Monday, 27 August 2018

কেউ কি আছেন? #১


উচ্চ মাধ্যমিকে সরকারি ইংরেজি বইয়ে একটা কবিতা ছিল। কবিতাটা পড়েননি এমন মানুষ পাওয়া কঠিন। তবু লোভ সামলাতে না পেরে তুলেই দিলাম আরেকবার:
‘Is there anybody there?’ said the Traveller,
Knocking on the moonlit door;
And his horse in the silence champed the grasses
Of the forest’s ferny floor:
And a bird flew up out of the turret,
Above the Traveller’s head:
And he smote upon the door again a second time;
‘Is there anybody there?’ he said.
But no one descended to the Traveller;
No head from the leaf-fringed sill
Leaned over and looked into his grey eyes,
Where he stood perplexed and still.
But only a host of phantom listeners
That dwelt in the lone house then
Stood listening in the quiet of the moonlight
To that voice from the world of men:
Stood thronging the faint moonbeams on the dark stair,
That goes down to the empty hall,
Hearkening in an air stirred and shaken
By the lonely Traveller’s call.
And he felt in his heart their strangeness,
Their stillness answering his cry,
While his horse moved, cropping the dark turf,
’Neath the starred and leafy sky;
For he suddenly smote on the door, even
Louder, and lifted his head: —
‘Tell them I came, and no one answered,
That I kept my word,’ he said.
Never the least stir made the listeners,
Though every word he spake
Fell echoing through the shadowiness of the still house
From the one man left awake:
Ay, they heard his foot upon the stirrup,
And the sound of iron on stone,
And how the silence surged softly backward,
When the plunging hoofs were gone.
১৯১২ সালে, কন্সটেবল অ্যান্ড কোম্পানি থেকে প্রকাশিত হয়েছিল ওয়াল্টার ডি লা মেয়ার-এর কবিতা-সংকলন ‘দ্য লিসেনার্স অ্যান্ড আদার ভার্সেস”। তাতেই আত্মপ্রকাশ করে, এবং তারপর থেকে অগণন বই ও সংকলনে স্থান পায় “দ্য লিসেনার্স” নামের এই কবিতাটা। এর থিম, সারসংক্ষেপ, কে এসেছিল, কেন এসেছিল... এমন অনেক প্রশ্নের উত্তর মুখস্থ করতে হয়েছিল তখন। ‘থ্রি মেন ইন আ বোট’-এর নির্বাচিত অংশ (প্যাকিং), বা জিম করবেট-এর ‘কুঁয়ার সিং’ এর মতো করেই পড়েছিলাম কবিতাটা। কিন্তু অজস্র ভূতের, ভয়ের, রোমাঞ্চের, আছে-কি-নেই-এর গল্প পড়ার ফাঁকে ওই প্রথম লাইনটা মাথায় থেকেই গেছিল।
“ইজ দেয়ার এনিবডি দেয়ার?”
কেউ আছেন?

এই ব্যাকুল প্রশ্নটা মানুষ যুগ-যুগ ধরে ছুড়ে দিয়েছে অজানার উদ্দেশে। সমুদ্রের গভীরে আটলান্টিস বা নিবাতকবচদের খুঁজে বেড়ানো, অনন্ত মহাশূন্যে প্রাণ ও বুদ্ধিমত্তার সন্ধানে অকাতরে অর্থ, শ্রম, মেধার বিনিয়োগ,... এমনকি মৃত্যুর পরেও থেকে যাওয়া কোনো রেশ, কোনো উপস্থিতির প্রমাণ পাওয়ার চেষ্টা, সবেতেই আছে ওই একটা প্রশ্ন।
কেউ আছেন?
কিন্তু কেন? কেন আমরা নিজেদের বন্ধু, স্বজন, সহকর্মী, পেশাগত বা ব্যক্তিগত শত্রু, এদের নিয়েই সন্তুষ্ট থাকতে পারি না?
কেন আমাদের তার পরেও খুঁজতে হয় জলের নীচে লুকিয়ে থাকা মৎস্যকন্যা বা জায়ান্ট স্কুইডের মতো রহস্যময় কোনো প্রাণী?
কেন আমাদের চারপাশে এত মানুষ, এত কিছু থাকা সত্বেও আমরা ছুটে যাই নির্জন মরুভূমি বা পাহাড়চূড়ায়, আর তারপর রেডিও টেলিস্কোপ বাগিয়ে ক্র্যাব নেবুলায় খুঁজি প্রাণের স্পন্দন?
কেন আমরা নিজেদের ওজনদার অস্তিত্বের পরোয়া না করে ধাওয়া করি একটোপ্লাজম বা নড়ন্ত টেবিলের পেছনে?
এই প্রশ্নের উত্তর আমি দিতে পারব না। “যাহা পাই, তাহা চাই না।” মানসিকতা থেকেই আজকের মানুষ রক্তমাংসের সম্পর্কের বদলে ভার্চুয়াল সম্পর্কে বেশি আগ্রহী, এমনটা অনেক বিদ্বান বলে থাকেন। আমি মুখ্যু, তাই এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার সাহসই করব না।
কিন্তু একটা প্রশ্নের উত্তর আমাকে প্রায়ই দিতে হয়। ভাই-বোনেদের আসরে, বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডায়, এমনকি মেয়েকে পড়াতে গিয়েও।
“ভূত বলে কি কিছু আছে?”
কেন আমাকে এই প্রশ্ন করা হয়, জানি না। সম্ভবত আমাকে প্রচুর বই পড়তে দেখে ভাবা হয়, আমি এই ব্যাপারে ‘অথরিটি’। মুশকিল হল, আমি ভূতের বা ভয়ের গল্প পড়েছি সহস্রাধিক। কিন্তু সত্যি-সত্যি এমন কিছু আছে কি না, বা থাকলে তার কী ধরনের প্রকাশ বা ম্যানিফেস্টেশন হয়, সেই নিয়ে আমার ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা আছে মাত্র খানতিনেক।
না, সেগুলো নিয়ে আমি কিচ্ছু লিখব না। ওগুলো লেখার নয়, বলার জিনিস, বিশেষত বাইরে যখন রাত ঝিমঝিম করবে, আর বৃষ্টিমাখা হাওয়া জানলায় আছড়ে পড়বে।
তাহলে আমি কী লিখব?
আমি লিখব একটি ঢপের চপের কথা, যার সামনে যাদবপুরের স্বর্গত মিলনদার ক্যান্টিনের ঢপ-ও ফেল মেরে যেত।

স্বামী অভেদানন্দ রচিত “মরণের পারে” বইটির সঙ্গে আপনার নিশ্চয় পরিচয় আছে। সোশ্যাল মিডিয়ায় যখন গালাগাল দেওয়ার বিষয় থাকে না, যখন নেইমার থেকে রাগা/নমো, রঞ্জন বাঁড়ুজ্জে থেকে আবাপ কিছুই আর চাংগায়নী সুধা হিসেবে কাজ করে না, তখন লোকে এই বইটার ওপর হামলে পড়ে। একথা অনস্বীকার্য যে গাঁজার ধোঁয়া বা একটোপ্লাজমে পরিপূর্ণ এই বইয়ের মতো খোরাক সচরাচর পাওয়া যায় না, কিন্তু মরা ঘোড়াকে চাবকানো আমার উদ্দেশ্য নয়। প্রায়ই ‘প্রামাণ্য’ হিসেবে উদ্ধৃত, আদতে অট্টহাসির মশলা এই বইটিকে নিয়ে আমি কিছু লিখব না। বরং আমি আপনাদের সামনে পেশ করব আসলি চিজ: জেরাল্ড ব্রিটল-এর লেখা “দ্য ডেমনোলজিস্ট: দ্য এক্সট্রাঅর্ডিনারি ক্যারিয়ার অফ এড অ্যান্ড লোরেইন ওয়ারেন”।

নামেই প্রকাশ, বইটি এডওয়ার্ড ওয়ারেন এবং লোরেইন ওয়ারেনের ডেমন-বিতাড়নমূলক কার্যকলাপের খতিয়ান।
প্রথম প্রশ্ন, ডেমন কী?
আদতে গ্রিক শব্দ ডেইমিনিয়ন মানে হল স্পিরিট (আত্মা?) বা দৈব শক্তি। একে সকর্মক একটি শক্তি বা উপস্থিতি হিসেবেই দেখা হত। প্লেটো একে সক্রেটিসের অনুপ্রেরণা-দাতা হিসেবেও চিহ্নিত করেছিলেন। কিন্তু বাইবেলের আদিযুগে, এবং মধ্যযুগে তার কঠোরতর ব্যাখ্যা করার সময় স্থানীয় কিংবদন্তি ও ইহুদি বিশ্বাস বা সংস্কার মিশিয়ে একে এক ক্ষতিকারক শক্তি বলে বোঝানো হয়। এও বলা হয় যে দৈবশক্তির অপব্যবহারে ইচ্ছুক মানুষেরা এই ডেমনকে আহ্বান করে তাকে দিয়ে নানা কাজ করাতে পারেন।
আলোচ্য বইয়ে বর্ণিত নানা ঘটনা বা ‘কেস’-এ ডেমন বলতে বোঝানো হয়েছে এক অশরীরী উপস্থিতিকে, যে কোনো বাড়িতে এসে, কোনো বস্তু বা ব্যক্তির ঘাড়ে চেপে বা তাকে ‘পজেস’ করে ভয়ানক সব কাণ্ডকারখানা ঘটিয়েছে।
দ্বিতীয় প্রশ্ন, এডওয়ার্ড ও লোরেইন ওয়ারেন কারা?

মার্কিন নেভি, ও পরে পুলিশের চাকরি থেকে অবসর নেওয়া এডওয়ার্ড ওয়ারেন ছিলেন এক স্বশিক্ষিত ওঝা। কথাটা শুনলে খেলো শোনাচ্ছে, তাই না? কিন্তু বাস্তবে ব্যাপারটা তাই। ভদ্রলোক বই পড়ে বুঝে ফেলেন, মশারির বাইরে মশার মতোই আমাদের চেতনার বাইরের এক জগতে ভনভন করছে দুষ্ট আত্মা বা ডেমনেরা। লোরেইন ওয়ারেন এডওয়ার্ডের স্ত্রী, এবং তাঁর ঘোষণামাফিক ক্লেয়ারভয়েন্ট (মানে দৃষ্টির অগোচরে ঘটা কার্যকলাপ বুঝতে সক্ষম) ও ‘লাইট মিডিয়াম’। শেষোক্ত বিশেষণটি গাত্রবর্ণ ভাববেন না, মিডিয়াম হলেন প্ল্যানচেট বা সিঁয়াস-এ আগত আত্মার একমাত্র মুখপত্র।
সব দেশে, সব কালেই মানুষের মনের দুর্বলতা বা ভয়কে নিয়ে ব্যবসা করেছেন মূলত ‘বাবা’-রা (যাদের মধ্যে প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের ধ্বজাধারীরাও আছেন, কারণ ওগুলো সবই ভয়ঙ্কর রকম পুরুষতান্ত্রিক), মাঝেসাঝে ‘মা/দেবী’-রা, আর তাঁদের প্রবক্তা/দালালরা। কিন্তু ওয়ারেন দম্পতি অতি বিশিষ্ট হয়ে আছেন একটিই কারণে।
একমাত্র তাঁদের কীর্তিকলাপ তথা ডেমন-বিতাড়ন নিয়েই হলিউড নামিয়েছে এক-আধখানা নয়, বহু সিনেমা!
উক্ত বইটি সেইরকম রোমহর্ষক কিছু কেসের রেকর্ড।
কী রকম কেস?

১৯৫২ সালে ওয়ারেনরা ‘নিউ ইংল্যান্ড সোসাইটি ফর সাইকিক রিসার্চ’ প্রতিষ্ঠা করেন। সমমনস্ক লোকজন, এবং আমেরিকায় অ্যাপারেন্টলি গিজগিজ করা ভূতপ্রেতদের খুঁজে বের করা ও তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করে দিব্যি তাঁদের দিন কাটছিল। কিন্তু ১৯৭০ সালে ওয়ারেন দম্পতি তাঁদের ক্যারিয়ারের প্রথম জাঁকালো কেসটি পান।
নার্সিং পাঠরত এক ছাত্রী উপহার পেয়েছিল একটি লালচুলো, ত্রিভুজাকার নাক-বসানো র‍্যাগ ডল। সে ও তার রুমমেট কিছু ঘটনার মাধ্যমে ‘আবিষ্কার করে’ যে পুতুলটা নিজের মতো চলেফিরে বেড়ায়! প্রথমদিকে ব্যাপারটাকে মেনে নিয়ে পুতুলটাকে তাদের জীবনের স্বাভাবিক অঙ্গ করেই নিতে চেয়েছিল সেই ছাত্রীটি। কিন্তু ক্রমে বোঝা যায়, পুতুলটা তাদের ক্ষতি করার চেষ্টা করছে। এক সন্ধ্যায় অন্ধকার ঘরে ওই রুমমেটের ফিঁয়াসের ওপর কেউ, বা কিছু হামলা করে। আলো জ্বালিয়ে দেখা যায়, ছেলেটির শরীর আঁচড়ে রক্তাক্ত, আর তার পায়ের কাছে পড়ে আছে পুতুলটি। এক সাইকিক মিডিয়াম তাদের বলে, অ্যানাবেল হিগিন্স নামের একটি মৃত মেয়ের আত্মা পুতুলটাকে ‘ভর করেছে’। অতঃপর, অকুস্থলে আবির্ভূত হন ওয়ারেন দম্পতি, এবং পুতুলটাকে নিজেদের মিউজিয়ামে নিয়ে গিয়ে কাচের বাক্সে পুরে প্রদর্শন করেন।

এই গপ্পো ও তার কাল্পনিক পূর্বাপর নিয়ে বানানো হয়েছে ‘অ্যানাবেল’ (২০১৪) এবং ‘অ্যানাবেল: ক্রিয়েশন’ (২০১৭) দু-দুখানা সুপারহিট হরর মুভি!
১৯৭১ সালে রোড আইল্যান্ডের হ্যারিসভিলে একটি বাড়িতে বাসিন্দা হয়ে আসেন পেরন পরিবার। তারপরেই শুরু হয় সমস্যা। বাড়িটি নাকি অভিশপ্ত। উনিশ শতকের গোড়ার দিকে বাথশেবা শেরম্যান নামের এক মহিলা, যাকে স্থানীয় মানুষেরা ডাইনি বলে মনে করত, ওই বাড়ি তথা জমিকে অভিশাপ দিয়েছিলেন। তার ফলেই পেরন পরিবার মহাসঙ্কটে পড়েন। কীভাবে ওয়ারেনরা এই অভিশাপ তথা বিপদ থেকে পরিবারটিকে বাঁচালেন (?), তাই নিয়ে তৈরি হয়েছে মেগাহিট ‘দ্য কনজিওরিং’ (২০১৩)।
উপরোক্ত দুটিকে যদি ফিল্মফেয়ার আর বাফতা-র সঙ্গে তুলনা করা যায়, তাহলে অস্কার আসে ১৯৭৬ সালে। নিউ ইয়র্কের অ্যামিটিভিলের বাসিন্দা জর্জ ও ক্যাথি লুৎজ-এর বাড়িতে এমনই ভৌতিক উপদ্রব শুরু হয় যে তাঁদের বাড়ি ছেড়ে পালাতে হয় প্রাণের দায়ে। ওয়ারেনরা ফিল্ডে নামেন। তাঁদের বয়ান অনুযায়ী ডেমন-কে/দের কীভাবে খেদানো হল, এবং তার পর ওই বাড়ি ও এলাকা কীভাবে বারংবার অশুভ শক্তির দ্বারা আক্রান্ত ও পুনরায় মুক্ত হল, তাই নিয়ে হয়~
১] দ্য অ্যামিটিভিল হরর (১৯৭৯ এবং ২০০৫)
২] ১৯৮২, ১৯৮৩, ১৯৮৯, ১৯৯০, ১৯৯২, ১৯৯৩, ১৯৯৬, ২০১১, ২০১৩, ২০১৫-য় দু’টি, ২০১৬-য় চারটি, ২০১৭-য় তিনটি, এবং ২০১৮-য় (এখনও অবধি) একটি সিনেমা।
মোট ২১টি সিনেমার উপজীব্য/অনুপ্রেরণা হওয়ার মতো ডেমন-বিতাড়ন কি চাট্টিখানি ব্যাপার? আমাদের স্মরণজিতের এত-এত হিট লেখা থাকা সত্বেও তাই নিয়ে আজ অবধি হল মোটে দু’খানা সিনেমা, তাও একেবারে রদ্দি!
১৯৭৭ থেকে ১৯৭৯-র মধ্যে ইংল্যান্ডের এনফিল্ডে একটি বাড়িতে পোল্টারগাইস্টের উপদ্রব হওয়ার খবর ডেইলি মেইল টাইপের কাগজে ফলাও করে বেরোয়। প্রেততত্ত্ববিদেরা বলেন, পোল্টারগাইস্ট মানে হল সেইরকম আত্মা যারা জিনিসপত্র ছুড়ে ফেলে, ভাঙচুর করে, এবং সবমিলিয়ে স্নায়ুর ওপর এমনই চাপ তৈরি করে যে লোকে দিশেহারা হয়। অকাল্ট নিয়ে উৎসাহী স্থানীয় জনতা থেকে শুরু করে সাইকিক সোসাইটি, এমনকি আমেরিকা থেকে ওয়ারেন দম্পতিও এতে কৌতূহলী হন। অন্য লোকেদের দর্শক নেন না বা ‘খান না’ বলে এই কেস নিয়ে বানানো সিনেমা ‘দ্য কনজিওরিং: ২’ (২০১৬)-তে এডওয়ার্ডকেই ডেমনদমনে পুরোধা বলে দেখানো হয়।
১৯৮১ সালে ব্রুকফিল্ড, কনেক্টিকাট-এর বাসিন্দা আর্ন জনসন ঝগড়া করার সময় রেগেমেগে তাঁর বাড়িওলা অ্যালান বনো-কে খুন করেন। ওয়ারেন দম্পতি বলেন, জনসন ভূতগ্রস্ত, বা ডেমন-পজেসড। আদালতের সামনে অবশ্য এই যুক্তি চলেনি। জনসনকে জেল খাটতে হয়।
১৯৮৬ সালে ওয়ারেন দম্পতি আরেকটি ‘দমদার’ কেস হাতে পান। ওয়েস্ট পিটসন, পেনসিলভ্যানিয়া-র স্মার্ল পরিবারের বাসস্থানটি নাকি ১৯৭৪ সাল থেকেই বিচিত্র শব্দ, দুর্গন্ধ, পোষ্যটিকে দেওয়ালে ছুড়ে মারা, এমনকি জ্যাক ও জ্যানেট স্মার্লের ওপর যৌন নির্যাতন ইত্যাদি কারণে বিশিষ্ট। নানা রকম এক্সরসিজম, কড়া ডোজের আশীর্বচন, জল ছেটানো ইত্যাদির পর ওয়ারেনরা ঘোষণা করেন, তিনটি ‘স্পিরিট’ ও একটি ডেমন ওই বাড়ির বাসিন্দা, এবং শেষোক্ত ডেমনটি বড়োই শক্তিশালী। এর দু’বছর পর ব্যাপারটা কমে আসে। তবে টিপিক্যাল ‘শেষ হয়ে হইল না শেষ’ স্টাইলে এই নিয়ে ‘দ্য হন্টেড’ নামক বেস্টসেলার লেখা হয়, এবং ১৯৯১-এ একই নামের একটি সিনেমা বানানো হয়।
১৯৮৬ সালেই ওয়ারেন দম্পতি আরেকটি জবরদস্ত কেস পান। কনেক্টিকাট-এর সাউদাম্পটনে কারমেন ও অ্যাল স্নেডেকার একটি বাড়ি ভাড়া নেন, যেটি নাকি আগে ফিউনারেল হোম ও মর্চুয়ারি ছিল। হঠাৎ করে আলো নিভে যাওয়া, মাংসপচা গন্ধ ভেসে আসা, কল চালু হয়ে জল পড়া ও তার রঙ রক্তের মতো হয়ে যাওয়া, অব্যাখ্যাত পায়ের ছাপ, আয়না ও আলমারি কেঁপে ওঠা, এমনকি স্নেডেকারদের ওপর যৌন নির্যাতন! ওয়ারেনরা নিজস্ব তদন্ত চালিয়ে ঘোষণা করেন, মর্চুয়ারিতে মৃতদেহের সঙ্গে নানা অস্বাভাবিক কীর্তিকলাপ চালাত আগের বাসিন্দারা, যার ফলে সেইসব মৃত মানুষের আত্মা এখানে থেকে প্রতিশোধ নিচ্ছে। তবে স্নেডেকাররা রেহাই পাননি, বরং দু’বছর পর তাঁদেরই ওই বাড়ি ছেড়ে যেতে হয়। কেসটি নিয়ে, যথারীতি, তৈরি হয় ব্লকবাস্টার সিনেমা ‘দ্য হন্টিং ইন কনেক্টিকাট’।
এসেক্স, ইংল্যান্ড-এর বাসিন্দা বিল র‍্যামসে-র বয়স যখন মাত্র ৯, তখন থেকেই হঠাৎ-হঠাৎ তাঁর চেহারা ও স্বভাবে অস্বাভাবিক পরিবর্তন দেখা দিত। শরীরটা প্রথমে হয়ে যেত দারুণ ঠান্ডা, আর তারপরেই এক অদম্য রাগ, ও মানানসই রকম দানবিক বল তাঁর মধ্যে প্রকাশ পেত। বড়ো হওয়ার পর সেগুলো কমে আসে। বিয়ের বেশ কিছুদিন পর, র‍্যামসে যখন তিন সন্তানের গর্বিত পিতা, তখনই হঠাৎ তাঁর মধ্যে প্রকাশ পেতে শুরু করে সেইসব বৈশিষ্ট্য। ঘুমের মধ্যে জান্তব গর্জন শুনে ঘর্মাক্ত শরীরে জেগে ওঠা, আর তারপর বোঝা, যে সেই আওয়াজের উৎস তিনিই। শরীর লোমশ হয়ে ওঠার অনুভূতি। নিঃসীম ক্রোধে কাছের জনকে আক্রমণ করতে চাওয়ার ইচ্ছে। এই প্রবণতাগুলো বাড়তে-বাড়তে এমন জায়গায় পৌঁছয়, যে হাসপাতাল বা পুলিশের স্তর পেরিয়ে র‍্যামসে আরও উঁচু স্তরের সাহায্য চান। ওয়ারেনরা ইংল্যান্ডে আসেন, র‍্যামসেকে পর্যবেক্ষণ করেন, বলেন যে র‍্যামসেকে পজেস করা ডেমন তাকে নেকড়ে তথা ওয়্যারউলফ করে তুলছে, এবং শেষে র‍্যামসেকে আমেরিকায় ডেকে এনে এক্সরসিজম করান।

এমন গাদাগাদা রঙ-চড়ানো ঘটনা আছে বইটায়। ওয়ারেন দম্পতি নাকি দশ হাজারেরও বেশি এমন কেস দেখেছেন, তবে বইটা গোটা পঞ্চাশেকের কথা বলেছে, যাদের মধ্যে উপরোক্ত ম্যাগনাম কেসগুলো ছাড়াও ছিল সিমেট্রিতে দেখা ‘স্পিরিট এসেন্স’, নানারকম খুচরো পজেসন, ইত্যাদি-ইত্যাদি।
বইটি, এবং ওয়ারেন দম্পতির কার্যকলাপ আমার কাছে অভেদানন্দের বইটি, বা কোনান ডয়েলের ভিমরতিগ্রস্ত লেখালেখির চেয়ে অনেক বেশি ক্ষতিকারক লেগেছে। কেন জানেন? কারণ, তথাকথিত অশুভ শক্তির সঙ্গে লড়ার নামে খুব-খুব খারাপ কাজ করেছে বা তাকে উৎসাহ দিয়েছে এই বইটি।
সুধীজন উপরোক্ত কেসগুলো পড়েই বুঝবেন, ঘটনাগুলো আসলে কী। এই বিষণ্ণ ও বিপন্ন মানুষগুলোর দরকার ছিল সাইকোলজিক্যাল কাউন্সেলিং। কারও প্রয়োজন ছিল পরিবারের মধ্যেই লুকিয়ে থাকা সেক্সুয়াল প্রিডেটরদের হাত থেকে সুরক্ষা। যেকোনো মনস্তত্ত্ববিদ, কাউন্সেলর, এমনকি বাস্তববুদ্ধি-সম্পন্ন নার্স ও ডাক্তাররাও এটুকু বুঝবেন। অথচ তা না করে কী করা হল?
(১) ল্যাটিন বাইবেল, এবং রোমান ক্যাথলিক বিশ্বাসের সঙ্গে জড়িত আরও একঝাঁক আচার বা সংস্কারকে মহৎ বলে তুলে ধরা হল। বাইবেল ল্যাটিন হওয়া জরুরি, ইংরেজি বা চিনা ভার্শন ডেমনদের ভয় দেখাতে যথেষ্ট নয়।
(২) ডেমনরা আরেকটি জিনিসকে ব্যাপক ভয় পায় বলে দাবি করা হল। তা হল চার্চের বিশপ বা ফাদার-দের দ্বারা আশীর্বাদ-প্রাপ্ত হোলি ওয়াটার। জলটিকে পূতপবিত্র করার মতো আশীর্বাদ কোনো স্নেহময়ী মা বা ধর্ষিতাকে আশ্রয় দেওয়া নান-এর হলে হবে না, সেটা বিশপ বা ফাদারেরই হতে হবে, তাঁরা পেডোফাইল বা নারী নির্যাতনের মদতদার, যাই হোন না কেন।

এই ভণ্ডামি আর মিথ্যের ভাণ্ডার নিয়ে আমি আর লিখতে চাইছি না। এইসব লোকের কীর্তিকলাপ দেখেই মনে হয়, মানুষের চেয়ে ভয়ঙ্কর আর কিছুই হয় না। এবং এই বইগুলো পড়ে সত্যিটা জানাও অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়।
আমাদের খোঁজ চলতেই থাকে, ধূলোভরা আয়নায় দেখা দেওয়া অচেনা ছায়ায়, ফাঁকা ঘরে বিনা হাওয়ায় দুলে ওঠা ক্যালেন্ডারে, রাতের নিরুপদ্রব ঘুমের মধ্যে কপালে একটা ভেজা হাতের ছোঁয়ায়।
কেউ কি আছেন?
আবার ফিরব এই বিষয়ে অন্য বই, অন্য ঘটনা নিয়ে, তাই একে প্রথম ভাগ বলে আপাতত ইতি টানছি।

Saturday, 20 January 2018

অ্যাডভেঞ্চার!


শব্দটা পড়ামাত্র কি আপনার রক্ত-চলাচল দ্রুততর হয়ে উঠেছে?
আপনি কি এমন কোনো জায়গার কথা ভাবছেন, যার সম্বন্ধে অনেক কিছু লেখা হয়েছে কয়েকশো বছর ধরে, যার সন্ধানে বেরিয়ে নিখোঁজ হয়ে গেছেন অনেক অভিযাত্রী... কিন্তু, আজও যা রয়ে গেছে তথাকথিত সভ্য পৃথিবীর নাগালের বাইরে?
“চাঁদের পাহাড়”, “হিরেমানিক জ্বলে”, “পাহাড় চূড়ায় আতংক”-র চেয়ে বেশি কিছু পড়ার একটা হালকা ইচ্ছে কি শীতের রোদের মতো আপনার পিঠ, কান হয়ে মাথায় পৌঁছতে চাইছে?

১৮৭১ সাল। ওয়েলশ সাংবাদিক হেনরি মর্টন স্ট্যানলি ফিরে এলেন আফ্রিকার গহনতম অরণ্য থেকে। নীল নদের উৎস খুঁজতে গিয়ে নিখোঁজ হয়ে যাওয়া স্কটিশ মিশনারি ডেভিড লিভিংস্টোন-কে খুঁজে বের করেছেন তিনি! সেই বৃত্তান্তই প্রকাশিত হল খবরের কাগজে।
‘ডার্ক কন্টিনেন্ট’ নামে পরিচিত আফ্রিকার অন্দরমহলের সবুজ অন্ধকারের একটা স্পষ্ট ছবিও ফুটে উঠতে থাকল বাইরের পৃথিবীর চোখে।
নীল নদের পশ্চিম তীরে, থেবেস-এর উলটোদিকে অবস্থিত ‘ভ্যালি অফ দ্য কিংস’ খনন করে তখন নতুন করে লেখা হচ্ছে ইতিহাসের অনেক কথা।
মধ্য আমেরিকার জঙ্গলের বুক থেকে মাথা তুলছে মায়া সভ্যতার বিভিন্ন পরিত্যক্ত স্থাপত্য।
এমনকি, হোমারের বর্ণনায় পড়া যে ট্রয় তখনও স্রেফ কিংবদন্তির বিষয় হয়ে ছিল, তাকেও ততদিনে খুঁজে পাওয়া গেছে আনাতোলিয়ার বিগা উপদ্বীপে!

এবার ভাবুন এক রোমান্টিক তরুণের কথা। সে জুলু যুদ্ধ ও বোয়র যুদ্ধে অংশ নিয়েছে। জঙ্গলের অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া গ্রেট জিম্বাবোয়ে সভ্যতার ভাঙাচোরা অবশেষ নিজের চোখে দেখেছে সে। তার ওপর এসবের কেমন প্রভাব পড়তে পারে?
হেনরি রাইডার হ্যাগার্ডের মাথায় সাহিত্যের পোকাটা কামড় বসিয়েছিল অনেক আগেই। কিন্তু ১৮৮৩ সালে অন্য একটা ঘটনা ঘটল। ওই বছর প্রকাশিত হল রবার্ট লুই স্টিভেনসন-এর লেখা সুপারহিট উপন্যাস ‘ট্রেজার আইল্যান্ড’। কথায়-কথায় হ্যাগার্ড ভাইয়ের সঙ্গে পাঁচ শিলিং-এর বাজি ধরে ফেললেন— এর থেকেও ভালো বই তিনি লিখে দেখাবেন! লোথার ছাড়া এ-জগতে সবাই টের পেয়েছে, করাটা বলার চেয়ে ঢের কঠিন। তাই হ্যাগার্ড লেগে পড়লেন। স্কটিশ অভিযাত্রী জেমস থমসন-এর জনপ্রিয় বই ‘থ্রু মাসাই ল্যান্ড’ থেকে তথ্য নিয়ে, বিখ্যাত ব্রিটিশ হোয়াইট হান্টার ফ্রেডরিক হেনরি সেলাস-এর আদলে কেন্দ্রীয় চরিত্র অ্যালান কোয়াটারমেইন-কে গড়ে হ্যাগার্ড একটা রোমহর্ষক উপন্যাস লিখলেন।
সেপ্টেম্বর ১৮৮৫-তে ‘দ্য মোস্ট অ্যামেজিং বুক এভার রিটেন’ তকমা গায়ে এঁটে আত্মপ্রকাশ করল— “কিং সলোমন’স মাইনস।”




“কিং সলোমন’স মাইনস” এতটাই জনপ্রিয় হয় যে প্রকাশক বইটা ছেপে কুলিয়ে উঠতে পারছিলেন না। শুধু জনপ্রিয়ই নয়, সাহিত্যে একটি আস্ত জঁর তৈরি হয় এই বইয়ের সৌজন্যে, যাকে হারানো জাতি/সভ্যতা-র সন্ধান নামে চিহ্নিত করা যায়।
কিন্তু কী এমন ছিল ওই বইয়ে, যা আর কোনো পেনি-ড্রেডফুলেও পাওয়া যায়নি?
একটা মানচিত্র সম্বল করে যাত্রা— এ জিনিস আরও অনেক বইয়ে পাওয়া যায়। কিন্তু কয়েকজন বন্ধু ও এক পোড়খাওয়া অভিযাত্রীকে সঙ্গে নিয়ে অজানার অন্ধকারে হারিয়ে যাওয়া আপনজনকে খুঁজে বের করার চেষ্টা— এটা স্পেশাল। পদে-পদে আসা বিপদের সঙ্গে সাহস আর বুদ্ধি দিয়ে বোঝাপড়া করা— এ জিনিস অন্যত্র পাওয়া যায়। কিন্তু অব্যাখ্যাত রহস্য, বিশ্বাসঘাতকতা, ট্র্যাজেডি-র এমন সমন্বয়? নাহ! এতগুলো উপাদান দিয়ে সাজানো বই এর আগে পাঠকেরা পাননি।

সাহিত্যের সীমা ছাড়িয়েও প্রভাব বিস্তার করেছিল "কিং সলোমন'স মাইনস।" সাম্রাজ্যবিস্তারের বাসনা হোক বা ভৌগোলিক অনুসন্ধিৎসা— অজানার আহ্বানে সাড়া দেওয়ার ক্ষেত্রে অনেককে উৎসাহিত করে এই বইটি। তাঁদের মধ্যে যে মানুষটি সত্যিই ইতিহাস গড়ে দেন তিনি হলেন— লেফটেন্যান্ট কর্নেল পার্সিভ্যাল হ্যারিসন ফসেট।




১৮৮৬ সালে রয়্যাল আর্টিলারি-তে লেফটেন্যান্ট হিসেবে যোগ দেন ফসেট। ১৯০১ সালে তিনি রয়্যাল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটি-র সদস্য হন অভিযান চালানো আর ম্যাপ বানানোর কৌশল আয়ত্ত করতে।
কেন?
যাতে, সার্ভেয়ার-এর ছদ্মবেশে উত্তর আফ্রিকায় ঘোরাঘুরি করে ব্রিটিশ সিক্রেট সার্ভিস-এর হয়ে তথ্য সংগ্রহ করার সময় তাঁর নকল চেহারাটা যেন ধরা না পড়ে!
অভিযাত্রী হিসেবে ফসেটের দক্ষতা রয়্যাল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটিকে মুগ্ধ করেছিল। ১৯০৬ সালে ব্রাজিল-বলিভিয়া সীমান্তে একটি দুর্গম জঙ্গুলে জায়গার ম্যাপ বানানোর জন্য তাঁকেই পাঠানো হয়। মাত্র ৩৯ বছর বয়সী ফসেট সেই অভিযান চলাকালীন ম্যাপ তো বানিয়েইছিলেন। সেই কাজ করতে গিয়ে তিনি দেখেছিলেন অনেক তখনও অবধি অজানা পশু-পাখি। এতেও শেষ নয়! প্রাণের দায়ে ওই অভিযানে ফসেট মেরেছিলেন একটি ৬২ ফুট লম্বা অ্যানাকন্ডা!


সাহস, ধৈর্য, স্থানীয় উপজাতিদের সঙ্গে ভদ্র ও সম্মানজনক ব্যবহার, মনের জোর— এগুলোই ছিল ফসেটের সম্বল। এদের ভরসাতেই ১৯০৬ থেকে ১৯২৪-এর মধ্যে দক্ষিণ আমেরিকায় মোট সাতটি অভিযান চালিয়েছিলেন ফসেট। সেই বিবরণ ঠাঁই পেয়েছিল ‘এক্সপ্লোরেশন ফসেট’ বইয়ে। রিও ভার্দে এবং হিথ নদীর উৎসও খুঁজে বের করেছিলেন তিনি।
আমাজন অববাহিকা থেকে লন্ডনে এসে পৌঁছোতে থাকে ফসেটের নানা ডিসপ্যাচ ও রিপোর্ট। তাঁর অনমনীয় ব্যক্তিত্বের প্রভাবও পড়তে থাকে তৎকালীন সাহিত্যজগতে। যাঁদের ওপর এই প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছিল, তাঁদের  মধ্যে ছিলেন সেই সময়ে দুনিয়ার জনপ্রিয়তম লেখকদের একজন। দুঃসাহসী, রগচটা, মারপিটে সিদ্ধহস্ত, অথচ হার-না-মানা— এমন এক চরিত্রকেই খুঁজছিলেন তিনি। রোগা, লম্বা, বরফশীতল মস্তিষ্কের যে নায়ক তাঁর অন্য সব লেখাকে ঢেকে রেখেছিল, তার ছায়া থেকে দূরে গিয়ে রোমহষর্ক কিছু লিখতে চাইছিলেন সেই লেখক।
তারপরেই জন্ম নেয় সেই অবিস্মরণীয় লেখা!




হ্যারি রুনট্রি’র অলঙ্করণে সমৃদ্ধ হয়ে, ১৯১২-র এপ্রিল থেকে নভেম্বর মাস জুড়ে ‘স্ট্র্যান্ড ম্যাগাজিন’-এ ধারাবাহিকভাবে প্রকাশিত হয় স্যার আর্থার কোনান ডয়েলের অদ্বিতীয় উপন্যাস “দ্য লস্ট ওয়ার্ল্ড”। ফসেটের আদলে ডয়েল জন্ম দেন প্রফেসর জর্জ এডোয়ার্ড চ্যালেঞ্জার-এর। মেপল হোয়াইট ল্যান্ডের উদ্দেশে বেরিয়ে, প্রাগৈতিহাসিক প্রাণীদের সঙ্গে চ্যালেঞ্জার, লর্ড রক্সটন, সাংবাদিক ম্যালোন-এর সাক্ষাতের সেই রোমহর্ষক কাহিনি পড়েননি, এমন কেউ কি আছেন?



অজানা জগতের মানচিত্র গড়া, সেইসব জায়গা ও তার মানুষদের লোকচক্ষুর সামনে নিয়ে আসা— এই দুটিই ছিল তখনও অবধি বিজ্ঞানজগতে ফসেটের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবদান। কিন্তু এত কিছুর পরেও অদম্য মানসিকতা তাঁকে নিশ্চেষ্ট ঘরবন্দি হতে দেয়নি।
কেন?
সে এক টালমাটাল সময়। বিশ্ব জুড়ে বেজে উঠেছে যুদ্ধের দামামা। চলছে হত্যালীলা। যুদ্ধ থামার পরেও মৃত্যুর করাল দংষ্ট্রা ইনফ্লুয়েঞ্জা এপিডেমিকের আকার নিয়ে নিভিয়ে দিচ্ছে অসংখ্য জীবনদীপ। তবু, অতীতের পাতা উলটিয়ে অজানা সভ্যতা মানুষের চোখের সামনে আসাও তো থেমে থাকেনি।

২৪শে জুলাই ১৯১১ মার্কিন ঐতিহাসিক হিরাম বিংহ্যাম গোটা দুনিয়াকে চমকে দিলেন। পেরু-র মাচুপিচু অঞ্চলে পাহাড়ের ওপরে ছিল ইনকাদের রাজধানী। ষোড়শ শতাব্দীতে পরিত্যক্ত হয়েছিল অতুলনীয় স্থাপত্য ও ভাস্কর্যের সাক্ষ্য দেওয়া ওই দুর্গশহর বা সিটাডেল। বিংহ্যাম সেটিকে খুঁজে পাওয়ামাত্র সভ্য পৃথিবীর নজর সরে আসে আমাজনের অন্ধকার জঙ্গল থেকে আন্দিজের ওই পাহাড়চুড়োয়।

১৯১৯-২০-তে আর্কিওলজিকাল সার্ভে অফ ইন্ডিয়া-র ওয়েস্টার্ন ডিভিশন সিন্ধুনদের কাছে লারকানা জেলায় একটা খোঁড়াখুঁড়ি করছিল। সুপারিন্টেন্ডিং আর্কিওলজিস্ট রাখালদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ও তাঁর দল সেখানে মোহেঞ্জোদারো নামের জায়গায় একটা ধ্বংসস্তূপ খুঁজে পেয়েছিলেন। তার ধাক্কায় এক ঝটকায় উপমহাদেশের ইতিহাস পিছিয়ে গেছিল কয়েক হাজার বছর!

ভ্যালি অফ দ্য কিংস-এর ‘কেভি ৬২’ নামে চিহ্নিত জায়গাটিতে লর্ড কারনাভন-এর উদ্যোগে, হাওয়ার্ড কার্টার-এর নেতৃত্বে খনন চলছিল। ৪ঠা নভেম্বর ১৯২২ সেই দলটা কয়েকটি সিঁড়ির ধাপ খুঁজে পায়। সেই ধাপ ধরে নেমে সভ্য পৃথিবী নাগাল পায় এমন এক কক্ষের, যেখানে আছে— অতুল সম্পদ, অজস্র রহস্য, এমনকি অভিশাপে ঘেরা তুতানখামেনের মমি!
সোনা আর রহস্যের ওই আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায় সব্বার। ইতিমধ্যে আমেরিকা আর ইংল্যান্ডের বেশ কিছু মানুষ ফসেটের ডিসপ্যাচ পড়ে একটা জায়গার কথা জেনেছিলেন। বহু-বহু বছর ধরে সেটা গুজব আর কিংবদন্তি হয়েই ছিল। তাঁরাও এতদিন তাকে ঠিক গুরুত্ব দেননি। কিন্তু এবার, ফসেটের ডিসপ্যাচের ভিত্তিতেই, তাঁরা একেবারে কোমর বেঁধে নেমে পড়েন।
কী বলেছিলেন ফসেট?


ব্রাজিলের মাতো গ্রসো এলাকায় এবং আমাজন অববাহিকায় অভিযান চালিয়েছিলেন ফসেট। সেই সময় স্থানীয় একাধিক উপজাতির মুখে তিনি অরণ্যের গভীরে লুকিয়ে থাকা একটি শহরের কথা শুনেছিলেন। শহরটিকে তিনি ‘লস্ট সিটি অফ জেড (Z)’ নাম দেন।
ইতিমধ্যে, ন্যাশনাল লাইব্রেরি অফ ব্রাজিল-এ ফসেট একটি ডকুমেন্ট (ম্যানুস্ক্রিপ্ট ৫১২-পার্ট)-ও পেয়েছিলেন। অষ্টাদশ শতাব্দীর এক পর্তুগিজ ভাগ্যান্বেষী জোয়াও ডা সিলিভা গিমারেজ ছিলেন ওই ডকুমেন্টের রচয়িতা। বাহিয়া প্রদেশে ১৭৫৩ খ্রিষ্টাব্দে ডা সিলভা নিজের একটি পরিত্যক্ত শহর দেখেছিলেন— এমনটাই বলা হয়েছিল তাতে। ডকুমেন্টে ছিল বিভিন্ন মূর্তি, চিত্রলিপিতে ঠাসা একটা ভাঙা মন্দির, ইত্যাদির বর্ণনাও।
ফসেটের ডিসপ্যাচে নথিভুক্ত এই কথাগুলো তুতানখামেনের সমাধি আবিষ্কারের পর হঠাৎই সবার মনে পড়ে গেল। ১৫৩৭ সালে স্পেনের কনকুইস্তাদরদের শোনা ‘এল ডোরাডো’-র গল্পগুলোও নতুন করে ফিরে এল আলোচনায়।
কী ছিল সেই গল্পগুলোতে?
ছিল স্থানীয় এক উপজাতির কথা। তাদের প্রধান বিশেষ কোনো তিথিতে সর্বাঙ্গে সোনার গুঁড়ো মেখে এক বিশেষ হ্রদের জলে স্নান করতেন।
ক্রমে সেই গল্পটা পল্লবিত হতে-হতে হয়ে যায় এমন এক শহরের আখ্যান— যেখানে সবকিছু সোনা দিয়ে তৈরি!

ফসেটের কাঠখোট্টা ডিসপ্যাচ হঠাৎ করে সেই শহরের অস্তিত্বকে বাস্তব করে তোলার ইঙ্গিত দেয়। লোকে জানত যে এই শহরের সন্ধান চালিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন অজস্র অভিযাত্রী। এই মারীচের খোঁজে বেরিয়ে অরণ্যের অন্ধকারে হারিয়ে গেছে আস্ত এক-একটা বাহিনী। তবু, সোনার হরিণের চেয়েও অনেক বড়ো আবিষ্কার হত এই শহর— তাই না?

১৯২৫ সালে লন্ডনের একঝাঁক সম্পন্ন মানুষের কাছ থেকে আর্থিক সাহায্য জোগাড় করলেন ফসেট। তারপর তিনি ‘জেড’-এর সন্ধানে একটি সুপরিকল্পিত অভিযান চালালেন। তাতে তাঁর সঙ্গী ছিলেন তাঁর ছেলে ও ছেলের বন্ধু। বিশ্বাসী, অত্যন্ত কষ্টসহিষ্ণু এবং সক্ষম দুই সঙ্গীকে নিয়ে ফসেট আমাজনের দক্ষিণপূর্ব দিকের একটি উপনদী— আপার জিঙ্গু পার হওয়ার সময় ‘ডেড হর্স ক্যাম্প’ নামের একটি শিবিরে পৌঁছোন। সেখান থেকে তিনি ২৯শে মে, ১৯২৫ তারিখে নিজের স্ত্রীকে একটি চিঠি লেখেন। সেই চিঠির বক্তব্য অনুযায়ী ফসেট রীতিমতো আশাবাদী ছিলেন অভিযানের সাফল্য নিয়ে। তিনি লিখেছিলেন যে তাঁরা সঠিক পথেই এগোচ্ছেন।
ব্যস!
এরপর ফসেট আর তাঁর দুই সঙ্গীর কোনো হদিশ পাওয়া যায়নি।



রয়েল জিওগ্রাফিকাল সোসাইটি তো বটেই, আরো অনেক প্রতিষ্ঠান ও ব্যক্তি এরপর দশকের-পর-দশক ফসেটের কথিত ‘সিটি অফ জেড’ তথা ফসেটের সন্ধানে বেরিয়ে ব্যর্থ হন। কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ, বিশেষত তারপরের ঠান্ডা লড়াই তথা পারমাণবিক মহাসমরের সম্ভাবনা সব হিসেব গুলিয়ে দেয়। হারানো শহর বা সভ্যতার সন্ধান চলে যায় অনেক পেছনের সারিতে।
সাহিত্যের আঙিনাতেও এর প্রতিফলন ঘটে। রোমহর্ষক কাণ্ডকারখানা যা কিছু এরপর হতে থাকে তার বেশিরভাগই গুপ্তচরবৃত্তি বা মার্কিন-সোভিয়েত শিবিরের মধ্যে লড়াই নিয়েই।

অবশেষে, ১৯৮০ সালে, বিখ্যাত সাহিত্যিক মাইকেল ক্রিকটন পাঠকদের ফিরিয়ে আনেন এই জগতে। তাঁর লেখনীতে আমরা পাই এমন একটি উপন্যাস, যা ঘোষিতভাবেই ছিল ‘কিং সলোমন’স মাইনস’-এ কথিত রাজা সলোমনের হিরের খনির সন্ধান তথা হারানো শহর/জাতি নিয়ে লেখা। দারুণভাবে সমকালীন এবং তথ্য-তত্ত্ব-উত্তেজনায় ঠাসা এই উপন্যাসটি ছিল— “কংগো।”


রত্ন হিসেবে মূল্য না থাকলেও সেমিকন্ডাক্টর হিসেবে ইলেকট্রনিক্স-এর জগতে বিপ্লব এনেছিল টাইপ টু-বি ডায়মন্ড। সেই জিনিস খুঁজতে গিয়ে কংগোর ভিরুঙ্গা এলাকায় ক্যাম্প করা একদল বৈজ্ঞানিক ও অভিযাত্রীর একটি দল একদল ধূসররঙা গোরিলার হাতে আক্রান্ত হয়। এবার শুরু হয় বিভিন্ন দেশের একটি কনসর্টিয়াম এবং ই.আর.টি.এস (মানে যারা প্রথম দলটিকে পাঠিয়েছিল)-এর আরেকটি দলের মধ্যে প্রতিযোগিতা। দুই দলেরই লক্ষ্য হয় ওই জায়গায় আগে পৌঁছে ওই বিশেষ ধরনের হিরের খনির ওপর নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠা করা। দুর্ঘটনা, অন্তর্ঘাত, ওই এলাকার দেশগুলোতে চলা গৃহযুদ্ধ ও সামরিক অভ্যুত্থান— এমন নানা বিপদ সামলে বৈজ্ঞানিক কারেন রস-এর নেতৃত্বে এগিয়ে যায় দলটি। পথপ্রদর্শক হয় স্থানীয় এক অভিজ্ঞ ভাড়াটে সৈন্য চার্লস মুনরো। আরও থাকে একটি বুদ্ধিমান ও সাইন-ল্যাংগুয়েজে পারঙ্গম গোরিলা অ্যামি এবং তার ট্রেইনার পিটার ইলিয়ট।
ই.আর.টি.এস-এর দলটি ওই এলাকায় পৌঁছে দেখে, বেণীর সঙ্গে মাথা-র মতো হিরের খনির পাশাপাশি অন্য কিছুও পেয়েছে তারা— কিংবদন্তির হারানো শহর ‘লস্ট সিটি অফ জিনজ (ZINJ)’!
তারপর?
তারপর কী হল, তা জানতে হলে বইটা পড়তে, বা বইটার ভিত্তিতে তৈরি হওয়া কিঞ্চিৎ কমজোরি সিনেমাটা দেখতে, অবিলম্বে তৎপর হউন!

সলোমনের খনি আর ফসেটের জেড-কে মিশিয়ে দেওয়া এই দুরন্ত উপন্যাস লিখে ক্রিকটন পাঠকের মনে আবার হারানো জাতি/শহর নিয়ে বিপুল আগ্রহের জন্ম দেন।
হলিউড পিছিয়ে থাকেনি। রহস্যময় জিনিসের সন্ধানে পৃথিবীর নানা বিপদসংকুল জায়গায় পাড়ি জমানো প্রত্নতাত্ত্বিক ডক্টর ইন্ডিয়ানা জোন্স-এর কীর্তিকলাপ পর্দায় হাজির হয়।
রেলিক হান্টার বা টুম্ব রেইডার গোছের ভিডিও গেমসও ক্রমেই জনপ্রিয় হয়ে উঠতে থাকে এইসময়।

১৯৯৫, সালে ডগলাস প্রেস্টন ও লিংকন চাইল্ড টেকনো থ্রিলার ঘরানাতেই একটি উপন্যাস লেখেন। সেটি ছিল— "রেলিক।"



এর কাহিনি শুরু হয় আমাজন অববাহিকার আপার জিংগু অঞ্চলে। আমেরিকান মিউজিয়াম অফ ন্যাচারাল হিস্ট্রি-র ডক্টর জুলিয়ান হুইটলসে’র নেতৃত্বে সেখানে একটি অভিযান চালানো হয়েছিল। তার লক্ষ্য ছিল কিংবদন্তির উপজীব্য ‘কোথোগা’ জাতি এবং তাদের উপাস্য ‘লিজার্ড গড’ মবয়ুন (Mbwun)-এর সন্ধান। সেই অভিযান মাঝপথেই পরিত্যক্ত হয়। হুইটলসে-ও নিখোঁজ হয়ে যান।মিউজিয়ামের উদ্দেশে হুইটলসে যে-সব প্যাক করা ক্রেট পাঠিয়েছিলেন সেগুলো প্রথমে ব্রাজিলের বেলেমে পড়ে থাকে, তারপর জাহাজে চেপে গন্তব্যে এসে পৌঁছয়।
কিছুদিন পরের ঘটনা। মিউজিয়ামে তখন চলছে এক বিশাল অনুষ্ঠানের প্রস্তুতি। তার কয়েকদিন আগেই এক নিরাপত্তা রক্ষী আর বন্ধ হওয়া মিউজিয়ামে থেকে যাওয়া দুটি বাচ্চা ছেলে নৃশংসভাবে খুন হয়।
পুলিশ আসে, সঙ্গে আসেন ফেডারেল ব্যুরো অফ ইনভেস্টিগেশনের স্পেশাল এজেন্ট অ্যালয়সিয়াস পেন্ডারগাস্ট।
এই শেষোক্ত চরিত্রটিকে গড়া হয়েছিল পুরোপুরি শার্লক হোমসের আধুনিক তথা ‘কুলেস্ট পসিবল’ সংস্করণ হিসেবে। তাঁর কাছ থেকেই আমরা জানতে পারি যে বেলেমে একটি এবং ক্রেটগুলো বয়ে আনা জাহাজে একাধিক ভয়াবহ হত্যাকাণ্ড ইতিমধ্যেই ঘটে গেছে। অতঃপর শুরু হয় খুনি কে বা কী— তা জানার এবং তাকে আটকানোর চেষ্টা।
তারপর কী হল?
এক আদিম রহস্যের সঙ্গে আজকের শার্লক হোমসের টক্করের এই শ্বাসরোধী কাহিনিতে এরপর কী হল, তা জানতে চাইলে অবিলম্বে হস্তগত করুন ও পড়ে ফেলুন “রেলিক” নামের এই বইটি!

কিন্তু তার পরেও তো কেটে গেছে আরো দু-দুটো দশক! হারানো জাতি বা শহরের সন্ধানে গিয়ে মাথা-খারাপ-করা রহস্য কি আর নেই? প্রাণপাখি-ওড়ানো বিপদের মোকাবিলা করা ছেড়ে দুঃসাহসী অভিযাত্রীরা কি তাহলে ঘরে বসে টিভি দেখাতেই মনোনিবেশ করেছেন?
না, তা হয়নি। হ্যাগার্ড, ডয়েল, ক্রিকটন-এর ঘরানার যথার্থ উত্তরসূরি হিসেবে ইতিমধ্যেই এসে গেছিলেন জেমস রলিন্স। তাঁর উপন্যাস “আমাজনিয়া” প্রকাশিত হয় ২০০২ সালে।


শুধু জনপ্রিয় নয়, রহস্য, রোমাঞ্চ, কল্পবিজ্ঞান, এবং অ্যাকশন পছন্দ-করা পাঠকদের কাছে বইটি কাল্ট ক্লাসিক হয়ে যায় প্রকাশের পরেই।
কেন?
আমাজনের গভীরে নিখোঁজ হয়ে গেছিল র‍্যান্ড সায়েন্টিফিক এক্সপিডিশন। সেই দলের এক সদস্য ছিলেন স্পেশাল ফোর্সের একজন প্রাক্তন সৈন্য। বেশ কয়েকবছর পর ক্ষতবিক্ষত ও মুমূর্ষু অবস্থায় জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসেন তিনি। ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, অভিযান শুরুর আগেই তাঁর একটা হাত কাটা গিয়েছিল। কিন্তু জঙ্গল থেকে বেরিয়ে আসার পর দেখা গেল, তাঁর দুটো হাত-ই আছে!
এই রহস্যের সমাধান করার জন্য একটি অভিযাত্রী দল পাঠানো হয়। তাদের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা, সৃষ্টিরহস্যের এক নতুন ব্যাখ্যা— এর পরেও এই উপন্যাস ক্লাসিক হবে না কেন?

ইতিহাস, বিজ্ঞান, অ্যাকশন, সম্ভব-অসম্ভবের মাঝে দোলানো ভাবনা— এই উপাদানগুলো দিয়ে ঠাসা রচনার জগতে মুকুটহীন সম্রাটই হয়ে ওঠেন জেমস রলিন্স। তিনি যে শুধু এই একটি বই লিখেই থেমে থাকেননি— এ-কথা বলাই বাহুল্য। তাঁর একাধিক লেখাতেই পূর্বসূরিদের উদ্দেশে নরম স্যালুট স্পষ্ট হয়েছে।
অ্যাডভেঞ্চারের জগতে রলিন্সের নিজস্ব সংযোজন হল— 'সিগমা ফোর্স।' এটি মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি গোপন শাখা, যার সদস্যেরা আবার দুর্ধর্ষ বিজ্ঞানীও বটে। এদের নানা কাহিনিতেই প্রাচীন রহস্যকে আধুনিক পৃথিবীতে জাগিয়ে তোলা হয়েছে অতুলনীয়ভাবে। তাদের মধ্যে দুটি লেখার কথা বলতেই হচ্ছে।


২০১৪ সালে প্রকাশিত হয় ‘দ্য সিক্সথ এক্সটিংশন” নামের এই টেকনো-থ্রিলারটি। কী আছে এতে?
আছে জীবজগতের কিছু আদিমতম রহস্য। আছে বেশ কিছু ‘যদি এমন হয়’ বা ‘হোয়াট ইফ’ পরিস্থিতি।আছে আন্টার্কটিকার তুহিন অবাচী থেকে আমাজনের গভীর জঙ্গলের মধ্যে এক ‘টেপুই’ বা টিলা জুড়ে ছড়ানো এক ষড়যন্ত্র। অবশ্যই আছে সেই মারাত্মক পরিকল্পনার বাস্তবায়ন ঠেকাতে সিগমা ফোর্স ও অন্যান্যদের প্রাণপণ প্রয়াস।
এই 'মা কসম!' উপন্যাসটি যদি এখনও না পড়ে থাকেন, তবে সেই ত্রুটি দ্রুত সংশোধন করতে অনুরোধ করব। তবে হ্যাঁ, পড়ার সময় অন্তত ঘন্টা ছয়েক ফাঁকা রাখবেন, নইলে জীবনে প্রগাঢ় অশান্তি গ্যারান্টিড।


২০১৫-য় প্রকাশিত হয় রলিন্স-এর উপন্যাস “দ্য বোন ল্যাবাইরিন্থ।” আকর্ষণীয় উপাদানের দিক দিয়ে এই বইটিকেও সলোমনের খনির সঙ্গেই তুলনা করা যায়।
কী-কী আছে এতে?
আছে মানবজাতির ইতিহাসের একটি গূঢ় রহস্য। আছে মধ্যযুগের প্রত্নতত্ত্ব ও বিজ্ঞানচর্চা। আছে আটলান্টিস নামক হারানো সভ্যতার বাস্তবতা নিয়ে একটি গ্রহণযোগ্য তত্ত্ব। আছে প্রাণের উদ্ভব ও বিবর্তন নিয়ে ‘গোল্ডিলকস এনিগমা’ নামে খ্যাত প্রহেলিকা। আর এদের সব্বাইকে জুড়ে রেখেছে সমকালীন রাজনীতি ও বিজ্ঞানের পটভূমিতে আক্ষরিক অর্থে দম-আটকানো একটি অ্যাডভেঞ্চার।
সবচেয়ে বড়ো কথা কী জানেন?
এই কাহিনির ক্লাইম্যাক্স সংঘটিত হয়েছে মধ্য আমেরিকার এক রহস্যময় জঙ্গলে।
আর... কাহিনিতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নিয়েছে সাইন-ল্যাংগুয়েজে দক্ষ ও অনেক মানুষের চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান, ‘বাকো’ নামের একটি গোরিলা!
বৃত্তটা সম্পূর্ণ হল কি না, বলুন?

জানি না বইগুলো কত তাড়াতাড়ি জোগাড় করতে পারবেন। তবে ব্রাউসারের নিরাপদ আশ্রয়ে আধুনিক 'আমাজন অভিযান' সেরে ফেলতে পারলেই বইগুলো চলে আসবে আপনাদের হাতের মুঠোয়। আর তারপরেই জমবে...
অ্যাডভেঞ্চার!