্টসহিষ্ণু, এবং সক্ষম দুই সঙ্গীকে নিয়ে ফসেট আমাজনের দক্ষিণপূর্ব দিকের একটি উপনদী, আপার জিঙ্গু, পার হওয়ার সময় ‘ডেড হর্স ক্যাম্প’ নামের একটি শিবির থেকে ২৯শে মে, ১৯২৫, তাঁর স্ত্রীকে একটি চিঠি লেখেন। তাতে তিনি রীতিমতো আশাবাদী ছিলেন যে তাঁরা সঠিক পথেই এগোচ্ছেন।


কিন্তু এরপর ফসেট, বা তাঁর দুই সঙ্গীর আর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
রয়েল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটি তো বটেই, আরো অনেক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি এরপর দশকের-পর-দশক ফসেটের কথিত ‘সিটি অফ জেড’ তথা ফসেটের সন্ধানে বেরিয়ে ব্যর্থ হন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, এবং তারপরের ঠাণ্ডা লড়াই তথা পারমাণবিক মহাসমরের সম্ভাবনা, হারানো শহর বা সভ্যতার সন্ধানকে পেছনের সারিতে ঠেলে দেয়। সাহিত্যের আঙিনাতে রোমহর্ষক কাণ্ডকারখানা যা কিছু এরপর হতে থাকে তার বেশিরভাগই গুপ্তচরবৃত্তি বা মার্কিন-সোভিয়েত শিবিরের মধ্যে লড়াই নিয়েই।

অবশেষে, ১৯৮০ সালে, বিখ্যাত সাহিত্যিক মাইকেল ক্রিকটন পাঠকদের উপহার দেন একটি উপন্যাস, যা ঘোষিতভাবেই ছিল ‘কিং সলোমন’স মাইনস’-এ কথিত রাজা সলোমনের হিরের খনির সন্ধান তথা হারানো শহর/জাতি নিয়ে লেখা। দারুণভাবে সমকালীন এবং তথ্য-তত্ত্ব-উত্তেজনায় ঠাসা এই উপন্যাসটি ছিল: “কংগো”


রত্ন হিসেবে মূল্য না থাকলেও সেমিকন্ডাক্টর হিসেবে ইলেকট্রনিক্স-এর জগতে বিপ্লব আনা টাইপ টু-বি ডায়মন্ড খুঁজতে গিয়ে কংগোর ভিরুঙ্গা এলাকায় ক্যাম্প করা একদল বৈজ্ঞানিক ও অভিযাত্রীর একটা দল একদল ধূসররঙা গোরিলার হাতে আক্রান্ত হয়এবার শুরু হয় বিভিন্ন দেশের একটি কনসর্টিয়াম এবং ই.আর.টি.এস-এর আরেকটি দলের মধ্যে, ওই জায়গায় পৌঁছে ওই বিশেষ ধরনের হিরের খনির ওপর নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করার জন্য, দৌড়। দুর্ঘটনা, অন্তর্ঘাত, ওই এলাকার দেশগুলোতে চলা গৃহযুদ্ধ ও সামরিক অভ্যুত্থান, এবং আরো নানা বিপদ সামলে বৈজ্ঞানিক কারেন রস-এর নেতৃত্বে, স্থানীয় এক অভিজ্ঞ ভাড়াটে সৈন্য চার্লস মুনরো, একটি বুদ্ধিমান ও সাইন-ল্যাংগুয়েজে পারঙ্গম গোরিলা অ্যামি, এবং তার ট্রেইনার পিটার ইলিয়ট-কে নিয়ে ই.আর.টি.এস-এর দলটি ওই এলাকায় শেষ অবধি পৌঁছে বুঝতে পারে, হিরের খনিকে ঘিরে গড়ে ওঠা কিংবদন্তির হারানো শহর ‘লস্ট সিটি অফ জিনজ (ZINJ)’ খুঁজে পেয়েছে তারা, যেখানে তাদের জন্য অপেক্ষা করে আছে সম্পদের পাশাপাশি অনেক রহস্য, আর বিপদ!

তারপর কী হল তা জানতে হলে বইটা পড়তে, বা বইটার ভিত্তিতে তৈরি হওয়া কিঞ্চিৎ কমজোরি সিনেমাটা দেখতে, অবিলম্বে তৎপর হউন!
সলোমনের খনি আর ফসেটের জেড-কে মিশিয়ে দেওয়া এই দুরন্ত উপন্যাস লিখে ক্রিকটন পাঠকের মনে আবার হারানো জাতি/শহর নিয়ে বিপুল আগ্রহের জন্ম দেন।
হলিউড-ও এই সময়ে আমাদের উপহার দেয় রহস্যময় জিনিসের সন্ধানে পৃথিবীর নানা বিপদসংকুল জায়গায় পাড়ি জমানো প্রত্নতাত্ত্বিক ডক্টর ইন্ডিয়ানা জোন্স-এর কীর্তিকলাপ
রেলিক হান্টার বা টুম্ব রেইডার গোছের ভিডিও গেমস ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে

১৯৯৫, সালে ডগলাস প্রেস্টন ও লিংকন চাইল্ড টেকনো থ্রিলার ঘরানাতেই এমন একটি উপন্যাস লেখেন, যা ক্রিকটন-এর তোলপাড় ফেলা উপন্যাস “জুরাসিক পার্ক”-কেও ছাপিয়ে যায় তার মধ্যে লুকিয়ে থাকা কিছু আভাস আর ইঙ্গিতের দিক দিয়ে।



এই কাহিনি শুরু হয় আমাজন অববাহিকার আপার জিংগু অঞ্চলে, যেখানে আমেরিকান মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি-র ডক্টর জুলিয়ান হুইটলসে’র নেতৃত্বে, কিংবদন্তির উপজীব্য ‘কোথোগা’ জাতি এবং তাদের উপাস্য ‘লিজার্ড গড’ মবয়ুন (Mbwun)-এর সন্ধানে আসা একটি অভিযান মাঝপথেই পরিত্যক্ত হয়।
হুইটলসে-ও নিখোঁজ হয়ে যান। মিউজিয়ামের উদ্দেশে তিনি যেসব প্যাক করা ক্রেট পাঠিয়েছিলেন সেগুলো প্রথমে ব্রাজিলের বেলেমে পড়ে থাকে, তারপর জাহাজে চেপে গন্তব্যে এসে পৌঁছয়।
কিছুদিন পরে, মিউজিয়ামে এক বিশাল অনুষ্ঠানের কয়েকদিন আগেই, সেখানে এক নিরাপত্তা রক্ষী, আর বন্ধ হওয়া মিউজিয়ামে থেকে যাওয়া দুটি বাচ্চা ছেলে নৃশংসভাবে খুন হয়।
পুলিশ আসে, সঙ্গে আসেন ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের স্পেশাল এজেন্ট অ্যালয়সিয়াস পেন্ডারগাস্ট, যাঁকে গড়া হয়েছে পুরোপুরি শার্লক হোমসের আধুনিক, এবং ‘কুলেস্ট পসিবল’ সংস্করণ হিসেবেই। তাঁর কাছ থেকেই আমরা জানতে পারি যে বেলেমে একটি, এবং ক্রেটগুলো বয়ে আনা জাহাজে একাধিক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে। অতঃপর শুরু হয় খুনি কে, বা কী, তা জানার, এবং তাকে আটকানোর চেষ্টা।
তারপর কী হল?
এক আদিম রহস্যের সঙ্গে আজকের শার্লক হোমসের টক্করের এই শ্বাসরোধী কাহিনিতে এরপর কী হল, তা জানতে চাইলে অবিলম্বে হস্তগত করুন ও পড়ে ফেলুন রেলিক” নামের এই বইটি!

কিন্তু তার পরেও তো কেটে গেছে আরো দু-দুটো দশক! হারানো জাতি বা শহরের সন্ধানে গিয়ে মাথা-খারাপ-করা রহস্য এবং প্রাণপাখি-ওড়ানো বিপদের মোকাবিলা করা ছেড়ে দুঃসাহসী অভিযাত্রীরা কি তাহলে ঘরে বসে টিভি দেখাতেই মনোনিবেশ করেছেন?
না, তা হয়নি। হ্যাগার্ড, ডয়েল, ক্রিকটন-এর ঘরানার অনুসারী, এবং ফসেটের হার-না-মানা মানসিকতার যথার্থ বাহক হিসেবে জেমস রলিন্স-এর উপন্যাস “আমাজনিয়া” প্রকাশিত হয় ২০০২ সালে।


শুধু জনপ্রিয় নয়, রহস্য, রোমাঞ্চ, কল্পবিজ্ঞান, এবং অ্যাকশন পছন্দ-করা পাঠকদের কাছে বইটি কাল্ট ক্লাসিক হয়ে যায় প্রকাশের পরেই।
কেন?
আমাজনের গভীরে নিখোঁজ হয়ে গেছিল র‍্যান্ড সায়েন্টিফিক এক্সপিডিশন। সেই দলের এক সদস্য, যে আবার স্পেশাল ফোর্সের প্রাক্তন সৈন্যও বটে, বেশ কয়েক বছর পর ক্ষতবিক্ষত ও মুমূর্ষু অবস্থায় জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসে। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, অভিযান শুরুর আগেই সে নিজের একটা হাত হারিয়েছিল, কিন্তু জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসার পর দেখা গেল, তার দুটো হাত-ই আছে!
এই রহস্যের সমাধান করার জন্য যে অভিযান পাঠানো হয়, তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতা, এবং সৃষ্টিরহস্যের এক নতুন ব্যাখ্যা দেওয়া এই উপন্যাস ক্লাসিক হবে না কেন?
ইতিহাস, বিজ্ঞান, অ্যাকশন, এবং সম্ভব-অসম্ভবের মাঝে দোলানো ভাবনা দিয়ে ঠাসা রচনার জগতের মুকুটহীন সম্রাট জেমস রলিন্স শুধু এই একটি বই লিখেই থেমে থাকেননি, একথা বলাই বাহুল্য। তাঁর একাধিক লেখাতেই পূর্বসূরিদের উদ্দেশে নরম স্যালুট স্পষ্ট হয়েছে।
মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি গোপন শাখা ‘সিগমা’ ফোর্স, যার সদস্যেরা আবার দুর্ধর্ষ বিজ্ঞানীও বটে, রলিন্স-এর নিজস্ব সৃষ্টি। এদের নানা কাহিনিতেই প্রাচীন রহস্যকে আধুনিক পৃথিবীতে জাগিয়ে তোলা হয়েছে অতুলনীয়ভাবে, যাদের মধ্যে দুটি লেখার কথা বলতেই হচ্ছে।


২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘দ্য সিক্সথ এক্সটিংশন” নামের এই টেকনো-থ্রিলারটি
জীবজগতের কিছু আদিমতম রহস্য, কিছু ‘যদি এমন হয়’ বা ‘হোয়াট ইফ’ পরিস্থিতি, আন্টার্কটিকার তুহিন অবাচী থেকে আমাজনের গভীরে জঙ্গলের মধ্যে এক ‘টেপুই’ বা টিলার বুকে রচিত এক ষড়যন্ত্র, এবং সেই মারাত্মক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঠেকাতে সিগমা ফোর্স ও অন্যান্যদের প্রাণপণ প্রয়াস নিয়ে লেখা এই উপন্যাসটি যদি এখনও না পড়ে থাকেন, তবে সেই ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করতে অনুরোধ করব। তবে হ্যাঁ, পড়ার সময় অন্তত ঘন্টা ছয়েক ফাঁকা রাখবেন, নইলে জীবনে প্রগাঢ় অশান্তি গ্যারান্টিড।


২০১৫-য় প্রকাশিত হয় রলিন্স-এর উপন্যাস “দ্য বোন ল্যাবাইরিন্থ”।
মানবজাতির ইতিহাসের একটি রহস্য, মধ্যযুগের প্রত্নতত্ত্ব ও বিজ্ঞানচর্চা, আটলান্টিস নামক হারানো সভ্যতার বাস্তবতা নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব, প্রাণের উদ্ভব ও বিবর্তন নিয়ে ‘গোল্ডিলকস এনিগমা’ নামে খ্যাত প্রহেলিকা, এবং সমকালীন রাজনীতি ও বিজ্ঞানের পটভূমিতে আক্ষরিক অর্থে দম-আটকানো অ্যাডভেঞ্চার, এইসব নিয়ে সম্ভবত রলিন্সের সেরা উপন্যাস এটিই। তার চেয়েও বড়ো কথা, এই কাহিনির ক্লাইম্যাক্স মধ্য আমেরিকার এক রহস্যময় জঙ্গলে তো ঘটেইছে, তার সঙ্গে এই কাহিনিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে সাইন-ল্যাংগুয়েজে দক্ষ ও অনেক মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান, ‘বাকো’ নামের একটি গোরিলা!
এবং এক্ষেত্রেও আমি একই অনুরোধ করব: বইটা পড়ুন, তবে হাতে সময় নিয়ে। এটা মাঝপথে ছেড়ে মেয়েকে স্কুল থেকে আনতে হলে বা বাজারে ছুটতে হলে গৃহযুদ্ধ অবশ্যম্ভাবী।

তাহলে হে সুধী পাঠকবৃন্দ, আমি কি আপনাদের শিরায়-ধমনীতে রক্তচলাচল দ্রুততর করার পাশাপাশি অদ্ভুত কোনো জগতে কোনো অজানার সন্ধানে মনে-মনে ছোটার মতো কিছু ইন্ধন সরবরাহ করতে পারলাম?
যদি পেরে থাকি, তবে আমার এই দুর্বল লেখনী ত্যাগ করে উপরোক্ত ক্লাসিকপাঠে উদ্যোগী হোন। তাহলে ছুটিতে পাশের পাড়া বা দীঘায় যেতে হলেও আপনাদের যাবতীয় দুরন্ত আশা অপ্রত্যক্ষভাবে মেটানোর একটা সুযোগ আসবে, ফলে বাড়িতে শান্তি বজায় থাকবে।

আর যদি এই লেখা পড়ে “ধুর! কীসব বইয়ের কথা লিখেছে! এর চেয়ে আমার ‘কুন্দ ফুলের মালা’ বা ‘ভজগোবিন্দ’ দেখাই অনেক ভালো” মনে হয়, তাহলে অভাজনের অপরাধ নিয়েন না!
ভালো থাকুন।

Thursday, 26 October 2017

আলোহান: একটি রূপকথার জন্ম



বিভা পাবলিকেশন থেকে সদ্য প্রকাশিত, রনিন লিখিত, ১২৮ পৃষ্টার, ১৪৪/- টাকা দামের এই পেপারব্যাক উপন্যাসটি নিয়ে কিছু লেখার আগে বইটির মুদ্রণ নিয়ে লিখতেই হচ্ছে।

সুমন্ত মল্লিক-এর অসামান্য প্রচ্ছদে শোভিত, আপাতভাবে সুমুদ্রিত এই বইটিতেও বিভা পাবলিকেশন-এর যাবতীয় দুর্বলতা, কিছু কম হলেও, প্রকট হয়েছে। রয়েছে বিস্তর বানান ভুল, এবং মোক্ষম টাইপো।
এই অবধারিত দুর্বলতাগুলো ছাপিয়ে মূল গল্পের কথা ভাবলে বইটা কেমন লাগে?

“আমাদের এই বইয়ের কাহিনি এমন এক সময়ের, এমন এক পৃথিবীর, যেখানে চলছে ঘোর দুর্দিন”।
আমি জানি আপনি কী ভাবছেন। মানুষ বাঘ-ভালুকের হাত থেকে বাঁচার, আর দু’মুঠো খেয়ে গুহার ভেতরে লুকোনোর ব্যবস্থা করার পর থেকেই নিজের আশপাশের দুনিয়াটা সম্বন্ধে এই কথাটা ভেবে আসছে, তাই না?
সভ্যতার ঊষালগ্নেও সাহিত্য বলতে যা রচিত হয়েছে তাতে মানুষের বিশ্বাস উৎপাদন করার জন্য, তার সাহসের মরুভূমিতে এক চিলতে সবুজ লালনের আশায় এমন পটভূমি তৈরি করা হয়েছে, যেখানে নায়ক (ও তার সঙ্গীদের) যেতে হয় এক দুরূহ যাত্রায়। আজও এমন লেখা হয়, শুধু তাকে আমরা ধর্মগ্রন্থ না বলে ফ্যান্টাসি বলি।
আলোচ্য বইয়েও খুব সহজ, কবিতার হালকা স্পর্শমাখা গদ্যে বলা হয়েছে এমন এক পৃথিবীর কথা, যেখানে দেবতাদের ক্ষমতালোভী যুবরাজের খেয়ালে পৃথিবী ধ্বংস হতে বসেছে। উজাড় হয়ে আসা পৃথিবীর এই ধুলোখেলায় অসহায় ক্রীড়নক হয়ে নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্বে মত্ত, বা লুট-তরাজের মাধ্যমে অবশিষ্ট মনুষ্যত্ব বিসর্জন দিয়ে পশুর অধম হয়ে পড়ছে মানুষ।
একটি ছেলে ছাড়া।
নিজের পরিবার, নিজের ভালোলাগা, সবকিছু ছেড়ে বেরিয়ে পড়ে সেই ছেলেটি। তাকে যেতে হবে বহু-বহু দূরে, যেখানে আছে এক মিনার, যার কাছে নাকি দেবতাদের দেখা মেলে।
নিষ্করুণ মরুভূমি, হিংস্র ও প্রতিহিংসাপরায়ণ দস্যুদল, মাটির নিচের বাসিন্দা ‘নরমাংসভোজী’ মানুষেরা, তুষারের ঝড়, ঈর্ষাকাতর দেবতার পাঠানো একের পর এক টোপ বা মৃত্যুবাহী ছোবল, এইসব অতিক্রম করে ছেলেটি কি পৌঁছতে পারবে সেই মিনারের কাছে?
কেউ কি থাকবে তার সঙ্গে শেষ অবধি?
কী হবে তার এই যাত্রার শেষে?
সুধী পাঠক মাত্রেই জানেন, শুধু একটি ‘কোয়েস্ট’ বা একটি চরিত্রের দুঃসাহসিক প্রয়াস কখনোই ফ্যান্টাসির উপজীব্য হয় না। এই বইয়েও লেখক দক্ষতার সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন জীবন সংগ্রামের সার সত্য: বিপদে হাল না ছেড়ে বরং নিজের দেহ ও মনকে মজবুত করে প্রত্যাঘাত করতে হয়। তার সঙ্গেই এসেছে আমাদের অতি পরিচিত মহাকাব্যে পড়া পুত্রস্নেহ ও রাজকর্তব্যের দ্বন্দ্ব। এসেছে বিশ্বাসে ভর দিয়ে কতটা পথ চলা যায়, সেই প্রসঙ্গ।
তা বলে লেখাটা কি নিখুঁত? মোটেই নয়। এদের যে দুর্বলতাগুলো আমার দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে সেগুলো হল:
(১) সবকিছু ঘটেছে ভীষণ সরলরৈখিক পথে।
(২) সব চরিত্র, বিশেষত খল চরিত্ররা এতটাই একমাত্রিক যে তারা মনে দাগ কাটতে পারে না।
(৩) ডিস্টোপিয়ান পৃথিবীতে সবচেয়ে আগে বিপন্ন হয় যে ইউনিটটি, সেই সংসারের বাঁধন একেবারে অটুট রেখে দিয়েছেন লেখক, যা অসম্ভাব্য।
(৪) লেখার শেষটায় বড়ো বেশি ‘বিশ্বাসে মিলায় বস্তু’ ভাব এসে গেছে, যেটা টোকিয়েন ও অন্যান্য কিংবদন্তি সাহিত্যিকের লেখায় দেখা যায় না।
কিন্তু তাও, সব মিলিয়ে, খুব সহজ ভাষায়, মূলত ইয়ং অ্যাডাল্ট বা কিশোর পাঠকদের জন্য লেখা এই ফ্যান্টাসিটি পড়লে দুটো কারণে আশাবাদী হওয়াই যায়:
১. এক নতুন লেখকের অনাড়ষ্ট কলমের সঙ্গে পাঠকের পরিচয় হল এই বইয়ের মাধ্যমে।
২. এই মুহূর্তে বাংলায় ছোটোদের জন্য বিবেক কুণ্ডু-র লেখায় বুমবুম সিরিজ, এবং বড়োদের জন্য কল্পবিজ্ঞানের মোড়কে মল্লিকা ধর-এর কিছু লেখা ছাড়া ফ্যান্টাসি তেমন নেই। ওপার বাংলায় শরীফুল হাসান তাঁর অসামান্য “সাম্ভালা” ট্রিলজিতে একই সঙ্গে এনেছিলেন মিথ, হরর, থ্রিলার, কোয়েস্ট, এবং ফ্যান্টাসির ক্লিফনোটস কৃত সংজ্ঞার বাস্তবায়ন (ফ্যান্টাসি ফিকশন হল এমন এক জঁর যাতে বর্ণিত ঘটনাবলি কখনোই বাস্তবে সম্ভবপর নয়)। আলোচ্য উপন্যাস সেই স্তরে পৌঁছতে পারেনি, হয়তো পৌঁছতে চায়ওনি। কিন্তু আগামী দিনে সুযোগ পেলে লেখক তাঁর কল্পনাশক্তি এবং সৃজনশীলতা কাজে লাগিয়ে নিঃসন্দেহে আমাদের আরো ব্যাপক, আরো গভীর, আরো ধারালো লেখা উপহার দেবেন।
অন্তত এটাই আমার বিশ্বাস।
পাঠ শুভ হোক।

Sunday, 22 October 2017

অনীশ দেব চরণকমলেষু, এবং সবুজের অভিযান



পাঠকের কাছে রহস্য কাহিনির আকর্ষণ ঠিক কোথায়?
ঊনবিংশ শতকে ছাপার খরচ কমে যাওয়ায়, এবং সাক্ষরতার হার বেড়ে যাওয়ায় পশ্চিমে পত্র-পত্রিকার সংখ্যায় কার্যত বিস্ফোরণ ঘটে। তখনই সম্পাদকেরা বোঝেন যে পাঠকদের টেনে রাখার জন্য তাঁদের দরকার এমন ধরনের লেখা যাকে ইংরেজিতে বলে সেনসেশনাল, আর হিন্দিতে সনসনিখেজ! বাংলায় এই শব্দটির নিকটতম প্রতিশব্দ বোধহয় রোমাঞ্চকর।

আলেকজান্দার দুমা থেকে জুল ভের্ন হয়ে এই ঘরানা ফ্রান্স থেকে ইংল্যান্ডে ঢোকেচার্লস ডিকেন্স-এর চেয়েও উইলকি কলিন্স এটির প্রয়োগ করতে বেশি সফল হন। ইতিমধ্যে আটলান্টিকের অন্য দিকে একটি মানুষ আধুনিক ইংরেজিতে গথিক বা ভয়াল রসের সাহিত্যের সূচনা করার পাশাপাশি গোয়েন্দা গল্পেরও গোড়াপত্তন করেছেন ঠিকই, কিন্তু সেই এডগার অ্যালেন পো প্রতিষ্ঠিত সাহিত্যিক ও সমালোচক মহলে সম্ভ্রমের বদলে নাসিকা-কুঞ্চন উৎপাদনেই সফল হয়ে অকালে প্রয়াত হয়েছেন।
আমেরিকা ও ইউরোপ, দু’জায়গাতেই পেনি ড্রেডফুল জাতীয় পত্রিকা ও বই এরপর দারুণ জনপ্রিয় হয়। সাহিত্য নিয়ে এই পত্রিকাগুলোর কোনো মাথাব্যথা ছিল না। এদের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল অপরাধের কথা বলে, ও সেই নিয়ে পুলিশি অনুসন্ধানের মোড়কে সমাজের উঁচু ও নিচু তলার মানুষদের নানাবিধ কেচ্ছা যথাসম্ভব রগরগে ভাষায় রঙ চড়িয়ে লিখে টু পাইস কামানো। অনেক কলমচিই এই ধারায় ‘লেখালেখি’ চালাতে উৎসাহ হয়েছিলেন
ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের দ্বিতীয় শহর কলকাতায় রহস্যরোমাঞ্চ কাহিনির আবির্ভাব এই সময়েই।
ঠগীদমনের ফলে খ্যাত ও শ্রদ্ধার পাত্র হিসেবে গণ্য উইলিয়াম হেনরি স্লিম্যান-এর অধীনে দারোগা বরকতউল্লাহ-এর কার্যকলাপ ‘বাঁকাউল্লার দপ্তর’ তুমুল জনপ্রিয় হয়েছিল, যদিও তার প্রেরণা ছিল ফ্রান্সের গোয়েন্দা ভিডকের স্মৃতিচিত্রণ, যা সমকালীন ইউরোপ জুড়ে আগ্রহ ও চাঞ্চল্যের সৃষ্টি করেছিল। এরই মাঝে, পেনি ড্রেডফুল ঘরানার নির্ভুল আত্তীকরণ তথা বঙ্গীকরণ করে ভুবনচন্দ্র মুখোপাধ্যায়-এর “হরিদাসের গুপ্তকথা” নানা নামে ও রূপে প্রকাশিত হয় ১৮৭০ থেকে ১৮৭৯ সাল অবধি। ১৮৮৮ সালে গিরিশচন্দ্র বসু ডাকাতি তথা অন্যান্য অপরাধ দমনের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখেন ‘সেকালের দারোগার কাহিনি’।

রহস্য কাহিনি বলতে আমরা যা বুঝি সেটা হয়তো এভাবেই চলত, কিন্তু অবস্থাটা হঠাৎ বদলে গেল। শিল্প-বিপ্লবের ফায়দা তোলা ও সাম্রাজ্যবিস্তারের মাধ্যমে ক্ষমতার শীর্ষে থাকা দেশটির রাজধানীতে এমন একঝাঁক খুন হল, বীভৎসতা ও দুর্বোধ্যতায় যাদের জুড়ি মেলা ভার।
১৮৮৮ সালের ৩১শে অগস্ট, ৮ই সেপ্টেম্বর, ৩০শে সেপ্টেম্বর (দু’বার!), এবং ৯ই নভেম্বর। লন্ডনের হলদেটে কুয়াশায় ভেজা স্যাঁতসেঁতে রাতে, হোয়াইটচ্যাপেল-স্পিটালফিল্ডস এলাকার পাঁচজন মহিলা, যারা প্রত্যেকেই ছিল দারিদ্র্য, অশিক্ষা, অপুষ্টির শিকার, মদের খরচ তোলার জন্য যাদের ক্যাজুয়াল প্রস্টিট্যুশন (মাফ করবেন, এই শব্দবন্ধের যথাযথ বাংলা আমার জানা নেই)-এর রাস্তা বেছে নিতে হয়েছিল, আক্ষরিক অর্থেই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল এক অজানা আততায়ীর ছুরিতে।
অজানা, কারণ লন্ডন, ইংল্যান্ড, ইউরোপ হয়ে সারা পৃথিবীতে আলোড়ন সৃষ্টিকারী এই খুনিকে পুলিশ ধরতে পারেনি। হাওয়ায় মিলিয়ে গেছিল জ্যাক দ্য রিপার নামে কুখ্যাত সেই খুনি। সিরিয়াল কিলার তার আগেও এসেছিল, পরেও এসেছে অনেক। কিন্তু রিপার কিলিংস আক্ষরিক অর্থেই ইতিহাস গড়েছিল।
কেন?
হঠাৎ প্রশাসন, পুলিশ, খবরের কাগজের এক-একটি সংস্করণ প্রকাশের ঘন্টাখানেকের মধ্যে কিনে ফেলা পাঠকেরা, এবং তাদের তথা বাজারের গতিপ্রকৃতি বুঝতে সদা সচেষ্ট প্রকাশনা শিল্প দুটো জিনিস বুঝতে পারল।
প্রথমত, ধর্ম-অর্থ-কাম-মোক্ষ দিয়ে সব হত্যার নাগাল পাওয়া শক্ত। মানুষের মন সরলরেখায় চলে না, আর সেজন্যই খুনিকে ধরার আপ্রাণ চেষ্টা করেও সন্দেহভাজনদের লম্বা তালিকা ছাড়া কিছুই জোগাড় করে উঠতে পারেনি পুলিশ বা প্রেস।
দ্বিতীয়ত, সব অপরাধের সমাধান করার ক্ষমতা, বা দক্ষতা পুলিশেরও নেই! রাষ্ট্র এই ধারণাটির স্বীকৃতি দেওয়ার আগেই পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝলেন এক মার্কিন প্রকাশক। পোর্টসমাউথে বসে পশার জমানোয় ব্যর্থ এক চিকিৎসক-এর লেখা একটি উপন্যাস ১৮৮৭-র ‘বিটন’স ক্রিসমাস অ্যানুয়াল’-এ প্রকাশিত হয়েছিল ‘আ স্টাডি ইন স্কারলেট’ নামে। বই হয়ে বেরোনোর পরেও তেমন একটা মারমার-কাটকাট জনপ্রিয়তা পায়নি লেখাটা, কিন্তু সাহিত্যের ইতিহাসে প্রথম পেশাদার কনসাল্টিং ডিটেকটিভের আবেদন বুঝতে সাগরপাড়ের মানুষটির দেরি হয়নি। অতঃপর লেখকের সঙ্গে চুক্তি, সাউথ সি-তে নিজের ফাঁকা চেম্বারে বসে আর্থার কোনান ডয়েল-এর কলম সঞ্চালন, ফেব্রুয়ারি ১৮৯০-এ ‘লিপিনকট’স ম্যাগাজিন’-এ প্রকাশিত “দ্য সাইন অফ ফোর” নামক উপন্যাসে শার্লক হোমস নামক মানুষটির পুনরাবির্ভাব
বাকিটা ইতিহাস।
অ্যালান মুর তাঁর ‘ফ্রম হেল’ উপন্যাসে দাবি করেছেন, তৎকালীন সমাজব্যবস্থায় পরস্পরবিরোধী অজস্র টানাপোড়েনের ফলে জ্যাক দ্য রিপারের মতো এক খুনির আবির্ভাব অবধারিত ছিল, যেমন অনিবার্য ছিল বিংশ শতকে অ্যান্টি-সেমিটিক ধ্যানধারণার প্রসারের ফলে হিটলারের উত্থান। অন্তত রহস্যরোমাঞ্চ সাহিত্যের ইতিহাস দেখলে এই কথাটা প্রমাণিত হয়, কারণ সমাজের দর্পণ হিসেবে সাহিত্য মানুষের ভয়ের জায়গাগুলো সব সময় ছুঁয়ে যেতে চায়। তাই বিংশ শতকেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ট্রেঞ্চ ওয়ারফেয়ারের নারকীয়তা আর বিষাক্ত গ্যাসের ধোঁয়া পাওয়া যায় দুই বিশ্বযুদ্ধের মাঝে বিভিন্ন রহস্য কাহিনিতে খুনের উপকরণ হিসেবে বিষের ব্যবহারে। আমেরিকায় সমৃদ্ধি আর তার পরের ‘গ্রেট ডিপ্রেশন’-এর প্রতিধ্বনি শোনা যায় এলেরি কুইনের হাস্যরস মিশ্রিত বুদ্ধিদীপ্ত গোয়েন্দা গল্পের যুগাবসান হয়ে ড্যাশেল হ্যামেট ও রেমন্ড শ্যান্ডলার-এর হার্ড বয়েল্ড ঘরানার অভ্যুদয়ের মাধ্যমে। এবং দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধোত্তর পৃথিবীর ঠাণ্ডা লড়াই তার লম্বা ছায়া ফেলে জেমস বন্ড থেকে ব্যাটম্যান, স্পেন্সার থেকে অ্যালেক্স ক্রস, এই সব রকমের গোয়েন্দার কীর্তিকলাপে।

বাংলায় রহস্যরোমাঞ্চ নিয়ে জনপ্রিয় ‘সাহিত্য’ রচনার ক্ষেত্রে প্রিয়নাথ মুখোপাধ্যায়-এর ‘দারোগার দপ্তর’-কে পথিকৃৎ বলা চলে। ১৮৯৩ সালে প্রথম খণ্ড প্রকাশের পর থেকেই বেস্টসেলার হয়ে যায় বইটি। কিন্তু এরপর আর পুলিশি গোয়েন্দাদের কেন্দ্রে রেখে বাংলায় বেশি লেখালেখি হয়নি। বেকার স্ট্রিটের খড়্গনাসা পাইপমুখো নিঃসঙ্গ গোয়েন্দাটির ধাঁচেই সেই সময়ের অপ্রতিদ্বন্দ্বী লেখক পাঁচকড়ি দে ১৮৯৯-এ গ্রন্থাকারে প্রকাশিত ‘মায়াবিনী’-তে আনেন গোয়েন্দা দেবেন্দ্রবিজয়-কে।
১৩০৬ বঙ্গাব্দে গোয়েন্দা গল্প লিখে কুন্তলীন গল্প প্রতিযোগিতায় প্রথম পুরস্কার পান রজনীচন্দ্র দত্ত। দ্বিতীয় স্থানাধিকারী দীনেন্দ্রকুমার রায় পরবর্তী কালে তাঁর প্রটাগনিস্ট রবার্ট ব্লেক-কে কেন্দ্রে রেখে প্রচুর রহস্য গল্প লেখেন। মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য-র হুকাকাশি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র ঘরানার রহস্যভেদী হলেও হেমেন্দ্রকুমার রায়-এর জয়ন্ত (সঙ্গে মানিক ও সুন্দরবাবু) মোটামুটি হোমসীয় ধারাকেই অব্যাহত রাখে। তারপর, ‘মাসিক বসুমতী’ পত্রিকার মাঘ ১৩৩৯ সংখ্যায় শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়-এর “পথের কাঁটা” গল্পে আত্মপ্রকাশ করে বাঙালির একান্ত নিজস্ব সত্যান্বেষী ব্যোমকেশ বক্সী।
ব্যোমকেশের কাহিনিগুলোয় চোর-পুলিশ খেলা, বা অপরাধী ও সত্যান্বেষীর মধ্যে ক্যাট অ্যান্ড মাউজ গেম-এর বদলে সমাজজীবনের সংকটগুলো ফুটে ওঠে স্পষ্ট ভাবে, অনুপম ভাষায়। শরদিন্দু সচেতনভাবে লেখাগুলোতে এক বৌদ্ধিক ব্যাপ্তি দিতে চেয়েছিলেন বলেই হয়তো ব্যোমকেশের গল্পগুলো এই বদলে যাওয়া সময়ে, যখন প্রাইভেট ডিটেকটিভ ধারণাটাই আস্তাকুঁড়ে নিক্ষিপ্ত হয়েছে, এবং সারভেইল্যান্স নামক বস্তুটির মাধ্যমে রাষ্ট্র বিগ ব্রাদার হয়ে আমাদের জান-মালের দায়িত্ব নেওয়ার নামে ঢুকে পড়ছে ঘরের কোণে, দারুণ ভাবে জনপ্রিয় রয়ে গেছে।

তাহলে, এই সময়ের এক নতুন লেখক যখন রহস্যকাহিনি লেখেন, তখন তাঁর লক্ষ্য কী হয়? এলেরি কুইন স্টাইলে ফেয়ার প্লে মিস্ট্রি লেখা, যেখানে সব ক্লু দেওয়া থাকে পাঠকের সামনে, আর তাঁকে চ্যালেঞ্জ করা হয় রহস্যটি সমাধান করার জন্য?
হোমস ঘরানার সঙ্গে অ্যাকশন মিশিয়ে, অর্থাৎ ১৯৬৫-৬৬-তে ‘ফেলুদার গোয়েন্দাগিরি’ ও ‘বাদশাহি আংটি’-তে প্রতিষ্ঠা করা শ্রী প্রদোষ চন্দ্র মিত্র-র গল্পগুলোর ধাঁচে নারীচরিত্র-বর্জিত শিশুপাঠ্য গল্প লেখা?
ব্যোমকেশের মতো এক সত্যান্বেষী নির্মাণ করা, যার চোখে ধরা পড়বে সমাজের ফাটলগুলো, যার বুদ্ধির ছটায় ছিন্নভিন্ন হবে সংস্কার আর উপেক্ষার মাকড়সার জাল?
নাকি তিনি আনবেন এক আউটসাইডার-কে, যাঁর বুদ্ধির দীপ্তি পুলিশকে সাহায্য করবে অপরাধীকে গ্রেপ্তার করতে?
একথা বুদ্ধিমান মাত্রেই মানবেন যে আজকের সক্রিয় মিডিয়া এবং আইনি জটিলতা অধ্যুষিত সময়ে শেষেরটিই একমাত্র পথ। অপরাধ নিয়ে মাথা ঘামানোর ব্যাপারে পুলিশ, সি.বি.আই, ল’ইয়ার, এঁরা ছাড়া আর কারো অধিকার স্বীকার করে না রাষ্ট্র।
বাংলায় রহস্যরোমাঞ্চ সাহিত্যের কম্পমান শিখাটিকে দীর্ঘদিন নিজের দু’হাতের মাঝে সযত্নে লালন করেছেন যে অনীশ দেব, আজ তাঁরই জন্মদিন। তিনি যে সীমিত সংখ্যক গোয়েন্দা গল্প লিখেছেন, তাতেও রহস্যভেদে মুখ্য ভূমিকা নিয়েছিলেন অধ্যাপক অশোক চন্দ্র গুপ্ত, তথা এ.সি.জি, যিনি তাঁর ছাত্র, বদরাগি পুলিশ অফিসার রঘুপতিকে সাহায্য করেন নানা অপরাধের কিনারা করে অপরাধীর বিরুদ্ধে কাস্ট-আয়রন কেস সাজাতে।
কাকতালীয় হলেও এটাই সত্যি যে আজ আমি মনোরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়-এর লেখা যে রহস্যকাহিনির সংকলনটি পড়লাম, সেই “শোণিত ধারায় সাত”-এর সাতটির মধ্যে ছ’টিতেই রহস্যভেদীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন রসায়নের অধ্যাপক সুদর্শন ভট্টাচার্য।
কিন্তু বইটা হয়েছে কেমন?

বাংলায় প্রাতিষ্ঠানিক স্বজনপোষণ এবং ভাড়াটে সমালোচকদের অভিমতের দুষ্টচক্রকে তুশ্চু করে নতুন লেখকদের আত্মপ্রকাশের মঞ্চ গড়ে দেওয়ায় বিরাট ভূমিকা নিয়েছে যে নতুন প্রকাশনা সংস্থাগুলো, তাদের মধ্যে বিভা পাবলিকেশন অগ্রগণ্য। এই সংস্থা থেকে প্রকাশিত বইপত্রের সঙ্গে আমার পরিচয় অনেক দিনের। প্রসেনজিৎ বন্দ্যোপাধ্যায়-এর মতো ধারালো এবং প্রথা-বহির্ভূত বিষয় নিয়ে গল্প রচয়িতার দু’টি গল্প-সংকলন-ই প্রকাশ করেছে বিভা। গত বছরের সেরা থ্রিলার, এবং বাংলায় একান্ত বিরল ইতিহাস-আধারিত টেকনো থ্রিলার-এর একমাত্র সার্থক নিদর্শন, দেবারতি মুখোপাধ্যায়-এর “ঈশ্বর যখন বন্দি”-ও প্রকাশ করে বিভা-ই। তাই তুলনামূলক ভাবে নবীন গল্পকার মনোরঞ্জন চট্টোপাধ্যায়-এর সাতটি রহস্য গল্পের সংকলন যখন বিভা থেকেই প্রকাশিত হয়, তখন বইটি নিয়ে আমার প্রত্যাশা ছিল বিপুল।
কিন্তু বইয়ের গল্পগুলো নিয়ে আলোচনার আগে, যে খারাপ জিনিসগুলো আমাকে পদে-পদে দস্তুরমতো কষ্ট দিয়েছে, সেগুলোর কথা আগে লিখি: -
১. প্রত্যেক পাতায় অন্তত গোটা পাঁচেক ছাপার এবং/অথবা বানান ভুল।
২. ‘ওনার’/’উনার’-এর মতো অশুদ্ধ অভিব্যক্তিতে লেখাগুলো বোঝাই থাকা।
৩. কোথায় ‘ওঁর’ হয়, আর কোথায় ও’র হয়, সেই ধারণা না থাকা।
৪. অভিভাবকদের কথাবার্তা প্রসঙ্গে আপনি/উনি আর তুমি/সে গুলিয়ে ফেলা।
৫. ফরম্যাটিং-এর সময় রহস্যকাহিনির উপযোগী ছোটো-ছোটো অনুচ্ছেদে লেখাকে না ভেঙে একটানা লিখে যাওয়া, যার ফলে গুরুত্বপূর্ণ তথ্যও পাঠকের কাছে বিরক্তিকর ঠেকবে।
৬. অপ্রয়োজনীয় কথা, বিশেষত কেন্দ্রীয় চরিত্র কী করেন ও কেন করেন সেটা প্রত্যেক গল্পে ফলাও করে, বার-বার বলা।

এবার আসি গল্পগুলোর কথায়। সূচিপত্র অনুযায়ী নয়, বরং গল্পগুলো আমি যেভাবে পড়েছি সেইভাবেই লিখছি।
(১) অতীতের অস্ত্রোপচার: ‘কিশোর ভারতী’ পত্রিকায় জুলাই ২০১৭ সংখ্যায় প্রকাশিত এই গল্পটি ‘ওল্ড সিনস কাস্ট লং শ্যাডোজ’ ধারণাটির সার্থক রূপায়ন। রহস্যভেদে কয়েকটা ফাঁক থাকলেও, এবং অপরাধী বেশ সহজেই চিহ্নিত হয়ে গেলেও গল্পটা টাইট, এবং সুখপাঠ্য।
(২) অপরিমেয়: ‘আনন্দমেলা’-তে জুলাই ২০১৭-তেই প্রকাশিত হয় এই গল্পটি। কিঞ্চিৎ কষ্টকল্পিত হলেও অংকের ব্যবহা এই গল্পকে এমন একটি মাত্রা দিয়েছে যে এটিকে এই সঙ্কলনের শ্রেষ্ঠ গল্প বলাই চলে।
(৩) আলোছায়া স্টুডিও: বুদ্ধিদীপ্ত এবং কিছুটা নন-লিনিয়ার ধাঁচে লেখা হলেও একে গোয়েন্দা গল্প নয়, বরং রহস্য গল্প বলাই সঙ্গত। তথ্যপ্রমাণের বদলে অনুমান-উপমানের সাহায্যে এই গল্প যেখানে গিয়ে থেমেছে, সেখান থেকে আইনের চোখে ধৃত সন্দেহভাজনদের শাস্তি দেওয়ার কথা ভাবলে ‘হানোজ দিল্লি দূর অস্ত’ কথাটাই মনে আসে।
(৪) পুরাতন খেলা: এই গল্পেও রহস্য আছে। “ওয়ান্স ইউ এলিমিনেট দ্য ইম্পসিবল, হোয়াটেভার রিমেইনস, নো ম্যাটার হাউ ইমপ্রবেবল, মাস্ট বি দ্য ট্রুথ” ম্যাক্সিম মেনে তার একটা সমাধানও আছে। কিন্তু আইনের হাত এখানেও অপরাধীর নাগাল পায়নি।
(৫) দুই শতাব্দী পরে: অত্যন্ত আকর্ষণীয় বিষয় নিয়ে লেখা হয়েছে এই গল্পটি। একটু যত্ন নিয়ে, আরেকটু গবেষণা আর জায়গা নিয়ে লিখলে, সর্বোপরি দুই শতাব্দীতে আমূল বদলে যাওয়া ভূগোলের বাধা এড়িয়ে কীভাবে গুপ্তধন পুনরুদ্ধার সম্ভব তা বিশ্বাসযোগ্য উপায়ে উপস্থাপন করতে পারলে এই গল্পটি প্রয়াত গবেষক চিত্রা দেব-এর সৃষ্ট গোয়েন্দা সঞ্জয়-এর ইতিহাস ও অপরাধ মেশানো রহস্যভেদের কাহিনি ‘সিদ্ধিদাতার অন্তর্ধান’ ও ‘রূপমতীর মালা’-র সার্থক অনুসারী হতে পারত।
(৬) লালবাবুর নাতনি: একটি উৎকৃষ্ট সাইকোলজিক্যাল থ্রিলার হয়ে উঠতে পারত এই গল্পটি, যদি লেখক ফরম্যাটিং এবং অনুচ্ছেদ-বিভাজনের মাধ্যমে গল্পটাকে ক্লাস ইলেভেনের রচনার মতো করে না লিখে আরো গতিময়, আরো টানটান করে সাজাতেন।
(৭) ঘাতক সম্মেলন: আগাথা ক্রিস্টির ‘কার্ডস অন দ্য টেবল’-এর মতো একটা ছকে শুরু হয়েও গল্পটা নিছক রহস্যভেদের কাহিনি হয়নি, বরং অত্যন্ত বুদ্ধির সঙ্গে লেখক ছকটিকে কাঠামো হিসেবে ব্যবহার করে মনস্তত্ত্বের একটি জটিল দিক তুলে ধরেছেন, যাতে ‘ক্রাইম ডাজ নট পে’ কথাটি ফুটে উঠেছে জোরালো আকারে।

সামগ্রিকভাবে আমি দু’টি মাত্র কথা বলতে পারি।
প্রথমত, এই সময়ের অত্যন্ত ব্যতিক্রমী একটি রহস্য কাহিনির সঙ্কলন হল এই বইটি। এর প্রতিটি গল্প অন্যের চেয়ে আলাদা। এদের পেছনে লেখকের ভাবনার যে স্বকীয়তা ও স্বাতন্ত্র্য ধরা পড়েছে তা দস্তুরমতো ঈর্ষণীয়। এমতাবস্থায়, মাত্র ১৪৪ টাকা দামের এই বইটি কিনতে দ্বিধাবোধ করলে পাঠকের লোকসান।
দ্বিতীয়ত, বিভা পাবলিকেশন অবিলম্বে একজন পেশাদার কপি এডিটর নিয়োগ না করলে, এবং সেই এডিটর সংসদ বা আকাদেমির বানানরীতি বিষয়ে অভিজ্ঞ না হলে, আমি তো বটেই, অন্য পাঠকেরাও এই প্রকাশনাকে হাবিজাবি পাবলিকেশন নামে ডাকতে শুরু করবে।


পাঠ শুভ হোক।

Sunday, 15 October 2017

পাহাড়ের মানুষ পাহাড়ের গল্প



  • বইয়ের নাম: পাহাড়ের মানুষ পাহাড়ের গল্প
  • লেখক: গৌতম চক্রবর্তী
  • প্রকাশক: দ্য কাফে টেবল
  • পেপারব্যাক, ১৩৬ পৃষ্ঠা, ১৫০/- টাকা
এক-একটা বইয়ের রিভিউ হয় না।
সেই বইয়ে আলাদা করে থাকে না কোনো নায়ক, প্রতিনায়ক, বা নায়িকা।
সেই বইয়ে তেমন কোনো গল্পও থাকে না আলাদা করে।
অথচ, তার পাতায়-পাতায় ছড়িয়ে থাকে জীবনের মহীরুহ থেকে ঝরে পড়া অনেক শুকনো পাতা, আর ভেজা গন্ধ।
তার দু’মলাটের মধ্যে ধরা থাকে অনেক হাসি আর হইচই-এর আওয়াজ, অনেক কান্নার শুকনো দাগ, অনেক স্বপ্ন ভেঙে যাওয়ার ব্যথা, অনেক না-বলা রোমান্স, অনেক-অনেক লড়াই।
আর দুর্জয় আশা।
কী বলা যায় তেমন বইকে?
দিনলিপি? রিপোর্টাজ?
অলীক কথন?
মাত্র ১৩৬ পৃষ্ঠার, দেড়শো টাকা দামের যে বইটি নিয়ে আজ লিখতে বসেছি, সেটি বোধহয় ওই শেষ বর্গে শামিল-যোগ্য।
কল্যাণ দাস-এর আঁকা পাহাড়ি কুয়াশার মতো আধেক জমাট, আধেক ধোঁয়াটে ছবিগুলোয় সাজানো, ছোটো-ছোটো ৩২টি ভিনিয়েট (vignette) নিয়ে গড়ে উঠেছে এই বইটি। এতে উঠে এসেছে পাহাড়ের মানুষের সরল, সৎ, পরিশ্রমী, কখনও-হার-না-মানা মনোভাব, তাদের জীবনসংগ্রামের বিচিত্র গল্পকথা, তাদের হার আর জিৎ।
তার সঙ্গেই, প্রতি পদে, এই লেখাগুলো বুঝিয়ে দিয়েছে, শহরের অর্থ আর আলোয় ঠাসা আমাদের জীবন আসলে কতটা ফাঁপা, আর ক্ষেত্রবিশেষে নিরর্থক।
সংসারত্যাগী সন্ন্যাসীর মতো আকাশপানে চেয়ে থাকা ওই পাহাড়ের কোলে যারা থাকে, তাদের সঙ্গে আমাদের মিলের চেয়ে অমিল বেশি হওয়াটাই স্বাভাবিক। কিন্তু এখন, যখন সেই পাহাড়ে শান্তি রাখতে গিয়ে, কিছু লোভী আর ধান্দাবাজ মানুষের ক্ষমতার খেলায় বোড়ে হয়ে ঝরে যাচ্ছে অমিতাভ মালিকের মতো তাজা প্রাণ, তখন এই বইটাই আঁকড়ে ধরতে ইচ্ছে হল বড়ো বেশি করে।
ভীষণ সহজ ভাষায় আর ভঙ্গিতে লেখা, পাহাড়ের মানুষের এই চাওয়া-পাওয়া, আকাঙ্ক্ষা-স্বপ্নভঙ্গ, হেরেও ফিরে আসার কথাগুলো পড়ে মনে হল, বারুদের গন্ধ বা রক্ত নয়, নীল আকাশের বুকে মাথা তোলা কাঞ্চনজঙ্ঘা আর সবুজের বুক চিরে ছুটে যাওয়া তিস্তা-রঙ্গিতের মাঝের পৃথিবীর মানুষগুলোকেই যেন আবার অনুভব করলাম।
ধন্যবাদ কাফে টেবল। আপনারা এগিয়ে না এলে আমরা এই সরল, নিরহংকার, অভিমানী লেখাগুলো ছাপার অক্ষরে পেতাম না।
শুধু পরের বার টাইপোগুলো শুধরে নেবেন। এমন গৈরিকবসন বইয়ে ওই মালিন্য মানায় না।