Sunday, 1 October 2017

পূজাবার্ষিকী ঘোড়াড্ডিম ১৪২৪: ফিরে দেখা


এবার পুজোর মাসখানেক আগে থেকেই বাজারে একটা পত্রিকার পূজাবার্ষিকী নিয়ে ঝড় উঠল।
চৈত্র-বৈশাখ মাসে বৃষ্টি আসার আগে যেমন ঈশান কোণ থেকে হা-রে-রে করে ছুটে আসা একটা হাওয়া ধুলোর পাকে জড়িয়ে ফেলে আমাদের, আমের বোলগুলো ঝপাঝপ নিচে ফেলে দেয় পেকে ওঠার আগেই, আর চোখে-দাঁতে কিচকিচে ধুলো নিয়ে অপেক্ষা করায় বৃষ্টির জন্য,...
ঠিক সেইভাবেই পত্রিকাটা নিয়ে বাজারে ওঠা একটা ঝোড়ো হাওয়া, যাকে মার্কেটিং বিশেষজ্ঞরা (অভীক সরকার এই জায়গাটা খুঁটিয়ে পড়ছেন, এ আমি দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি) buzz বলে থাকেন, অন্য অনেক কিছু থেকে নজর সরিয়ে আমাদের বেতাল-বেচাল করে দিচ্ছিল।
পত্রিকাটার নাম ঘোড়াড্ডিম।
নামটা শুনে কি আপনি চমকে গেলেন? মাথাটা চুলকেও নিলেন এক ফাঁকে?
তৎসম শব্দের দাপটে মড়মড় করে ওঠা বঙ্গসংস্কৃতির এই দুর্বল ও উইয়ে খাওয়া মঞ্চে এমন একটা নাম কোত্থেকে এল, সেটা একটা রহস্য বটে।
কিন্তু যেটা নিয়ে রহস্য তো দূরের কথা, বিন্দুমাত্র সংশয় ছিল না, সেটা হল এই পত্রিকার সম্ভাব্য গুণমান, কারণ বইটির প্রকাশক জুটি অভিষেক আইচ ও অরিজিৎ ভদ্র-র সততা, পেশাদারিত্ব, এবং পরিশ্রম করার ক্ষমতা নিয়ে আমার যৎসামান্য হলেও ধারণা ছিল।
তারপর বিদ্যুৎ চমকানোর মতো করে আমাদের সামনে আসতে শুরু করল একের পর এক লেখকের নাম। স্তম্ভিত বিস্ময়ে, এবং অনেক দিন পর রীতিমতো টেনশন নিয়ে আমি অপেক্ষা করতে থাকলাম বইটার জন্য।
তারপর একটা কান-ফাটানো বাজ পড়ল। জানা গেল, এমন অ্যাভেঞ্জার্স অ্যাসেম্বল টাইপ লেখক-সমাবেশ করা পত্রিকার দাম মাত্র ৯০/- টাকা!!!!
তবদা লেগে গেল আমার।
তারপর একদিন জানতে পারলাম, তিনি এসেছেন। মানে ঘোড়াড্ডিম ফুটে পত্রিকাটি বেরিয়েছে। অতঃপর অফিস-ফেরতা ‘সুদীপ্তার সম্ভার’-এ পৌঁছনো, প্রচুর গল্পগুজবান্তে কফি পান, এবং পত্রিকাটি সংগ্রহ করা।
ফেসবুকে কথাটা জানানো মাত্র সেদিনই লোকজন বলেছিল, “রিভিউ দিও”।
সপ্তাহ তিনেক কেটে গেল। ঘোড়াড্ডিম আউট-অফ-স্টক এবং আউট-অফ-প্রিন্ট হয়ে গেল। এমনকি পুজোও এসে গেল। আমি রাতে দুঃস্বপ্ন দেখতে শুরু করলাম, লোকে আমার মাথার কাছে দাঁড়িয়ে দুলে-দুলে বলছে, “চৌত্রিশ + ছয় বছর কেটে গেল, কেউ কথা রাখেনি”!
তারপর এল নবমী। সাক্ষাৎ মা দুর্গার পদাঙ্ক অনুসরণ করে শ্রীমতী সকন্যা চলে গেলেন পিত্রালয়ে। বাড়ি ফাঁকা হয়ে গেল।
আমি নিজের চারপাশে বই আর পুজোবার্ষিকীর একটা শিবালিক রেঞ্জ তৈরি করে বডি ফেললাম। সেই প্রবল তপস্যায় ধাপে-ধাপে শেষ হয়ে গেল ঘোড়াড্ডিম।
হে বিজয়া-পরবর্তী হ্যাং-ওভারে কাতর পাঠক, আজ কি শাম (ইয়ে মানে রিভিউ), আপকে নাম।

‘ঘোড়াড্ডিম’ পূজাবার্ষিকী ১৪২৪-এর সঙ্গে মারগো সাবানের তুলনা করা যেতে পারে। মারগো সাবান হল “দেখতে খারাপ, মাখতে ভালো”। এই পত্রিকাটিতেও কিছু ব্যাপার বেশ খারাপ, আর সেগুলো আগে বলে দিই: -
(ক) মলাট দেখতে বেশ রঙিন ও চকচকে হলেও তৌসিফ হক সেটিকে এমন জবরজং ও কিম্ভূতকিমাকার করে বানিয়েছেন যে আমার মেয়ে দেখেই মুখ বেঁকাল। একটি শিশু-কিশোর বার্ষিকীর টার্গেট অডিয়েন্স বড়ো-বড়ো শিল্পবোদ্ধা নন, বরং ছোটোরা। তাই তাদের মনে ও চোখে লাগার মতো প্রচ্ছদ না থাকাটা বেশ ধাক্কাই দিল।
(খ) বইয়ের ভেতরের অলঙ্করণে কোনো ধারাবাহিকতা নেই। কিছু ছবি দেখলে স্পষ্টতই মনে হয় যে কিশোর পাঠকদের কথা মাথায় রাখা হয়েছে, আবার লাইন ড্রইংগুলো দেখলে মনে হয় শিল্পীর কোনো ধারণা ছিল না, তিনি কোন লেখার ভিত্তিতে কাদের জন্য আঁকছেন।
(গ) বইয়ের দাম কম রাখার জন্য কাগজ হিসেবে নিউসপ্রিন্ট দেওয়াটা সিরিয়াসলি চাপের। এমনিতে দ্য কাফে টেবল যেসব বই আমাদের উপহার দেয় সেগুলো মুদ্রণসৌকর্যে, এবং দামে, বেশ উঁচু লেভেলের। সেই জিনিস এখানে করা সম্ভব ছিল না, একথা মানছি। কিন্তু তাই বলে নিউজপ্রিন্ট?! এর ফলে কী হয়েছে সেটাই লিখি।
এবার আকাশের ডায়াবেটিস নয়, প্রস্টেট গ্ল্যান্ডে কিছু সমস্যা হয়েছে, তাই ভাসিয়েই যাচ্ছে (আমার নয়, জনৈক মহাজন-উবাচ)। তেমনই এক রাউন্ড চলাকালীন এক পশলা বৃষ্টি জানলা দিয়ে ঢুকে বিছানা-বালিশের মতো ঘোড়াড্ডিম-কেও ভেজালো। মলাট আর কাগজ সেই যে কুঁচকিয়ে ফুলেছে, এখনও সোজা হচ্ছে না। আজকের ছোটোদের হাতে এই জিনিস তুলে দেওয়ার চেষ্টা করা কি ঠিক?

(ঘ) সম্পাদক শুভদীপ ঘোষ এবং অরুণাংশু চ্যাটার্জী সম্পাদকীয়-র মাধ্যমে এই পত্রিকার মিশন, ভিশন, ইত্যাদি নিয়ে কিচ্ছু না বলে অসংলগ্ন বাংলায় যে ঠিক কী বলতে চেয়েছেন, সেটাই বুঝলাম না।
(ঙ) লেখায় টাইপো প্রচুর। অনেক লেখায়, ‘ওনার’ বা ‘ওঁনার’-এর মতো অশুদ্ধ চলতি অভিব্যক্তি সংশোধন করে তার বদলে ‘ওঁর’ লেখার, বা বানানগত সমতা রক্ষার্থে যে ন্যূনতম সম্পাদকীয় হস্তক্ষেপের প্রয়োজন ছিল, তার কিছুই পাওয়া যায়নি লেখাগুলোয়।

Zআউক গিয়া। খাওয়ার আসল স্বাদ যেমন রসনায়, তেমনই পূজাবার্ষিকীর আসল মজা তার লেখায়। সেই প্রসঙ্গেই আসা যাক।

১.    সমুদ্র বসু-র নিবন্ধ “বিশ্ববিখ্যাত ঘোড়াদের গল্প”: পত্রিকার নামের সঙ্গে সাযুজ্য রক্ষাকারী এই লেখাটা তথ্যপূর্ণ ও সুপাঠ্য। তবে রঙিন ও চকচকে পাতায় এই লেখাটা ছাপা হলে ছোটোদের কাছে এফেক্টটা আরো জোরদার হত।
২.    সৌরভ মুখোপাধ্যায়-এর দীর্ঘ উপন্যাস “রূপকথার জন্মদিন”: এই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সাহিত্যিকের কাছ থেকে ছোটোদের জন্য লেখা বলতে আমরা শেষ পেয়েছি ২০১৬-র শারদীয়া ‘চিরসবুজ লেখা’-য় প্রকাশিত গল্প “শালিখের মা”, এবং ‘মায়াকানন’ বার্ষিকী-তে প্রকাশিত গল্প “ঋণ”। তারপর পুরো একটি বছর কেটে গেছে! আর উপন্যাসের কথা ধরলে পরিস্থিতি আরো গুরুতর, কারণ ২০১৪-র পূজাবার্ষিকী ‘আনন্দমেলা’-য় প্রকাশিত “ভেলকুনমামা ও মিথ্যান্বেষী”-র পর লেখক আমাদের আর কিছু দেননি। তাই, এই দীর্ঘ (দীর্ঘ, সম্পূর্ণ, বড়ো, এমন বেশ কিছু স্টিকার এবার পুজোয় উপন্যাস নামধারী লেখাদের গায়ে আটকানো হয়েছে বটে, তবে সেগুলো সব গিমিক মাত্র) উপন্যাসটি নিয়ে অন্য অজস্র পাঠকের মতো আমারও প্রচুর কৌতূহল ছিল। লেখাটা পড়তে গিয়ে দুটো অদ্ভুত ঘটনা ঘটল।
      প্রথমত, এক-দু’লাইন পড়ার পরেই আমি লেখাটার মধ্যে একদম তলিয়ে গেলাম। ব্যাপারটা যে এই পোস্ট-মডার্ন, পাশে রাখা মোবাইলে ক্রমাগত ফেসবুক আর হোয়াটস অ্যাপ-এর নোটিফিকেশন আসতে থাকা সময়ে কী অসম্ভব রকম কঠিন কাজ, তা নিশ্চই আন্দাজ করতে পারছেন। আর সেই কঠিন কাজটাও যদি এমন এক কাহিনির মাধ্যমে করা হয়, যার উপজীব্য রহস্য-রোমাঞ্চ-ভূত-এবং নানাবিধ খুনখারাপি নয়, বরং এক দিদিমনি, আর তাঁর ক্লাসের গরিব, শীতে কাঁপা, খেতে না পাওয়া, অথচ হৃদয়ের সম্পদে কুবেরতুল্য মেয়েদের কথোপকথন, তাহলে লেখকের কলমকুশলতার কিছুটা আন্দাজ হয়তো পাওয়া যায়, তাই না?
      দ্বিতীয়ত, লেখাটার গায়ে একটা অন্যরকম গন্ধ লেগে আছে। রূঢ়ভাবে বললে সেটাকে ন্যাপথালিন, আর ভালোভাবে বললে সেটাকে ঠাকুমার ঘরের ধুনো-ওষুধ-কাশীদাশী মহাভারত-ফুল-চরণামৃত মেশানো গন্ধের সঙ্গে তুলনা করা যায়। কিন্তু এটা কঠোর বাস্তব যে এই লেখা এখনকার নয়। না, আমি কোনো ভাবেই, কোনো মতেই বলছি না যে এই লেখা খারাপ! শুধু বলছি যে লেখাটা টাইম ওয়ার্পের মধ্য দিয়ে এসে পড়েছে এই না-ইয়েতির পদভারাতুর কলকাতায়, অথচ এর সঠিক স্লট ছিল আশির দশকে দেব সাহিত্য কুটির থেকে প্রকাশিত বাঁধাই করা হার্ডকভার পূজাবার্ষিকীর ‘মানবিক মূল্যবোধের গল্প’ সেকশন, যেখানে এক সময় আমরা পড়েছি মানুষ গড়ার স্বপ্ন আর কথা নিয়ে বহু স্বর্ণিম উপাখ্যান।
      কিন্তু উপন্যাসটা আদতে কেমন?
      আপনি যদি আমারই মতো “মেঘ-ছেঁড়া রোদ” (আনন্দমেলা পূজাবার্ষিকী, ২০১৩)-এর এক দিওয়ানা পাঠক হন, তাহলে এই লেখা আপনার ভালো লাগবে। ভালো লাগবে এই গল্পের ভীষণ সহজ, সরলরৈখিক কাঠামোটা। ভালো লাগবে এর কেন্দ্রীয় চরিত্রদের। ভালো লাগবে স্বপ্ন তথা ইচ্ছাপূরণের এই আখ্যান। ভালো লাগবে সংগ্রামের আগুনে তপ্ত, চোখের জলে শীতল, আর প্রতিভার ধারে তীক্ষ্ণ এক ইস্পাতের তরোয়াল চোখের সামনে গড়ে ওঠার দৃশ্যাবলি।
      আর যদি এসব আপনার না পোষায়, তাহলে লেখাটা স্রেফ টপকে যাবেন প্লিজ।
৩.    অভীক সরকার-এর রম্যরচনা “প্রিন্সেস ও ট্র্যাডিশনাল ডে”: অভীক সরকার ফেসবুকে যা লেখেন তার মধ্যে রম্যরচনা, দাঁত-কিড়মিড় টাইপ লেখা, তথ্যনিষ্ঠ নিবন্ধ, এসবই পড়ে। যদি আপনি এখনও এসব না পড়ে থাকেন তাহলে, হে পাঠক, আপনি জানেন না আপনি কী হারাচ্ছেন। সত্বর সেই ত্রুটি সংশোধন করুন। শিশু-কিশোর পত্রিকায় তাঁর এই লেখাটি সেই কমলহিরে টাইপের দ্যূতি বিচ্ছুরণ করতে পারেনি, কারণ অভীকের ট্রেডমার্ক উইটের অনেক কিছুই প্রাপ্তবয়স্ক। ফলে ব্লাডি মেরি-র বদলে রুহ-আফজা খাওয়ার এফেক্ট এসেছে লেখাটায়। তবে তাই বা কম কী?
৪.    দেবতোষ দাশ-এর গল্প “আলোটা কোথায় গেল”: ফেবল বা উপকথার স্টাইলে বলা এই গল্পটা ভালো, তবে কিছুটা অন্যায় ভাবেই হয়তো বেশ কিছুদিন আগে ‘চিরসবুজ লেখা’-য় প্রকাশিত সৈকত মুখোপাধ্যায়-এর একটা অদ্বিতীয় গল্প, “শূন্য হাতের শিল্পী”-র সঙ্গে তুলনা হবে এই গল্পটার। না, দুটোর মধ্যে কোনো মিল নেই। আবার হয়তো আছেও। পড়ে দেখুন।
৫.    সৌরভ চক্রবর্তী-র গল্প “ক্লাউন-আতঙ্ক”: ‘ভূতের গল্প’ অধ্যুষিত এই বাজারে সত্যিকারের মনস্তত্ত্ব-আধারিত গল্প কম লেখা হয় বলাটাও একটা আন্ডার-স্টেটমেন্ট। আলোচ্য গল্পের লেখক সৌরভ চক্রবর্তী-র বিশেষত্ব হল, এর আগেও তিনি একাধিক লেখায় ‘বনের বাঘে নয়, মনের বাঘে খায়’ কথাটা যে যথার্থ, তা তুলে ধরেছেন রোমাঞ্চ ও প্রত্যাশার মেলবন্ধনে। ধাপে-ধাপে গল্পকে একটা প্রত্যাশিত পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া, এবং একেবারে শেষ মুহূর্তে তাতে এমন একটা মোচড় আনা যে পাঠক একেবারে হতভম্ব হয়ে যান: এই জিনিস এই মুহূর্তে করে দেখাতে পারেন স্রেফ সৌরভ! তাঁর কাছ থেকে এমন দুর্দান্ত আরো গল্পের আশায় রইলাম।
৬.   বিপুল দাস-এর উপন্যাস “মৃত্যু-আলিঙ্গন”: স্থানাভাবে বা অন্য কোনো কারণে লেখক তাঁর গল্পটা শেষ না করেই ছেড়ে দিয়েছেন। তাছাড়া deus ex machina স্টাইলে এমন সব জিনিস গল্পটায় আমদানি করা হয়েছে, যেটা যুক্তিতর্কের খাতিরে হজম করা মুশকিল। কিন্তু, জঙ্গলের পটভূমিতে চোরাশিকারী তথা কাঠপাচারকারীদের সঙ্গে সৎ বনরক্ষীদের সংঘর্ষের এই দুর্দান্ত রোমাঞ্চকর উপাখ্যান আমার মতো পুরোনো পাঠকদের কাছে অনেকাংশে ময়ূখ চৌধুরী-র অনবদ্য চিত্রকাহিনি “বনবাসী বন্ধু”-র কথা মনে করিয়ে দেবে।
৭.    সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়-এর গল্প “তিন বর, তিন বর”: এই ক্লান্ত, অসুস্থ মানুষটিকে দিয়ে এখনও শিশু-কিশোর সাহিত্য রচনা করালে যা হওয়ার, তাই হয়েছে। যেকোনো স্কুলের দেওয়াল-পত্রিকাতেও এর চেয়ে উৎকৃষ্ট জিনিস রচিত হয়।
৮.   সুদেষ্ণা চক্রবর্তী-র গল্প “হীরুদা আর মুখোশ”: গল্পের নামের বানানে দীর্ঘ ঈ ব্যবহার নিয়ে আপত্তি থাকলেও গল্পটা যে একদম ফার্স্ট ক্লাস, সেই নিয়ে কোনো সংশয় নেই। বেশ তারিয়ে-তারিয়ে উপভোগ করার মতো গল্প এটা।
৯.    বিবেক কুণ্ডু-র গল্প “মনকেমন”: বাজে অলঙ্করণ যে একটা অনবদ্য, এবং গভীর দ্যোতনাময় গল্পের কতটা ক্ষতি করতে পারে, তার কেস স্টাডি হিসেবে এই গল্পটা নেওয়া যেতে পারে। অনাগত ভবিষ্যতের গল্প নয়, এ আসলে ঘটমান বর্তমানের এক বুক-কাঁপানো গল্প। যত্ন নিয়ে গল্পটা পড়বেন, প্লিজ।
১০.  অরিন্দম চক্রবর্তী-র হাবিজাবি “তবু মনে রেখো”: ধুর! না গল্প, না নিবন্ধ, না আলোচনা, এটা একটা রাবিশ জিনিস হয়েছে। সম্পাদক এমন সব বাঘা-বাঘা লেখার পাশে এই লেখাটাকে রাখলেন কি বন্ধুকৃত্য হিসেবে?
১১.   অনুষ্টুপ শেঠ-এর গল্প এবং কলুদা (কল্যাণ দাস)-র ছবিতে তিতিরপাখি-র কমিক্স “কথাবার্তা”: আহা! পড়ে মন জুড়োল। তবে ছবি মোটেই ভালো নয়। সায়ন পাল-এর আঁকায় আমরা এর চেয়ে শতগুণে ভালো কমিক্স পেয়ে থাকি।
১২.  দেবাশিস আইচ-এর গল্প “বুড়ি নদীর কোল”: সহজ, সুন্দর, গল্প। কিছুটা রূপকথা, আর আজকের আমরা-ওরা বিভাজিত গ্রামের পটভূমিতে একেবারেই অলীক। তবু সুন্দর গল্প।
১৩.  রূপক মিশ্র-র গল্প “আশ্চর্য ভ্রমণ”: দারুণ লেখা। ছোটোদের জগতে কল্পনা যে কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেটা আমরা হয়তো ভুলতে বসেছি আজকের শিশুদের চারপাশে ইনফোটেইনমেন্ট-এর বন্যা দেখে। কিন্তু সেই কল্পনাপ্রবণতাটা, যেটা আমাদের ছোটোবেলায় মেঘ দেখে কেশর ফোলানো সিংহ হয়ে আত্মপ্রকাশ করত, ফিরে পেলাম এই সহজ গল্পে।
১৪.   নীলা বন্দ্যোপাধ্যায়-এর গল্প “লকির গুপ্তধন”: এই রকম একমাত্রিক দুঃখবাদী ঘ্যানঘ্যানকে গল্পের মর্যাদা দেওয়ার পেছনে কোনো এজেন্ডা থাকতে পারে, কিন্তু সম্পাদকীয় বিচক্ষণতার কোনো পরিচয় এতে পাওয়া গেল না।
১৫.  বিনোদ ঘোষাল-এর গল্প “মিত্তির মশাই”: এই অদ্ভুত সুন্দর গল্পটা, যা পড়লে পাঠকের অন্তরমহল একটা ব্যাখ্যাতীত ব্যথায় সজল হয়ে ওঠে, পূর্ব-প্রকাশিত হলেও উপস্থিতির মাধ্যমে এই পত্রিকাকে সমৃদ্ধ করেছে।
১৬.  রেজওয়ান তানিম-এর গল্প “টুপুরের একদিন”: গল্পটার বিষয়বস্তু, উপস্থাপন, বর্ণনাভঙ্গি, সবই আজ থেকে বছর ত্রিশেক আগের। আজকের ছোটোদের কাছে রবীন্দ্রনাথকে প্রভাতফেরি আর এথনিক কম্পিটিশনে গাইবার জিনিসের বাইরে অন্য কিছু করে তুলতে গেলে এরকম আধো-আধো লেখা চলবে না। তাদের বুদ্ধিকে সম্মান জানিয়েই যে লিখতে হবে, একথা লেখককে বোঝাতে না পারার জন্য সম্পাদককেই দোষী করতে হচ্ছে।
১৭.  অনন্যা দাশ-এর গল্প “উত্তরাধিকার প্রহেলিকা”: দারুণ লাগল এই রহস্যকাহিনিটি। জিকো-কেকা-সাগর দত্ত সিরিজের বাইরে এক আনকোরা নতুন গোয়েন্দা ধ্রুবজ্যোতি সেন-কে এই গল্পের মাধ্যমে উপহার দিয়েছেন লেখক। রহস্যটা হয়তো কিছুটা প্রেডিক্টেবল, কিন্তু সব মিলিয়ে গল্পটা, বিশেষত তার শেষের ঝটকাটা আমার চমৎকার লেগেছে।
১৮.  অমৃতা চৌধুরী-র ভাষান্তরে জান্নি রোদারি-র “রাজার নাকে হাত বুলোনো”: ধুর! এর চেয়ে শতগুণে ভালো লেখা উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী-ই লিখে গেছেন। অনুবাদ সাহিত্যের নামে এইসব বেকার জিনিস কেন যে…
১৯.  শেখর বসু-র উপন্যাস “বাঁদর-মানুষ আজও আছে”: গল্পটা ভালো, তবে অকারণে টেনে লম্বা করা হয়েছে। এই পোস্ট-মডার্ন যুগে গল্পটা বলার জন্য বংপেন আধ পাতা নিয়ে এর চেয়ে বেশি অভিঘাত তৈরি করতে সক্ষম। তাই এত ফেনানো লেখাটা শেষ অবধি বোর-ই করল।
২০.  শ্রেয়সী সেন-এর স্মৃতিকথা “পুরানো সেই দিনের কথা”: সম্পাদকরা যে ঠিক কী যুক্তিতে এইসব জিনিস …. যাকগে।
২১.  ও হেনরি-র গল্পের অভীক মুখোপাধ্যায়-কৃত ভাবানুবাদ “শেষ পাতাটি”: অনুবাদ কেমন হওয়া উচিৎ, তার একটি উৎকৃষ্ট নিদর্শন এই গল্পটি। গল্পের গতি শুধু নয়, তার আবেগ ও অনুভূতি কিছুমাত্র বিচ্যূত হতে দেননি অনুবাদক এই নির্ভার লেখায়। গল্পটা ক্লাসিক, অনুবাদটাও অনবদ্য।
২২.  রূপক সাহা-র ময়দানি গল্প “বার পুজো”: বার্সিলোনা আর ম্যান ইউ-এর এই ভরা বাজারেও যারা লাল-হলুদ বা সবুজ-মেরুন নিয়ে মাতেন, তাদের (আজ্ঞে হ্যাঁ, আমিও ওই দলেই আছি) পক্ষে একেবারে যথাযথ এই সরস গল্পটি।
২৩.  দিব্যশঙ্খ রায়-এর গল্প “কলি”: গল্পটা বড়ো ভালো, কিন্তু লেখক এখনও গল্পের ভাষা রপ্ত করতে পারেননি, তাই কী হচ্ছে সেটা বুঝতে জান বেরিয়ে যায়!
২৪.  দীপিকা মজুমদার-এর গল্প “লোডশেডিংয়ের রাতে”: নাম আর অলঙ্করণেই গল্পটার সব বলে দেওয়া হয়েছে, নইলে আবহটা বেশ জমানো হয়েছিল। লেখক কি, বেশ একটু জায়গা নিয়ে, একটা লোম-খাড়া-করে-দেওয়া ভূতের গল্প দেবেন ভবিষ্যতে?
২৫.  সুদেব ভট্টাচার্য-র গল্প “স্টিভেন সাহেবের দিনলিপি”: ১৯৭২-এর উরুগুয়ান এয়ার ফোর্স ফ্লাইট ৫৭১ আন্দিজ-এর বরফে ঢাকা প্রান্তরে ক্র্যাশ করার পরে রবার্টো ক্যানেসার অবস্থা নিয়ে, সঙ্গে কিছু অতিলৌকিক উপাদান মিশিয়ে লেখা হয়েছে এই টানটান গল্পটা। ভালো লাগল।
২৬.  সুজন দাশগুপ্ত-র গল্প কাম স্মৃতিকথা “প্রতিশোধ!”: সচরাচর সোশ্যাল মিডিয়ায় শ্রদ্ধেয় সুজন দাশগুপ্ত তাঁর মনের মণিকোঠা থেকে আমাদের যে অসামান্য ভিনিয়েটগুলো উপহার দেন, সেগুলো প্রাপ্তবয়স্ক-ঘেঁসা বলেই বোধহয় এখানে তিনি একটা শিশুপাঠ্য জিনিস পেশ করার চেষ্টা করেছেন। লেখাটা কেমন যেন পাংচার হওয়া চাকার মতো গড়িয়েছে।
২৭.  সন্দীপন গঙ্গোপাধ্যায়-এর গল্পচ্ছলে ইতিহাস “গাছদাদু”: বটগাছের মতো বাঙালির জ্ঞানচর্চার ঐতিহ্যকে জুড়ে থাকা এক মানুষকে শিশুর চোখে দেখার পাশাপাশি অদ্ভুত এক মায়ায় মনটা ভরে যায় এই গল্পটা পড়লে। শাবাশ সন্দীপন।
২৮.  শ্যামসুন্দর গোস্বামী-র গল্প “হারিয়ে গেল দাদাই”: খুব বড়ো বিষয় নিয়ে খুব সহজ ভাবে লেখা একটা চমৎকার গল্প এটি। লেখকের আরো লেখা পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।
২৯.  “হাসিনা নানি ও এক নেকড়ে”: আপাতভাবে এটা নাকি সুনির্মল চক্রবর্তীর দ্বারা অনূদিত সংযুক্ত আরব আমিরশাহি-র একটি লোককথা। মুশকিল হল, গল্পটা একেবারে লাইন-বাই-লাইন ‘লিটল রেড রাইডিং হুড’ থেকে ‘অনুপ্রাণিত’ বা ডিকন্সট্রাক্টেড (সৌজন্যে হর্ষ দত্ত)। আর একথা যদি কেউ বলেন যে মূল গল্পটা সহি জায়গা, থুড়ি আরবেই উদ্ভূত, তাহলে তাকে কষে গালাগাল দেওয়া ছাড়া উপায় দেখছি না, কারণ ২০১৩ সালে জামশিদ জে তেহরানি ‘দ্য ফাইলোজেনি অফ লিটল রেড রাইডিং হুড’ প্রবন্ধে ম্যাথামেটিকাল মডেলের সাহায্যে উক্ত গল্পটির প্রায় ৫৮ রকম রূপ বিশ্লেষণ করে প্রমাণ করেন যে মূল কাহিনিটির উৎপত্তি খ্রিস্টীয় প্রথম শতাব্দীতে, ইউরোপে। এসব বিষয়ে কোনো খোঁজখবর না নিয়ে আলোচ্য অনুবাদটি পূজাবার্ষিকীতে শামিল করাটা সম্পাদকীয় আলসেমি, না সেকুলার হওয়ার প্রয়াস, তা বিজ্ঞজনেরাই বলতে পারবেন।
৩০.  ডাঃ পল্লব বসু-র গল্প “মৃত্যুর ওপিঠে”: চমৎকার একটি রহস্য গল্প উপহার দিয়েছেন লেখক আমাদের। এই গল্পটার সবচেয়ে বড়ো বিশেষত্ব হল, এতে রহস্যভেদী আর পাঠক একই ক্লু নিয়ে এগিয়েছেন, ফলে ক্লাসিক ‘গোল্ডেন এজ মিস্ট্রি’-র মতো এখানেও পাঠকের সামনে সুযোগ থাকে অপরাধীকে মোডাস অপারেন্ডাই-সহ পাকড়াও করার। এমন গল্প আরো পড়ার অপেক্ষায় রইলাম।
৩১.  সাগরিকা রায়-এর গল্প “হারিয়ে যাওয়ার পথ”: ছোটোদের গল্প নয়, বরং বড়োদের সব জটিলতা থেকে পালিয়ে যেতে চাওয়ার অবদমিত বাসনার এক শ্বাসরোধী গল্প এটি।
৩২.  দ্যুতিমান ভট্টাচার্য-র গল্পগাথা “সোঁদরবনের কেঁদো বাঘ”: আমি সচরাচর ছড়া বা কবিতা পড়ি না, কিন্তু এই আশ্চর্য সহজ ও সুন্দর পদ্য-গল্প পড়তে ভারি ভালো লাগল।
৩৩.  দেবাঞ্জন দেব-এর ভ্রমণকাহিনি “নারিকেল জিঞ্জিরার পথে”: নারিকেল জিঞ্জিরা আপামর বাঙালির কাছে শুধু ট্যুরিস্ট স্পট নয়, ছোটোখাটো তীর্থস্থানও বটে, কারণ হুমায়ূন আহমেদের বাড়ি এখানেই ছিল। সেখানে যাওয়ার অভিজ্ঞতা পড়তে বেশ লাগল।
৩৪.  অরিন্দম মুখোপাধ্যায়-এর গল্প “দুয়ার খোলার পরে”: রূপকথার গল্প? না কি সত্যি? অনেকেই বলেন যে এমন খেলা নাকি ধুলোমাটির পৃথিবীর কারো পক্ষে খেলা সম্ভব নয়। তাই হবে। তবে সেই রূপকথা থেকে উঠে আসা খেলোয়াড়ের গল্পটা পড়তে চমৎকার লাগল।
৩৫.  ইমন জুবায়ের-এর ভাষান্তরে রাশিয়ান রূপকথা “মাশা ও ভালুক”: বেশ ভালো লাগল এই ঝরঝরে অনুবাদটা।
৩৬.  শিশির বিশ্বাস-এর গল্প “হাবুলের দিলখুশ ম্যাজিক”: চমৎকার লাগল এই সহজ ও সুন্দর গল্পটা। আজকের ছোটোরা কিন্তু এমন সহজ গল্পই পছন্দ করে।
৩৭.  অভিষেক মুখার্জী-র “কে?”: বাংলায়, বিশেষত শিশু-কিশোর সাহিত্যে ওপন-এন্ডেড গল্পের বড়ো অভাব। তার ওপর সে গল্প যদি হয় genius loci নিয়ে, তাহলে তা তো লুপ্তপ্রায়। এই গল্পটা সেই অতি-অতি বিরল জিনিস। তবে লেখক হয়তো শব্দসংখ্যার ঠেলায় গল্পটা বড়ো দুম করে থামিয়ে দিয়েছেন। আমি তাকে অনুরোধ করব, পরে আর একটু হাত খুলে এটা নিয়ে লেখার।
৩৮.  অরুণাভ গঙ্গোপাধ্যায়-এর গল্প “পিছুটান”: বিপুল সম্ভাবনা নিয়েও গল্পটা নষ্ট হয়ে গেল স্রেফ লেখকের দুর্বলতায়। এশারের ড্রইং-ই বলুন বা মোবিয়াস স্ট্রিপ, সেই থিম নিয়ে লিখতে গেলে গদ্যভাষার ওপর আরেকটু নিয়ন্ত্রণ আশা করেছিলাম।
৩৯.  দেবাঞ্জন মুখার্জি-র গল্প “রাজার সঙ্গে একদিন”: প্রেডিক্টেবল গল্পও যে লেখার মুনশিয়ানায় সুখপাঠ্য হয়ে ওঠে, তার চমৎকার নিদর্শন এই সহজ, সোজাসাপটা গল্পটা।
৪০.  কৃষ্ণেন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়-এর গল্প “হুমকি”: সত্যজিৎ রায়-এর ‘বিপিন চৌধুরীর স্মৃতিভ্রম’ সামান্য মনে থাকলেও যে কোনো পাঠক বুঝে ফেলবেন, কী ঘটছে এই গল্পে।
৪১.   রামকৃষ্ণ ভট্টাচার্য সান্যাল-এর নিবন্ধ “সমুদ্রযাত্রা ও টাইটানিক”: একশো বছরেরও বেশি আগে উত্তর আটলান্টিকের কনকনে ঠাণ্ডা জলে ডুবে যাওয়া ওই অতিকায় জাহাজটি নিয়ে আমাদের অনেক প্রশ্নের উত্তর দিয়েছেন ঘনাদা এই সুখপাঠ লেখাটিতে।
৪২.  সাম্য দত্ত-র বিজ্ঞান-বিষয়ক লেখা “আলো-আঁধারির খেলা”: বিজ্ঞানের ইতিহাসে একটি উপেক্ষিত, এবং উচ্চাকাঙ্ক্ষী প্রতিদ্বন্দ্বীর দ্বারা ছলে-বলে-কৌশলে পরাভূত চরিত্রের সম্বন্ধে খুব অল্প হলেও কিছু কথা এই ঝরঝরে লেখাটিতে তুলে ধরার জন্য লেখকের উদ্দেশে আন্তরিক ধন্যবাদ দিই।

সব মিলিয়ে, ২১২ পাতার এই পূজাবার্ষিকী পড়ে আমার দুটো মাত্র কথা বলার আছে:
(১) এই পত্রিকা প্রকাশ কোনো মতেই বন্ধ করবেন না। এতে এমন অনেক নতুন লেখকের টাটকা-তাজা লেখা আছে, যা সচরাচর শারদীয়া পত্রিকায় পড়ার সুযোগ পাওয়া যায় না। অথচ এই নতুন লেখকদের সুযোগ না দিলে তাঁরা ইন্ডাস্ট্রির ফুরিয়ে যাওয়া কলমগুলোর জায়গা নেওয়ার অবস্থাতেই পৌঁছবেন না।
(২) ৫০০ কপি বই হুশ করে বিক্রি হয়ে যাওয়ার জন্য শুধুমাত্র এই বইয়ের অপেক্ষাকৃত কম দাম-কে দায়ী করে লাভ নেই। আমি বইটা পড়ে দায়িত্বের সঙ্গে বলতে পারি, কন্টেন্টের দিক দিয়েও এই বই অনেক নামজাদা পায়াভারি পত্রিকার নাক মাটিতে ঘষে দিতে পারে।


তাই, হে পাঠক, জানি না আপনি এই বইটা আর জোগাড় করে উঠতে পারবেন কি না। কিন্তু যদি পান, তাহলে অনেক আনন্দ, অনেক চিন্তার খোরাক পাবেন এই বই থেকে, এটা গ্যরান্টিড।
শুভ বিজয়া।

Thursday, 24 November 2016

গল্পের সৌরভ

ল্যামার্কের সূত্র মেনে অব্যবহারে ক্ষয়প্রাপ্ত অঙ্গের মতো আমার এই ব্লগ নিয়ে আজ আরেকবার বসা গেল। এবারের লেখাটা আমার এক বন্ধু-কাম-ভাইয়ের লেখালেখি নিয়ে।
আপনারা সৌরভ নামে ক’জনকে চেনেন?
বাঙালিদের মধ্যে এই নামটাকে মোটামুটি কমন বলা যায়, তাই এই নামে আপনারা যে একাধিক ব্যক্তিকে চিনবেন, সেটাই স্বাভাবিক।
আমি কাদের চিনি?

(১) সৌরভ গাঙ্গুলি: ভারতীয় পুরুষ ক্রিকেট দলের সর্বকালের শ্রেষ্ঠতম অধিনায়ক, এবং বিশ্বক্রিকেটে বাঁহাতি ব্যাটসম্যানদের মধ্যে অন্যতম শ্রেষ্ঠ এই খেলোয়াড়টির আলাদা করে পরিচয় দেওয়ার কোনো প্রয়োজন নেই। যদি কেউ দাবি করেন যে তিনি এঁকে চেনেন না, তাহলে, মা কসম! চুন-চুনকে মারুংগা!
(২) সৌরভ গাঙ্গুলি: আমার শালা। বিশ্বাস করুন, ইয়ার্কি মারছি না, গালাগালও দিচ্ছি না। আমার বউয়ের মাসতুতো ভাইয়ের নাম এটাই।
(৩) সৌরভ মুখোপাধ্যায়: এই সময়ের অন্যতম শ্রেষ্ঠ লেখক, যাঁর কাছ থেকে আমরা পেয়েছি ‘ধুলোখেলা’, ‘সংক্রান্তি’-র মতো অসাধারণ উপন্যাস, এবং অবিস্মরণীয় কিছু ছোটোগল্প।
(৪) সৌরভ দত্ত: মনোরঞ্জন ভট্টাচার্য-র বিভিন্ন রচনা এবং অলঙ্করণ নিয়ে “মনোরঞ্জন মিউজিয়াম”, প্রেমেন্দ্র মিত্র-র রচিত অদ্বিতীয় চরিত্র ঘনাদা-র বিভিন্ন কাহিনি প্রকাশের সঙ্গে জড়িত তথ্য এবং অমূল্য সব অলঙ্করণ নিয়ে “ঘনাদা গ্যালারি”, এবং সামগ্রিক ভাবে কৌতূহলোদ্দীপক এবং দুর্লভতম তথ্য ও অলঙ্করণের সমাহার “ব্লোগাস”-এর প্রাণপুরুষ হলেন এই মানুষটি।
বাংলা সাহিত্যের হারিয়ে যাওয়া ও ভুলে যাওয়া নানা দিকের সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া এই নীরব ও অনলস মানুষটির সঙ্গে পরিচয় হওয়াটা আমি আমার সোশ্যাল মিডিয়া জীবনের অন্যতম প্রাপ্তি বলেই মনে করি।
(৫) সৌরভ চক্রবর্তী: আজকের পোস্ট এই অনুজপ্রতিম তরুণের লেখালেখি নিয়েই।
আগরতলা থেকে প্রকাশিত ‘ব্ল্যাকবোর্ড’ নামক বিশিষ্ট পত্রিকার সম্পাদক এই মানুষটি নিজেও যে একজন দক্ষ সাহিত্যিক তা জানতে আমার বেশ সময় লেগেছিল। মানুষটি লেখেন খুবই কম, তাও প্রচারের ঢক্কা-নিনাদ থেকে দূরে থাকা পত্রপত্রিকায়। তাই তাঁর লেখাগুলো পাঠকের রাডারের নিচেই থেকে যায়।
বড়োদের লেখায় যথেষ্ট দড় সৌরভ রহস্য, রোমাঞ্চ, অলৌকিক সাহিত্যে পদচারণা করছেন আজ বেশ কয়েক বছর ধরে, যার নিদর্শন ছড়িয়ে আছে মূলত ‘ব্ল্যাকবোর্ড’ পত্রিকায় প্রকাশিত বিভিন্ন লেখায়, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলঃ “হোরেশিও, এমনি এক গল্প”, “ইক্লিপ্স”, “চতুর্থ স্তম্ভ”, এবং “কংক্রিট”।
শিশু-কিশোর সাহিত্যের অঙ্গনে সৌরভ পা রেখেছেন কম দিনই। আজকের এই পোস্টে আমি শিশু-কিশোর সাহিত্যে তাঁর যাত্রাপথের একটা ছবি তুলে ধরার চেষ্টা করছি।
পথ-চলতে শুরু করা যেকোনো শিশুর মতো এই লেখাগুলোয় লেখকের কলম বা আঙুল প্রথমে থেকেছে আড়ষ্ট এবং টলায়মান। কিন্তু একটু-একটু করে লেখক তাঁর নিজস্ব ভাষা খুঁজে পেয়েছেন, এবং উপহার দিয়েছেন একবার ধরলে শেষ না করে থামা যায়না, এমন বেশ কিছু গল্প।

১]   বিট্টুর চিঠিঃ বিট্টু নামে এক কৈশোরের দরজায় কড়া নাড়া শিশুর এই গল্পটা তার এক বন্ধুর সঙ্গে হওয়া বন্ধুত্ব নিয়ে খুব সরল ভাবে এগিয়েছে। কিন্তু গল্পটা ব্যতিক্রমী হয়েছে আপাতভাবে অলৌকিক উপাদান এতে মিশে গিয়ে তাকে কিছুটা ওপন-এন্ডেড করে দেওয়ার জন্যে।

২] মুখার্জিবাবুর গ্যাজেটঃ “কিচিরমিচির” পত্রিকার বৈশাখ ১৪২২ সংখ্যায় প্রকাশিত এই গল্পটা দিয়ে লেখক আরো একবার প্রমাণ করে দেন যে আপাত সহজ ছকের মধ্যেও তিনি শিশু-কিশোর সাহিত্যে এমন কিছু উপাদান নিয়ে আসতে চাইছেন, যা সচরাচর দেখা যায় না।
গল্পের বিষয়বস্তু এরকমঃ বিজ্ঞান শিক্ষক প্রতুলবাবু বেশ কিছুদিন ধরে অনিদ্রায় ভুগছেন। ঘুমের ওষুধ খেয়েও ঘুমোতে না পারা প্রতুল তাঁর ভাইপো বিট্টুকে নিয়ে এলেন এক দূরের বাংলোবাড়িতে। সেখানে মুখার্জিবাবু নামে জনৈক বিজ্ঞানীর আবিষ্কৃত একটি ঘড়ির মতো চেহারার যন্ত্র পাওয়া গেল ঝোপের মধ্যে, যা হাতে পড়লেই গভীর ঘুমে তলিয়ে যায় সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। এই গ্যাজেট কি পারবে প্রতুলবাবুর হারিয়ে যাওয়া ঘুম ফিরিয়ে দিতে?
বিজ্ঞান, সিউডো-সাইন্স, এবং মনস্তত্ত্ব দিয়ে সহজ ভঙ্গিতে একটা টানটান গল্প সাজিয়েছেন লেখক এখানে।

৩] বিট্টুর বাবুই কাণ্ডঃ “কিচিরমিচির” পত্রিকার ২০১৫ উৎসব সংখ্যায় প্রকাশিত এই গল্পটা কিন্তু একেবারেই সহজ-সরল, এবং যেসব পাখিদের দিকে আমরা এমনিতে তাকাইও না, তাদের প্রতি ছোটোদের মধ্যে কৌতূহল এবং ভালোবাসা জাগানোর উদ্দেশ্য নিয়েই লেখা।

৪]  মার্জার বিভীষিকাঃ “কাকলি” পত্রিকার ১৪২২ পুজো সংখ্যায় প্রকাশিত এই গল্পটা পড়া শুরু করে একেবারে এক নিঃশ্বাসে পড়ে ফেলতে হয়। এই গল্পের কাঠামোটিও আদ্যন্ত মনস্তাত্ত্বিক, এবং প্রাপ্তমনস্ক পাঠকের জন্যেই।
এক দুর্ঘটনার পর উদীয়মান লেখক রথিনের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছিল বেড়ালের ভয়ে। পরিবেশের বদল হলে অবস্থা বদলাবে, এই আশায় শহর থেকে দূরে এক বাংলোয় এল রথিন। কিন্তু সেখানেও তার পিছু নিল বেড়ালের থাবার ছাপ! তারপর কী হল?
লেখনীর যৎকিঞ্চিত শিথিলতা নিয়েও এই গল্পটি রোমাঞ্চলোভী পাঠকের মন জয় করবেই।

৫] শেষ গল্পঃ “কিচিরমিচির” পত্রিকার দ্বিতীয় বর্ষপূর্তি সংখ্যায় (এপ্রিল ২০১৬) প্রকাশিত হয় এই গল্পটি।
কন্সট্রাকশনের কাজ নিয়ে দিল্লির উপকন্ঠে যাওয়া এক ইঞ্জিনিয়ার তার প্রতিবেশীর রোজকার আচরণে এমন একটা অস্বাভাবিক জিনিস দেখল যে সে তার সঙ্গে আলাপ করল ব্যাপারটা ভালো ভাবে জানার জন্যে। সেই প্রতিবেশীর কাছে সে এমন একটা বই পেল যার গল্পগুলো অসম্পূর্ণ, অথচ বইটির পাঠক স্বপ্নে গল্পটার শেষ দেখতে পায়, আর প্রতিটি গল্পই শেষ হয় মৃত্যু দিয়ে। তারপর কী হল?
টানটান গতি, নির্মেদ সংলাপ, মজবুত কাঠামো, আর রুদ্ধশ্বাস সাসপেন্সঃ এই দিয়ে গড়ে ওঠা এই গল্পটি বাংলায় শিশু-কিশোর সাহিত্যের এক বিরল সম্পদ।

৬] ত্রিমাত্রিক ভয়ঃ “সন্দেশ” পত্রিকার জুলাই ২০১৬ সংখ্যায় প্রকাশিত হয় এই গল্পটি।
আগরতলা ছেড়ে দীর্ঘদিন কলকাতাবাসী মনোহর সিদ্ধান্ত নিলেন, তাঁর পৈতৃক বাড়ি, এতদিন যার রক্ষণাবেক্ষণ তথা ভোগদখল করে এসেছেন ছোটোবেলার বন্ধু ভোলা, এবার তিনি বেচে দেবেন তাঁর ভগ্নিপতিকে। সব ঠিকঠাক, কিন্তু সমস্যা হয়ে দাঁড়াল বাড়ির লাগোয়া আট থামওয়ালা চালাটি।
কেন? কীভাবে? আর রহস্যের সমাধান হল কেমন করে?
রহস্য-রোমাঞ্চ, আর তার পাশাপাশি বিজ্ঞান ও যুক্তিকে পছন্দ করা ছোটোরা যে এই গল্প খুব-খুব ভালোবাসবে, এ নিয়ে আমি নিশ্চিত।

৭]   সুনন্দ আর সবুজ বজ্রঃ “কিচিরমিচির” পত্রিকার ২০১৬ উৎসব সংখ্যায় প্রকাশিত হয়েছে এই গল্পটি।
গ্রামের ফাঁকিবাজ ছেলে সুনন্দ এক রাতে জানলা দিয়ে বাইরের ঝড়বৃষ্টি দেখছিল। হঠাৎ সে দেখল, একটা সবুজ আলো পড়ল কিছুটা দূরের ঝোপঝাড়ে। সক্কাল হতেই সেখানে গিয়ে সে খুঁজে পেল সবুজ আলোর দ্যূতি ছড়ানো বাজ-এর মতোই চেহারার একটা জিনিস। নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে সে বুঝতে পারল, আশ্চর্য ক্ষমতা আছে সেই সবুজ বজ্রের।
তারপর কী হল?
কল্পবিজ্ঞান, ফ্যান্টাসি, ইচ্ছাপূরণ, আর বড়ো হওয়ার এই সহজ-সুন্দর গল্পটা পড়তে পেয়ে মন ভরে যায়।

আমার এই সংক্ষিপ্ত পোস্ট পড়ে সৌরভের লেখার বিষয়গত বৈচিত্র্য, এবং কাহিনির নির্মাণকুশলতা বোঝা মুশকিল। আরো কঠিন প্রাপ্তবয়স্ক পাঠকের জন্য লেখায় তাঁর দক্ষতার আন্দাজ পাওয়া, যেহেতু তাদের নিয়ে এযাত্রা কিছু লেখা গেল না। হয়তো পরের বার...
আপনারা যদি ওঁর লেখা পড়তে চান, তবে কিচিরমিচির পত্রিকাটি জোগাড় করার চেষ্টা করুন। অনেকগুলো ভালো লেখা সেখানেই পেয়ে যাবেন।

আশা রাখি যে পাঠকের পৃষ্ঠপোষকতায় এবং সম্পাদকদের উৎসাহে সৌরভ তাঁর লেখা দিয়ে আমাদের আমোদিত করে চলবেন আরো অনেক-অনেক দিন।

Sunday, 21 August 2016

স্বীকারোক্তি, অথবা ভ্যাপসা গরমে রোববারের দুপুর

“শান্তনু, আমি তোকে বলা কথাটা ভুলে গেছিলাম রে। সরি। আবার ঠেকে শিখলাম আর কী। আমি আর এই ভুলটা করছি না”।
আজ থেকে প্রায় ষোলো বছর আগের কথা।
তখন আমার যা রুটিন ছিল, সেটা মেনেই সকাল এগারোটার কল্যাণী সুপার ধরে কলকাতা গিয়ে, আর আই.আই.এস.ডব্লু.এম-এ পড়াশোনা সেরে বিকেল পৌনে পাঁচটা নাগাদের গ্যালপিং শান্তিপুর-টা ধরে ব্যারাকপুর ফিরছি।
দরজার কাছে, কনুই আর মাথার জংগলের মধ্য দিয়ে হাতদুটোকে ওপরে তুলে, পা-মাড়ানো এড়িয়ে একটু-একটু করে পজিশন নিচ্ছি। এমন সময় শান্তনু’র সঙ্গে দেখা হয়ে গেল।
শান্তনু সেই বিরল লোকেদের একজন, যে আমার সঙ্গে বিবেকানন্দ মিশন, রহড়া মিশন, ভি.সি. কলেজ, কালীবাড়ির মাঠের হাস্যকর ক্রিকেটঃ এই সব কিছুতে থেকেও কখনও আমার বন্ধু হয়নি। বা আমি ওর বন্ধু হইনি। একই ব্যাপার।
সেদিন কিন্তু, ট্রেনের সেই মারাত্মক ভিড়ে পাস্কালের সূত্র মেনে আমার ওপর পড়া চাপ সুষমভাবে নিজের চারপাশে ছড়িয়ে দিতে-দিতেও ওর সঙ্গে আমার হওয়া অতি-সংক্ষিপ্ত কথোপকথনটা খুব দামি ছিল। ওর কাছে হয়তো নয়, কারণ ও কথাটা খুব সহজভাবেই জিজ্ঞেস করেছিল।
বন্ধুত্বের অধিকার না থাকলেও একটা বয়স অবধি বোধহয় সবাই সবাইকে অনেক কিছু জিজ্ঞেস করতে পারে। ও সেই ভাবেই প্রশ্নটা করেছিল।
“ঋজু, আমাদের ব্যাচের সবাই তো কাজে ঢুকে গেল। অমুক-অমুক তো বিয়ে করে বাচ্চার অন্নপ্রাশন খাইয়েও দিল। এক তুই এখনও বেকার রয়ে গেলি। কেন রে? তুই কি কোনও কাজই পাচ্ছিস না?”

শহরতলি শেষ হয়ে তখন যে ভিড়টা দরজার সামনে দলা পাকাচ্ছে, তাতে জমাট বাঁধা লোকেরা প্রায় সবাই আমারই মতো ব্যারাকপুরের বাসিন্দা, নয়তো শেওড়াফুলি বা শ্রীরামপুরের লোক, যারা স্টেশন থেকে ফেরিঘাটের অটো নেবে। তাদের মধ্যে কেউ-কেউ আমাকে চেনে, আবার অনেকেই চেনে না, কিন্তু শান্তনুর গলার স্বরে কোথাও হয়তো তারাও বুঝতে পেরেছিল, ওই “এক তুই”-এর পেছনে রয়েছে কিছু একটা বিশেষ ব্যাপার।
মাধ্যমিকে সাব-ডিভিশন টপার, উচ্চ-মাধ্যমিকে প্রথম কুড়ির মধ্যে থাকাঃ একে কি বিশেষত্ব বলা যায়?
যায় হয়তো। জানিনা, তবে ভিড়ের একটা বড়ো অংশ হঠাৎই আমার দিকে তাকিয়েছিল তখন।
১৯৯৭-এর সেপ্টেম্বরে বি.এইচ.ইউ, এবং বায়োটেকনলজির কোর্স ছেড়ে চলে এসেছিলাম আমি। খেয়াল চেপেছিল সিভিল সার্ভেন্ট হওয়ার। ডব্লিউ.বি.সি.এস নয়, আই.এ.এস!
তবে মান্থলি-তে অকুপেশনের জায়গায় একটা ড্যাশ বসানোর সময়, লিফটে চেপে নামতে গিয়ে দড়ি ছেঁড়ার অনুভূতিটাও হয়েছিল তখনই।
সেই ভাবেই তদ্দিনে তিন বছর কেটে গেছে।
শান্তনু’র প্রশ্নটাকে তাই, কোনও মতেই অন্যায্য বলা যায় না।
কিন্তু আশে-পাশে দাঁড়ানো লোকগুলোর চাউনিতে কি শুধুই কৌতূহল ছিল?
আমার কেন যেন মনে হয়েছিল, সেই চাউনিগুলোতে আমি দেখতে পাচ্ছি, আর মিনিট পাঁচেকের মধ্যেই তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মে ঢুকে এদিক-ওদিক ছিটকে যাওয়ার আগে এক চিলতে হিংস্র মনোরঞ্জন-লাভের বাসনা।

আমি কি রেগে গেছিলাম? বা ভয় পেয়েছিলাম? ও দুটো তো বেশির ভাগ সময়েই একই মুদ্রার এপিঠ আর ওপিঠ। ফাইট, অর ফ্লাইট।
আমি নিজেই আশ্চর্য হয়ে শুনেছিলাম আমার কথাগুলো।
“আসলে কী জানিস? এখন আমার ঘুঁটিটা পেকে এসেছে। এখন এই খেলা ছেড়ে অন্য দিকে মন দিলে, তারপর সারা জীবন আপশোস করতে হবে।
আপশোস করার মতো জিনিসের লিস্টটা এখনই অনেক লম্বা হয়ে গেছে রে। সেটা আর বাড়াতে চাই না”।
শান্তনু আর কিছু জিজ্ঞেস করেনি।
আর কতদিন এই ‘পাকা ঘুঁটি ঘরে তোলা’-র পেছনে আমি ব্যয় করব, এটা ও জানতে চায়নি।
তবে আমি নিজের কাছে জবাব চেয়েছিলাম, এবং নিজেকে একটা ডেডলাইন দিয়েছিলাম, যার মধ্যে সিভিল সার্ভিস হলে হবে, না হলে গলায় টাই ঝুলিয়ে জিনিস বেচতে বেরিয়ে পড়ব।

তারপর আর কোনও দিন শান্তনু’র সঙ্গে আমার দেখা হয়নি।
এক বছরের মধ্যেই আমি ডব্লিউ.বি.সি.এস এবং আই.এ.এসঃ দুটো নদীই পার করি, আর ব্যারাকপুর ছাড়ি।
তারপর অন্য জায়গা, অন্য গল্প, অন্য জীবন।

কিন্তু আজ হঠাৎ এসব কথা কেন?
কারণ আজ আমি আবিষ্কার করেছি, যে আমি আপশোস করার মতো বিষয়ের তালিকা স্বেচ্ছায় দীর্ঘায়িত করাটা আবার শুরু করেছি।
আমি রিভিউয়ার হিসেবে নাম, বা মগনলাল মেঘরাজ-এর মতো বদনাম, কুড়িয়েছি বেশ কিছুদিন হল। ইদানিং দেখছি, সেই সুবাদে আমার কাছে বাংলা আর ইংরেজিতে বেশ কিছু বইপত্র এসেছে রিভিউ করার জন্যে।
ইংরেজি বইপত্র নিয়ে সমস্যা নেই। সেগুলো আমি পড়ি খুব দ্রুত, এবং তালি বা গালি চটপট ওয়েবের জানলা দিয়ে ছুঁড়ে দিয়েই আমি আবার নিজের পছন্দসই বই নিয়ে কাত হই।
সমস্যা হয় বাংলা বই নিয়ে।

আমার স্ত্রী এবং মেয়ে অত্যন্ত বিচক্ষণ, তাই তাঁরা আমাকে সংসারের একমাত্র নাবালক সদস্য হিসেবে ট্রিট করেন। কিন্তু তার বাইরে যারা ফেসবুক বা অন্যত্র আমার প্রোপি হিসেবে বিরাজমান প্রফুল্ল আনন দেখে বিভ্রান্ত হন, তাঁরা আমাকে প্রায়ই বিভিন্ন লেখা পড়তে বলেন যেগুলো “বড়োদের লেখা” বলে পরিগণিত হয়, অথচ যেগুলো থ্রিলার, ভূতের গল্প, গোয়েন্দা গল্প, কল্পবিজ্ঞান, রহস্যঃ এসব জঁর ফিকশনের বাইরে।
আমার পক্ষে এই কাজটা দুঃসাধ্য বললেও কম বলা হয়।
তবু, নানা বাহানা দিয়ে, এমনকি ‘ট্যাহা নাই’ বলে আমি ওই ধরণের লেখাপত্তর পড়ার অপচেষ্টা থেকে নিজেকে বিরত রাখি।
কিন্তু বিনামূল্যে পাওয়া বই নিয়ে “কী হবে উপায়”?
ওগুলো রিভিউ না করলে প্রতি মুহূর্তে আশংকা হয়, এই বুঝি সাহিত্যিক ফেসবুক বা অন্য কোনও মাধ্যমে আমার নাগাল পাবেন, এবং ক্যাঁক করে আমায় চেপে ধরে জানতে চাইবেন, “এতদিন (আমার বইয়ের রিভিউ নিয়ে) কোথায় ছিলেন?”
বিশ্বাস করুন, ভাবনাটা এতই উদ্বেগজনক, যে হাতে থাকা গরম চপ-তুল্য থ্রিলারকেও বাসি মুড়ি বলে মনে হয়।
তাই, পরদিন ঘুম থেকে ওঠার পর ‘দিনের শুভ সূচনা’-র আশায় ইসবগুল খাওয়ার মতো করে, আজ তেমন দুটো রিভিউ-অপেক্ষিত বই নিয়ে শুলাম।

ওরে বাবা!
আমার প্রথমেই মনে হল, এদের দেয় কে, মানে ছাপে কে?
এই দুঃখবাদী প্যানপ্যান, যার পাতার-পর-পাতা জুড়ে আছে মেয়েদের/মহিলাদের/বৃদ্ধাদের আত্মত্যাগ, ছেলেদের/পুরুষের/বুড়োদের লোভী+দুর্বল+হিংস্র+শোষক+প্রবঞ্চক চেহারা, যার ন্যারেটিভ হল কবিতা-লাইট আর কেন্দ্রীয় চরিত্র হল সানলাইট, মানে শুভ্রতার ঝলক..... এসব কারা পড়েন?
যাঁরা পড়েন, তাঁদের মেহফিলে ভুলক্রমে গিয়ে পড়লে আমি যে বর্তমানের আদনান সামি চেহারা থেকে একেবারে সামি কাবাব হয়ে যাব, এটা গ্যারান্টিড। তাই আগেই সেইসব শ্রদ্ধেয় পাঠক-পাঠিকাদের কাছে বিনম্র নিবেদন পেশ করছি, আমাকে বিষবৎ পরিত্যাগ করুন, যাতে আমি আমার ভূত-রহস্যরোমাঞ্চ-সাইফাই-গোয়েন্দা এসব বই পড়ে আর তাই নিয়ে গালি-তালি দিয়েই এবারের মতো প্রাণে বেঁচে থাকি।
“তাই শান্তনু, আমি আজ থেকে শুধু সেই বই-ই পড়ব, যা পড়তে আমার ইচ্ছে করে। কে কী চাইল, বা কে কী দিল, সেই নিয়ে আমি আর মাথা ঘামাব না। বাজারে চিন্তাশীল ও মনস্বী পাঠক আছেন ভূরি-ভূরি। তাদের থেকে অনেক দূরে, কোনও একটা রঙচঙে মলাটের বই নিয়ে আমি এবার কাত হচ্ছি।

আশা করি তুই ভালো আছিস”।

Sunday, 21 February 2016

রুদ্ধশ্বাস সপ্তক: পাঠ প্রতিক্রিয়া

ধরুন, আপনি একজন লেখকের লেখা পড়তে বেশ পছন্দ করেন| মুশকিল হচ্ছে, তাঁর লেখার প্রতি এই ভালোলাগাটা তৈরি হয়েছে কয়েকটা বিশেষ ধরনের গল্প পড়ে, যারা মূলত একটা জঁর-এর অন্তর্ভুক্ত| এবার, যখনই সেই লেখকের কোন নতুন গল্প প্রকাশ পায়, আপনি সেই কয়েকটা বিশেষ গল্প পড়ে হওয়া অনুভূতির মাপকাঠিতে নতুন গল্পটিকেও মাপতে যান| তার ফল কী হয়? যখন লেখক সেই জঁর-এর কিছু লেখেন তখন তালি, আর নইলে গালি! কিন্তু এটা কি সেই লেখকের প্রতি নিদারুণ অবিচার নয়, বিশেষত তিনি যখন গল্পের আকাশে ডানা মেলে সন্ধান করছেন সম্পূর্ণ নতুন ভূখণ্ডের? প্রসেনজিৎ বন্দোপাধ্যায় এমনই এক লেখক, যাঁর লেখার প্রতি এই অবিচার বোধহয় শুধু আমি নয়, অনেকেই করেছেন, কারণ ওনার কয়েকটা জঁর-বন্দি লেখা পড়ে আমার মতো আরও বহু পাঠক ফিদা হয়েছেন ও হয়েই আছেন! তাই লেখক আমাদের মতো বদরাগী পাঠকের কাছে এই নিয়ে কিছু বলতে এলেই আমরা যা বলি তার সরলার্থ: এর জন্যে ওনারই গাওয়া উচিত, “দোষ কারও নয় গো মা, আমি স্বখাত সলিলে...”|

ধান ভানতে এতখানি শিবের গীত গাইলাম কারণ গতকাল রাত থেকে পড়া শুরু করে, নানা স্থানে (যার মধ্যে হোটেলের অস্বস্তিকর বিছানা, দুপাশে বৃষ্টিভেজা চা-বাগান নিয়ে পড়ে থাকা পিচরাস্তায় দাঁড়ানো সুমো, এয়ারপোর্টের লাউঞ্জ, প্লেনে ‘কোনঠাসা’ শব্দের বাস্তবায়িত রূপ: সিট, এ সবই আছে) ও কালে যে বইটি আমি শেষ করেছি সেটি প্রসেনজিৎ বন্দোপাধ্যায়-এর সাম্প্রতিক গল্প-সংকলন “রুদ্ধশ্বাস সপ্তক”| বইটি মাত্র ১৫৭ পাতার পেপারব্যাক| চমৎকার ছাপা, টাইপোর কলংকবর্জিত, এবং সুমন্ত গুহর পরিমিত অলংকরণে সমৃদ্ধ সাতটি গল্পের সংকলন এই বইটি যে আমার খুব-খুউব ভালো লেগেছে শুধু তাই লিখে ভালোলাগাটা ঠিক বোঝানো যাবে না|

আগে লিখি, সাতটা গল্প ছাড়া এই বইয়ে আর কী আছে| আছে এই সময়ের সেরা সাহিত্যিকদের অন্যতম, শ্রী সৌরভ মুখোপাধ্যায়-এর একটি ভূমিকা, যেটি নিয়ে আমি শুধু এটুকুই লিখব যে এমন অসাধারণ বইয়ের জন্যে ঠিক এমন একটি ভূমিকারই দরকার ছিল, যেটি পড়ার পর পাঠক বুঝবেন যে তিনি কী অমূল্য রতনের দ্যূতিতে আলোকিত হতে চলেছেন| যদি আমার কখনও বই ছাপা হয় (ওরকম ভাবে হাসবেন না; টবে ফুলকপি চাষ নিয়ে বই বেরোতে পারে, আর আমার বেলাতেই আপনাদের..) তাহলে সৌরভকে ধরে একখান ভূমিকা আদায় করতেই হবে|

এবার আসি গল্পদের কথায়|

(১) অতঃ সার শূন্য: এই গল্পটি এক বিখ্যাত সাহিত্যপত্রে প্রকাশের পর নানাবিধ কাঁটাছেড়ার মধ্য দিয়ে গেছিল, তাই অধিকাংশ পাঠক গল্পটিকে হয়তো চট করে চিনে ফেলবেন| সেই সময় গল্পটি আমার পড়তে ভালো লাগেনি| ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হল, কাল রাতে আবার গল্পটা পড়তে গিয়ে বুঝলাম যে লেখক গল্পটায় খুব সূক্ষ্ম কয়েকটা, আর একটা বিশাল পরিবর্তন এনেছেন| এতে লেখাটা বেশি যুক্তিযুক্ত তো হয়েইছে, সঙ্গে লেখার ‘রাফ এন্ড টাফ’ ভঙ্গিটা খুব মানানসই হয়ে উঠেছে| এর বেশি লিখছি না, শুধু এটুকুই বলার যে যদি গল্পটা আগে পড়ে না থাকেন তবে এই সংকলনের প্রথমেই এটি পড়বেন না| বরং অন্য ক’টা লেখা পড়ে নিজেকে তৈরি করে রাখুন এই ‘ট্রিট’-টির জন্যে|

(২) হাতে রইল তিন: প্রেম, বন্ধুত্ব, ঈর্ষা, আবেগ, যুক্তি, বুদ্ধি, হতাশা, লালসা, ক্রূরতা: এই সব ক’টি রঙের মিশেলে সেজে উঠেছে এই বইয়ের সবথেকে টানটান, ট্র্যাজিক, এবং প্যাশনেট এই গল্পটি| অন্য কোন লেখকের হাতে এই গল্প যা হতে পারত তা বোঝাতে আমরা চলতি বাংলায় ‘ছড়িয়ে লাট’ কথাটি ব্যবহার করি, কিন্তু লেখক জমিয়ে দিয়েছেন| শুধু শেষের পাতাগুলোয় পৌঁছবার আগে কয়েকটা অনুচ্ছেদ যদি বাদ দেওয়া যেত...|

(৩) ননিগোপালের ভয়: ভূতের গল্প পড়ে ভয় পেতে চাওয়া পাঠকের আত্মারাম খাঁচাছাড়া করার মতো এই গল্পটি শুধু এই সংকলনের নয়, সাম্প্রতিককালে প্রকাশিত সেরা ‘ভয়ের’ গল্প বলে পরিগণিত হতে পারে| গল্পের সবথেকে উল্লেখযোগ্য বিষয় কিন্তু এটাই যে এই গল্পটি কঠোরভাবে লৌকিক, এবং এর শেষে যে রহস্যটা রয়েছে সেটা সমাধান করার মতো প্রচুর ক্লু লেখক দিয়েই রেখেছিলেন পাঠকের জন্যে|

(৪) জলযাপনের দিনগুলি: এক সাঁতার-ক্লাবের পটভূমিতে প্রেম, ক্রোধ, আর ঈর্ষার এই ঝাঁঝালো গল্পটিও পেশ করেছেন লেখক তাঁর ট্রেডমার্ক তথ্যগত নিষ্ঠা, বর্ণনার বাস্তবিকতা, চূড়ান্ত সাবলীল ভাষা, আর টানটান করে রাখা গতি দিয়ে| বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: গল্পটির সঙ্গে থাকা অলংকরণ দেখে কেউ যদি ভাবেন যে এটি একটি ‘মজার’ গল্প, তাহলে ভয়ংকর রকম ভুল করবেন|

(৫) ননিগোপালের জুতো: গতবছরের শারদীয়া টগবগ-এর তিনটি সেরা লেখার মধ্যে ছিল এই লেখাটি, যার ছত্রে-ছত্রে মিশে গেছে নিখুঁত বর্ণনা, নিপুণ ব্যঙ্গ, দুরন্ত গতি, আর শেষে আক্ষরিক অর্থে মুখ হাঁ করিয়ে দেওয়া চমক! একবার পড়ুন, বারবার পড়ুন|

(৬) মেঘবরণ: এই গল্পটা নিয়ে আমি যাই লিখি না কেন, গল্পটা পড়ার পর চুপ করে বসে থাকা আমার মনের অবস্থাটা কিছুতেই বোঝানো যাবে না| শুধু এটুকু লিখি: রাগ-বিরাগ-সংরাগ দিয়ে গড়া এই গল্পটা পড়ার পর আপনিও চুপ করে বসে থাকবেন| হয়তো মনে-মনে আপনিও ভিজবেন সেই বৃষ্টিতে, যা মনের অব্যক্ত দুঃখ আর অনুতাপদের অবশেষে বেরিয়ে আসার সুযোগ করে দেয় নিজের আড়ালে অশ্রুকণাদের লুকিয়ে রেখে|

(৭) অ্যাটিনা: অলৌকিকের আড়ালের লৌকিক সত্যিটা কীভাবে প্রকাশ করতে হয়, সে ব্যাপারে লেখকের এই গল্পটিকে ভবিষ্যতে টেক্সট হিসেবে ব্যবহার করা হলে আশ্চর্য হব না| তবে কুকুর লেখকের (এবং আমারও) বড়ো প্রিয়, তাই জানিয়ে রাখি, মানুষের শ্রেষ্ঠ বন্ধুদের নিয়ে লেখা লেখকের সেরা লেখাটি কিন্তু এই বইয়ে নেই| ‘শোধ’ নামের সেই গল্পটি “এপার বাংলা ওপার বাংলা”-য় সংকলিত, সম্ভব হলে খুঁজে নেবেন অবশ্যই|

তাহলে সব মিলিয়ে কী দাঁড়াল? দাঁড়াল এটাই যে প্রকাশকের অপেশাদারিত্ব আর পরিকল্পনার অভাবে যাঁরা বইমেলায় বিভা পাবলিকেশন-এর স্টলে গিয়েও বইটি পান নি, যাঁরা বইটি নিয়ে গত ক’দিনে ফেসবুক আর অন্যত্র হওয়া আলোচনার পরিপ্রেক্ষিতে দোলাচলে ভুগছেন যে বইটা পাঠযোগ্য কি না, আর যাঁরা বইটার কথা প্রথম শুনলেন, তাঁদের সবার উদ্দেশ্যে বিনীত আবেদন: ৯১-৯৪৩৪৩৪৩৪৪৬ বা ৯১-৯৭৪৯৭০১৯৮৮-য় ফোন করে প্রকাশকদের উত্যক্ত করে বের করুন বইটা কোথায় পাবেন, হোম-ডেলিভারি সম্ভব কি না, বইটা বিদেশে পাওয়া যাবে কি না, ইত্যাদি, এবং তারপর বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে বইটা কিনে ফেলুন|


বিশ্বাস করুন, কেন বইটা নিয়ে এমন হাউমাউ করছি সেটা বইটা পড়ার পরেই বুঝবেন, আর তারপর আপনিও অন্য কোন পাঠককে সন্ধান দেবেন এই ‘রুদ্ধশ্বাস সপ্তক’-এর| তাহলে আর দেরি কেন? ফোন করুন, ফোন করুন! ইতিমধ্যে, সেলাম প্রসেনজিৎ!