Friday, 29 January 2016

'সৃষ্টি' এবং গল্পের রাত

বইমেলা শুরু হওয়ার পর দিন তিনেক পেরিয়েছে| মেলা-উপলক্ষে হওয়া আড্ডার এবং জন-সমাগমের ছবি ছড়িয়ে পড়ছে ফেসবুকে| আর আনন্দ নিয়ে গেছে ওরা সকলে, দুঃখটা থাক নয় শুধুই আমার স্টাইলে গুয়াহাটিতে পড়ে আছি আমি| এই মন-খারাপ ভাবটা কাটানোর জন্যে কাল রাতে আমার নিত্যপাঠের (ভূত, রহস্য, রোমাঞ্চ, কল্পবিজ্ঞান, ফ্যান্টাসি) বাইরের দুটো বই তুলে নিয়েছিলাম| দুটো বই-ই আমাদের আদরের প্রকাশনা সৃষ্টিসুখ থেকে প্রকাশিত গল্প-সংকলন, গত বইমেলার সময়ে কেনা (যেকোন গ্রন্থকীটের মতো আমারও পড়তে হবে বলে কেনা বইয়ের সংখ্যা পড়া হয়েছে-র তুলনায় অনেক বেশি) হলেও নানা রকম অমনিবাস আর সমগ্র-র ভিড়ে ঘাপটি মেরে ছিল বলে হাতে আসেনি| বইদুটো সুমুদ্রিত, ছিমছাম, এবং শ্রদ্ধেয়া বাণী বসুকে উদ্ধৃত করে বলতে গেলে, বাইরে শুকনো, ভেতরে মধুর বয়ামের মতো ভারী| বইদুটো পড়ে শেষ করতে রাত তিনটে বাজল| আর তাদের পড়ে কেমন লাগল, সেই নিয়ে লেখার জন্যেই এই পোস্ট|

প্রথম বইটি হল পাঁচটি নভেলা, যাতে আছে:
(১) সৈকত মুখোপাধ্যায়-এর বেদনার রঙ: এই লেখকের বিশেষত্ব এটাই যে তাঁর আপাত সুখপাঠ্য এবং দ্রুতগামী অশ্বের মতো শিহরণ-জাগানিয়া গদ্য প্রায়শই আমাদের এমন অন্ধকারে নিয়ে যায় যেখানে আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু ভাবটা প্রগাঢ় হয়ে ওঠে আর পাঠকের অজান্তেই তাঁর জগৎ বিষিয়ে যায় কালচে নীল রঙে| এই গল্পটি খানিকটা তেমন, তবে খানিকটা উত্তরণ-অভিমুখীও বটে| বেশ-বেশ ভালো গল্প|
(২) দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য-র শেষ বিচার: কল্পবিজ্ঞানের মোড়কে এই অসামান্য বড়ো গল্পটি এই বইয়ের সেরা লেখা, এবং সাম্প্রতিককালে আমার পড়া অন্যতম সেরা কাহিনিও বটে| তবে খুব-খুব আশায় আছি যে লেখক তাঁর এই কল্পকাহিনিগুলোকে একত্রিত করে গ্রন্থবদ্ধ করবেন অদূর ভবিষ্যতে|
(৩) মহুয়া মল্লিক-এর শূন্য গর্ভ: ঝুল|
(৪) দেবাশিস বন্দোপাধ্যায়-এর নিভৃতে যতনে: বোরিং|
(৫) অভীক দত্ত-র শুরুয়াৎ: সলিড লেখা| ওয়েবজিনে আর এখানে-ওখানে এনার যত লেখা পড়েছি, তার মধ্যে খুব উঁচু দিকে থাকবে এই গল্পটা| একটাই আক্ষেপ, এমন টানটান আর প্রায় শ্বাসরোধী গদ্য লেখার ক্ষমতা নিয়েও ইনি পলিটিক্যাল থ্রিলার (নষ্ট সময়ের উপাখ্যান স্মর্তব্য) আরও বেশি করে লেখেন না কেন|

দ্বিতীয় বইটি হল সৃষ্টি গল্প প্রতিযোগিতা, সেপ্টেম্বর ২০১৩- উপলক্ষে শীর্ষ স্থানাধিকারী এবং উল্লেখযোগ্য গল্পের সংকলন| অনেক গল্প যেখানে জমা হয় সেখানে কিছু হিট কিছু মিস থাকবেই, এই বইয়ের গল্পরাও তার ব্যতিক্রম নয়| তবে যেটা দেখে (ও পড়ে) বেশ হতাশ হলাম সেটা হচ্ছে তথাকথিত টপ টেন-এর বেশির ভাগ গল্পই খুব দুর্বল, এবং চালাকির দ্বারা মহৎ কার্য করায় (অর্থাৎ পরীক্ষানিরীক্ষার নাম ‘গল্প’ জিনিসটাকে বিসর্জন দেওয়ায়) তত্পর| এতে যেসব গল্প আছে তারা হল:
প্রথম দশ: -
১) সংহিতা মুখোপাধ্যায়-এর সুকন্যা বৃত্তান্ত: আহামরি নয়, কিন্তু ভালো|
২) সৌরাংশু সিংহ-র সত্যি: গল্পের মধ্যে গল্পটা বেশ জমেছিল, কিন্তু শেষটা কেমন হুড়মুড় করে থেমে গেল|
৩) হৃষীকেশ বাগচী-র আর্যরক্ত: জালি|
৪) শাশ্বতী ভট্টাচার্য-র ডিয়ার মিস্টার কভি: পচা|
৫) সুপ্রিয় সাহা-র অতনুর নামগন্ধ: পরীক্ষামূলক গল্প| আমার ভালো লাগেনি|
৬) উল্কা-র বি-দূষকম মূড়োকাবচনম: আরেকটি পরীক্ষামূলক এবং মূলত আঁতেল-মনস্ক গল্প, যা আমার অত্যন্ত বাজে লেগেছে|
৭) এশরার লতিফ-এর স্ফটিক বাড়ি: ভালো| বেশ ভালো|
৮) জয়াশীষ ঘোষ-এর বোধন: বেশি লম্বা, তবে শেষে চমক আছে|
৯) অভ্র পাল-এর চিড়: রাবিশ|
১০) শংকর সেন-এর ঘুষ: বোরিং|
১১) মোজাফফর হোসেন-এর গল্পগুলো পাথরের: এই গল্পটা এজন্যেই উল্লেখযোগ্য যে এমন রদ্দি গল্পও লেখক প্রতিযোগিতায় পাঠিয়েছেন, আর সেটা অত্যাধুনিক বিচার-পদ্ধতিতে ওপরের দিকে এসেও গেছে|
১২) মাহফুজ পারভেজ-এর মোহনা: যাচ্ছেতাই!

বিশেষ উল্লেখ:
১. অদিতি ভট্টাচার্য্য-র “গল্পের খোঁজে”: ভালো|
২. অনিরুদ্ধ সেন-এর “একটি ভালোমানুষের গপ্পো”: আহা, এমন ইচ্ছাপূরণের আর মন-ভালো করা আরও গল্প যদি পড়তে পেতাম!
৩. অলোকপর্ণা-র “দশ ফুট বাই দশ ফুট”: পরীক্ষামূলক, তথা আঁতেলদের জন্যে লেখা|
৪. আষিক-এর “বিড়ালমনস্কতা”: আরও একটি আঁতেলপাঠ্য লেখা|
৫. ঋষি সৌরক-এর “শু”: এই জিনিসও এখন ‘গল্প’ বলে চিহ্নিত হচ্ছে তাহলে!
৬. কিশোর ঘোষাল-এর “স্তন্যডায়িনি”: ভয়াবহ, নির্মম, নৃশংস, এবং পড়ার পর থম-মারিয়ে দেওয়া এই জিনিস থেকে আমি এমনিতে আলোকবর্ষ দূরে থাকা পাবলিক, কিন্তু “ফর দ্য আঁতেলজ, অফ দ্য আঁতেলজ, বাই দ্য আঁতেলজ” লেখার ভিড়ে এমন একটা জিনিস পেয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছিলাম| লেখককে, এবং তাঁর অন্যান্য লেখাকে, খুঁজে বের করতে হবে এখন|
৭. প্রতীক মিত্র-র “শিবপুরাণ”: ধুস!
৮. বিতান চক্রবর্তী-র “পরলেই রাজা”: পড়া যায়, তবে ওই অবধিই|
৯. মৌ দাশগুপ্তা-র “কোনও এক গাঁয়ের কথা”: সপ্রতিভ ও বুদ্ধিমান ড্রাইভারের চালানো একটি দ্রুতগামী গাড়ির সওয়ারি হয়ে খাদে পড়লে যেমন লাগে, গল্পটা শেষ করে তেমনই লাগল|
১০. মুরাদুল ইসলাম-এর “মার্চ করে চলে যাওয়া একদল কাঠবিড়ালি ও খয়েরি ঘাসফড়িং”: দুর্বোধ্য ও আঁতেলপাঠ্য|
১১. সর্বজয়া-র “বেণুগোপালের লাঠি”: কী হইতে কী হইয়া গেল, ‘গল্প’ (?) ফুরাইল, অর্থ বুঝিলাম না| ধুত!
১২. বচন ফকির-এর “বিদূষকের প্রবেশ”: জমেও জমল না, কারণ শেষটা আরোপিত হয়েই সব ছড়িয়ে গেল|


মোদ্দা কথা, অনেক গল্প পড়েছি| কিছু-কিছু গল্প আলাদা করে রেখে দিয়েছি ফিরে-ফিরে পড়ার জন্যে| এখন এটাই দেখার যে “সৃষ্টি” গল্প-প্রতিযোগিতার পরবর্তী সংস্করণ থেকে আমরা কেমন গল্প পাই| ইতিমধ্যে মেলায় গিয়ে ৪৯৩ নম্বর স্টলে পৌঁছতে পারলে প্রথম বইটা, মানে “পাঁচটি নভেলা” (যার তিনটে লেখাতেই বইয়ের দাম উশুল হয়েও কিছু থাকবে) কিনতে ভুলবেন না: এটাই আমার বিনীত পরামর্শ| যদি দ্বিতীয়টাও কিনতে চান, তবে বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: যে গল্পগুলো আমি বোল্ড করে দিয়েছি, তার বাইরে কিছু পড়লে দায়িত্ব আপনার|

পাঠ শুভ হোক|

Saturday, 2 January 2016

টগবগ উৎসব সংখ্যা ১৪২২: পাঠ প্রতিক্রিয়া

গত পুজোর আগে-পরে বেশ কয়েকটা পূজাবার্ষিকী কিনলেও একটা বিশেষ পত্রিকা হাতে নিয়েই মনটা ছেলেমানুষি খুশিতে ভরে গেছিল: টগবগ উৎসব সংখ্যা ১৪২২| পত্রিকাটির মলাট খুব সহজ অথচ রঙিন| পাতাগুলো বেশ মোটা, আর বাঁধাই চমত্কার| সর্বোপরি পত্রিকাটির লেখা পরিবেশনের পদ্ধতি অনাড়ম্বর হলেও আক্ষরিক অর্থে চোখ-জুড়োনো| ঠিক করেই রেখেছিলাম যে হুড়মুড় করে না পড়ে পত্রিকাটা পড়ার জন্যে কদিন অপেক্ষা করব| ২০১৬-র প্রথম দুদিন পত্রিকাটি পড়ার সুযোগ করে দিল, আর আমিও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ফেললাম| তবে ফুরফুরে মনে পড়তে গিয়েও পত্রিকাটির এই বিশেষ সংখ্যা নিয়ে দুটো প্রশ্ন মাথায় ঘোরাঘুরি করেছিল:
(১) যথেষ্ট সম্ভ্রম-উত্পাদক ঐতিহ্য থাকলেও পত্রিকার এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন রূপে, একঝাঁক সাহসী ও স্বপ্নময় মানুষের উদ্যোগে| এই পত্রিকার ওপরে আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা রয়েছে বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত প্রায় সব মানুষের| তাঁদের, এবং প্রকাশকের প্রয়াস সফল করে আজকের ছোটোদের তেপান্তরের মাঠের ওপার থেকে কি ঘুরিয়ে আনতে পারবে টগবগ?
(২) এই পত্রিকার সম্পাদক এবং শিশুসাহিত্যের নীরব ও প্রচারবিমুখ সেবক শ্রী সরল দে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন মাত্র কয়েক দিন আগে| এই অবস্থায় তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত সম্ভবত শেষ পত্রিকাটির নির্মোহ মূল্যায়ণ করাটা কি এই মুহূর্তে উচিত হবে?

একবার মনে হয়েছিল যে খারাপ লাগা লেখাগুলো নিয়ে কিছু না লিখে শুধু ভালো লেখা নিয়ে ভালো কথা বলে ছেড়ে দিই| কিন্তু তারপর ভাবলাম যে নেভিল কার্ডাসের পদ্ধতি যেমন আজকের ক্রীড়া-সাংবাদিকতায় অচল, তেমনই ওই কৌশলী লেখা আমার মগজ থেকে বেরোবে না| অনেক ভেবে এই সিদ্ধান্তেই এলাম যে বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্য আবেগ বা ক্ষণিকের বিহ্বলতার চেয়ে অনেক বড়ো ব্যাপার, আর আমার ভালোবাসার সেই জায়গাটা নিয়ে সোজা কথা স্পষ্ট করে লিখে দেওয়াটাই মঙ্গল|

সম্পাদকীয় লেখা ছুটছে টগবগ এই পত্রিকার যাত্রাপথের একটা সরলীকৃত ও আশাবাদী ছবি তুলে ধরলেও সেটা পড়ে (টার্গেট অডিয়েন্স, অর্থাৎ ছোটোরা যদি আদৌ সেটা পড়ে) বেশ হতাশ হতে হয়| বাজারে আরও গাদা-গাদা পত্রিকা থাকতেও কেন এই বিশেষ পত্রিকায় নতুন করে প্রাণপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হল, ঠিক কোন-কোন ভাবনা নিয়ে এই পত্রিকা অন্যদের থেকে আলাদাভাবে শিশু-কিশোরদের মনে তুফান তুলতে চায়: এসব কিছুই পেলাম না লেখাটায়|

সম্পাদকীয় পেরিয়ে মূল পত্রিকায় ঢুকেই আমি ধাক্কা খেতে শুরু করলাম| কেন?
Ø প্রথম লেখাটিই গৌরী ধর্মপাল-এর লেখা পুরোনতুন রামায়ণ, এবং সেটি পড়ে আমি প্রায় স্তম্ভিত হলাম এই ভেবে যে এমন একটি কিম্ভূতকিমাকার জিনিস যদি গৌরী ধর্মপালের মতো (একদা) অনাবিল রূপকথা-রচনাকার দৈবক্রমে লিখেও থাকেন, তবে এটিকে পত্রিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হল কি শুধু লেখকের নাম ও পত্রিকার সঙ্গে তাঁর পুরনো সম্পর্কের বশে?
Ø এরপরের, এবং অত্যন্ত দুর্বল লেখাটি হল পবিত্র সরকার-এর ব্যোমকেশবাবু ভি আই পি| তার পরের লেখা, মানে উদয় নারায়ণ সিংহ-র বেল পাকলে পড়তে গিয়ে আমার মনে হল লেখক নিশ্চই কোনভাবে একটা টাইম-ওয়ার্প-এ ঢুকে পড়েছেন, ফলে তাঁর মনে হচ্ছে যে তিনি এখনও সেই সব খোকাখুকুর জন্যে লিখছেন যারা সত্তর, কি বড়োজোর আশির দশকের বাসিন্দা| এই সমস্যা প্রকটতর হয়েছে গৌর বৈরাগী-র তৈলাক্ত বাঁশ আর বাঁদরের গল্প, অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী-র জলদেবতার নৌকো, আর অমর মিত্র-র নাটক নিমকি বুঁদে লেডিকেনি-তে, যে জিনিস আজকের কোন স্কুলে-কলেজে-পাড়ায় অভিনয়ের প্রসঙ্গ উঠলে ঘুড়ায় হাসব|

এবার আমি সেই সিরিয়াসলি মন খারাপ করে দেওয়া লেখাগুলোর প্রসঙ্গে আসছি যেগুলো পড়লে সময় নষ্ট তো হবেই, রাগে ও বিরক্তিতে দাঁতে ব্যথা, মাসল-ক্র্যাম্প, এমনকি রাত-বিরেতে প্রকাশকের উদ্দেশ্যে ঝাঁঝালো মেইল দেওয়ার বাসনা জাগতে পারে| তেমন বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ-সম্বলিত লেখাগুলো হল:
১. মুহম্মদ জাফর ইকবাল-এর টি-রেক্সের সন্ধানে: আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখকের এই লেখাটা পড়ে অবধি আমি এটাই ভেবে চলেছি যে কোন যুক্তিতে এই উপন্যাস (বিশেষত এর প্রথমার্ধ) শিশু-কিশোর সাহিত্য বলে বিবেচিত হল| দ্বিতীয়ার্ধ ভালো, কিন্তু সেটিও এত দুর্বল যে তার তুলনায় অনেক ভালো লেখা অনামা পত্রিকায় ছাপা হয়ে নজরের আড়ালে চলে যায়| এটা কি বাংলাদেশের বাজার ধরার কোন কৌশল?
২. মিমি রাধাকৃষ্ণণ-এর প্রশান্ত কুমারের প্রতিশ্রুতি: একে তো একটা ব্যবহৃত হতে-হতে শুয়োরের মাংস হয়ে যাওয়া আধ পাতার প্লটকে ফাঁপিয়ে ৪০+পাতার উপন্যাস বানানো হয়েছে, তাতে লেখক যে ঠিক কোন পত্রিকার জন্যে লিখছেন (মানে নবকল্লোল, সানন্দা, বর্তমান, নাকি টগবগ) সেটা তিনি নিজেও জানতেন বলে মনে হয়নি| এই থার্ড ক্লাসের অধম লেখার লেখকের নাম যদি এরপর কোন সংখ্যায় সূচিপত্রে দেখি তাহলে পত্রিকার দপ্তরের বাইরে ক্যাম্পেন করতে হবে|
৩. দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য-র মেঘরৌদ্রের খেলা: এটা কি পাঠকদের নিয়ে কোন বিশ্রী ঠাট্টা ছিল? ২০১৩-র পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলায় প্রকাশিত, সৌরভ মুখোপাধ্যায়-এর লেখা যে উপন্যাস মেঘ-ছেঁড়া রোদ পড়ে বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠেছিল আর চোখের কোনটাও গেছিল ভিজে, এই দানবাকৃতি উপন্যাসটি কি তার স্পুফ? এই অদ্ভূত ও একটিও সকর্মক উদ্দীপনা-জাগরণে অক্ষম বিরাট লেখাটাও শেষ করেননি লেখক, ছেড়ে দিয়েছেন আঁধ-খেঁচড়া করে|

আর না| আর এসব রদ্দি ও অচল মাল নিয়ে ভাবব না| বরং এবার লিখি ভালো লাগা ফিচার আর গল্প গুলোর কথা: -
১. শিশির বিশ্বাস-এর আলেকজান্ডারের শিবিরে এক আগন্তুক: ময়ূখ চৌধুরীর ভক্তরা এই গল্পটা চট করে বুঝে নেবেন, কিন্তু তবুও লেখাটা পড়তে ভালো লাগবে|
২. মল্লিকা ধর-এর সীমান্তপারের বন্ধু: কল্পবিজ্ঞান নয়, বিশুদ্ধ ফ্যান্টাসি, তবে পড়তে ভালো লাগে|
৩. দেবাশিস বন্দোপাধ্যায়-এর জঙ্গল. এর নাম জঙ্গল: প্রেডিক্টেবল, তবে পড়তে মন্দ লাগে না|
৪. অরিন্দম বসু-র বিশ্বরঞ্জনের ব্যথা: মন ভালো হয়ে যায় এমন গল্প পড়লে|
৫. প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর ভয়ের নাম গলগাথা: শুধু দ্রুতগতিসম্পন্ন নয়, এই বড়োগল্পে বেশ কিছু ভাবনার খোরাক আছে যা আজকের বুদ্ধিদীপ্ত পাঠকের মনে ধরবে|
৬. বিমান নাথ-এর প্রাচীন ভারতে শূন্য আবিষ্কার
৭. কালীপদ চক্রবর্তী-র সুমো কুস্তিগিরের গল্প
৮. অপূর্ব চট্টোপাধ্যায়-এর সত্যান্বেষণে মাছি
৯. প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত-র পুরীতে পুরাতত্ত্ব
১০. শ্যামল চক্রবর্তী-র আজব জ্যামিতির কারিগর
১১. শ্রী শাম্ব-র কমিকস দ্রিঘাংচু
১১. কবিতার পাতা, যাতে অনেক পড়ার মতো ছড়া-কবিতা থাকলেও একবার পড়ুন, বারবার পড়ুন প্রকল্প ভট্টাচার্য-র কবিতাটি| কেন? পড়েই দেখুন একবার|

এবার বলি সেই লেখাগুলোর কথা যেগুলো পড়ার পর আকাশটা আরও একটু নীল মনে হবে, রোদ্দুরটাকে ঝকঝকে ঠেকবে, আর বাতাসে পাওয়া যাবে সেই শুকনো ধুনোর গন্ধটা যেটার জন্যে আমরা সারা বছর মুখিয়ে থাকি| সেই লেখাগুলো হল:
(১) দোয়েল বন্দোপাধ্যায়-এর চিন্তাহরণ
(২) প্রসেনজিৎ বন্দোপাধ্যায়-এর ননিগোপালের জুতো

এদের নিয়ে, এত অল্পে কিছু লিখলে গল্পগুলোকে অপমান করা হবে| তাই আমি এই পত্রিকার সেরা, একেবারে আল্টিমেট বেস্ট গল্পটার কথা উল্লেখ করে ইতি টানব, আর সেই গল্পটা হল: সৈকত মুখোপাধ্যায়-এর টমটম চলছে| এই গল্পটা, বিশেষত এর শেষ লাইনটা নিয়ে যতবার ভাবছি ততবার চোখটা ঝাপসা হচ্ছে, আবার বুকটা ভরেও উঠছে টাটকা বাতাসে| আর হ্যাঁ, সূচিপত্রে এনার নাম থাকলে আমি পত্রিকাটা কিনবই (বোধহয় অন্যরাও) ও পড়বই, তাতে যদি এর আগে আলোচিত অখাদ্য-প্রস্তুতকারকদের লেখা পিন দিয়ে স্টেপল করতে হয়, তো ভি সহি|

তাহলে শেষ বিচারে কী দাঁড়াল? পারবে কি এই পত্রিকা আজকের ছোটোদের কাছে একটা নতুন জানালা খুলে দিতে? আমার উত্তর: হ্যাঁ, পারবে| সম্পাদক যদি আরও নির্মম হন, মুদ্রণের ক্ষেত্রে এই পারিপাট্য যদি অক্ষুণ্ন রাখা যায়, আর কল্পবিজ্ঞান ও ফ্যান্টাসিকে যদি আর একটু বেশি গুরুত্ব দেওয়া যায়, তবে এই পত্রিকা শিশু-কিশোরদের ভালো লাগবে: এমনটাই আমার বিশ্বাস|

Wednesday, 30 December 2015

মহাভারত ও সৌরভ মুখোপাধ্যায়

ঠাকুর্দার মুখে শুনেছিলাম যে দেশভাগ, এবং উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে আসার আগে, আমাদের পারিবারিক পেশা নাকি ছিল পৌরোহিত্য ও কথকতা| পরবর্তীকালে রুজির বন্দোবস্ত করার জন্যে পরিবারের সদস্যদের নানা পন্থা বেছে নিতে হলেও এটা আমি ছোটোবেলাতেও দেখেছিলাম, যে অবিভক্ত গাঙ্গুলি-পরিবারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এমনকি রসিকতার ছলেও পৌরাণিক প্রসঙ্গ এসে যায়| খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমার হাতে, কার্যত অক্ষর-পরিচয়ের পরেই, এসেছিল উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর ছেলেদের রামায়ণ আর ছেলেদের মহাভারত| প্রথমটি সেই শৈশবেই কিঞ্চিৎ সরলীকৃত (অতএব তুচ্ছ) ঠেকলেও শেষোক্ত মহাকাব্যটি আমাকে যুগপৎ কৌতূহলী ও বিস্ময়বিহবল করে তুলেছিল তার জটিলতায়, যার কাছে ঠাকুমার সঙ্গে সিনেমা (রাজা হরিশ্চন্দ্র, সীতার বনবাস, ইত্যাদি) দেখতে গিয়ে মোকাবিলা করা নানা ঘটনাক্রম নিতান্তই তুশ্চু বলে মনে হত| বয়স বাড়ার সঙ্গে প্রথমে পড়লাম অমর চিত্র কথা-য় খণ্ড-খণ্ড আকারে বিভিন্ন উপাখ্যান, আর তার কিছুদিন পরেই টেলিভিশনের পর্দায় জাঁকিয়ে বসল বি.আর.চোপড়া-র মহাভারত|

স্রেফ গল্প-পড়ার তাগিদে মহাভারতের নানা রকম সংক্ষিপ্ত ও সংক্ষিপ্ততর সংস্করণ এরপর কিনেছি ও পড়েছি, নিজের মতো করে বিভিন্ন চরিত্র ও তাঁদের পরিণতি নিয়ে ভেবেওছি| তবে, এবার ব্ল্যাকবোর্ড পত্রিকার উত্সব সংখ্যার থিম মহাভারত বলে তাতে লেখা পাঠানোর জন্যে, অনেক দিন পর, এই মহাকাব্যটির একটি বিশেষ অংশ নিয়ে পড়াশোনা করতে বাধ্য হই| আর তার পরেই মহাভারতের বৌদ্ধিক দিকটা নিয়ে পড়ার আগ্রহটা আমার মধ্যে ফিরে আসে, যেখানে গল্পের মাদকতার পেছনে ছোটা নেই, নেই চোখ-ধাঁধানো বর্ণনার বিলাসে ডুবে যাওয়া, কিন্তু আছে মানব জীবনের অন্তর্নিহিত অর্থের সন্ধানে স্থিতধী পথচলা|

বাজারে এমন বইয়ের অভাব নেই, যেগুলো মহাভারতের বিশ্লেষণ করে তাতে এমন অনেক লুকিয়ে থাকা মাত্রা ও তাত্পর্যের সন্ধান দিয়েছে, যা এই প্রায় দুই সহস্রাব্দী পার করা মহাকাব্যকেও সম্পূর্ণ নতুন আলোয় দেখতে সাহায্য করে| কিন্তু আমার অবস্থা তখন অঞ্জনের সেই গানের মতো:
আমার শুধু ছিল-আছে কাঠখোট্টা বাস্তবটা, দিবারাত্রি আপোষ আর আপোষ,
রবীন্দ্র কি গণসঙ্গীত কোনটাই ঠিক দিচ্ছিল না, বুকের ভেতর রেগে ওঠার রোষ|
তত্ত্বকথা নয়, আমার মতো পাঁড় গল্পপ্রেমী চাইছিল গল্পের মধ্য দিয়ে সত্যানুসন্ধান, আর সেটি যে কী ভীষণ কঠিন কাজ তা সবাই জানেন| এবার একে সমাপতন বলা উচিত না কপালক্রম তা জানি না, কিন্তু ঠিক তখনই ১৪২২-এর শারদীয়া দেশ-এ প্রকাশিত, আমার অত্যন্ত প্রিয় সাহিত্যিক সৌরভ মুখোপাধ্যায়-এর লেখা, একটি গল্প নিয়ে ফেসবুক তেতে উঠল|

ফেসবুক নামক চায়ের পেয়ালা এসে অবধি তর্কপ্রিয় বাঙালির তুফান তোলার মস্ত একটা জায়গা করে দিয়েছে ঠিকই, তবে এবারের আলোচনাটা ছিল প্রশংসাসূচক| শারদীয়া পড়ার ক্ষেত্রে আমি সচরাচর ভূতের ভবিষ্যৎ-এর রিকশাওয়ালার পদ্ধতি নিই, মানে শিশু-কিশোর সাহিত্যের হলে পড়তেই হবে, অন্য ক্ষেত্রে হামি গরিব আদমি আছে| কিন্তু এই লেখাটা নিয়ে ভালো-ভালো কথা না থেমে চলেছে-তো-চলেইছে, আর এও পড়তে পাচ্ছি যে লেখাটা মহাভারতের একটি বিশেষ মুহূর্ত নিয়ে| যখন এও জানলাম যে এই লেখাটি বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এযাবৎ মহাভারতের কোন-না-কোন বিশেষ সময় নিয়ে লেখকের এটি তৃতীয় লেখা, তখন আর পারা গেল না| আমি এমনিতে পি.ডি.এফ-এর মাধ্যমে বই পড়ার বিরোধী হলেও এবার একে-একে ডাউনলোড করতে বাধ্য হলাম শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকা ১৪২০, শারদীয়া দেশ ১৪২১, এবং শারদীয়া দেশ ১৪২২. এই তিনটি পূজাবার্ষিকীতে পড়া তিনটি মহাভারতীয় গল্প পড়ে আমার যে প্রতিক্রিয়া, তাই নিয়েই আজকের এই ভ্যাজর-ভ্যাজর|

(১) অবরোহিণী: ২০১৩-য় প্রকাশিত এই গল্প আয়োজিত হচ্ছে মহাভারতের শেষ মুহূর্তে, যখন মহাপ্রস্থানের পথে যুধিষ্ঠির একা রয়েছেন সুমেরুর পথে, আর পতন হয়েছে বাকিদের| কিন্তু এখানেই গল্প বাঁক নিয়েছে এক নতুন দিশায়, যার সন্ধান পেতে গেলে আপনাকে লেখাটা পড়তে হবে| তবে আমার পাঠ-প্রতিক্রিয়া এরকম:
Ø শংকরের লেখায় পড়েছিলাম যে শরদিন্দু তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার আগে সংস্কৃত শেখার| পৌরাণিক লেখার ক্ষেত্রেও যে সেই ঋষিবাক্য কঠোরভাবে পালনীয়, সেটি অক্ষরে-অক্ষরে বুঝলাম এই লেখা পড়তে গিয়ে| এমনিতেই সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের গদ্যভাষা নান্দনিকতার শিখর ছুঁয়েও সহজবোধ্য থাকে বলে আমি তাঁর লেখার ভক্ত| কিন্তু এই সংস্কৃত-ব্যঞ্জনায় মুখর অথচ শাণিত অসির মতো যুক্তিনির্ভর ভাষা পড়ে আমি স্রেফ স্তব্ধবাক হয়ে রইলাম| কিছুক্ষণ কথা বললাম না, ফোন ধরলাম না, স্রেফ পঠনের অভিজ্ঞতাটা ধরে রাখতে চাইলাম নিজের মনে|
Ø লেখাটি বড়ো বেশি একতরফা, এবং বিশালাকার সংলাপ-নির্ভর বলে আমার মনে হয়েছে| শিশিরকুমার দাসের অলৌকিক সংলাপ আমায় মুগ্ধ করেছিল এই জন্যে যে তাতে হেলেনের যুক্তিতে তীক্ষ্ণ ও ক্রোধে উত্তপ্ত প্রশ্ন বা আরোপ, এবং রাম-এর নমনীয়, স্নিগ্ধ, অথচ ভাগ্য-বিড়ম্বিত উত্তর, দুইই ছিল সংক্ষিপ্ত| এখানে সেটা না হওয়ায় রসভঙ্গ হয়েছে বলেই আমার ধারণা|
Ø সর্বোপরি, এক জনকে কুকর্মের চক্রী সাব্যস্ত না করে কথোপকথনটা চালালে তা বোধহয় এই মহাকাব্যের সঙ্গে আরও মানানসই হত| তবে গল্পের পরিণতি, কিছুটা অতিকথিত হলেও, একে এক অন্য স্তরে উত্তীর্ণ করেছে|

(২) উত্তরফাল্গুনি: ২০১৩-র কাহিনি মহাভারতের যে বিন্দুতে সংঘটিত হয়েছে, ২০১৪-র কাহিনি কিন্তু তার তুলনায় পিছিয়ে এসেছে সেই ক্ষণে, যখন দ্বারকা থেকে যাদব কুলনারীরা চলেছে হস্তিনাপুর, অর্জুনের প্রহরায়| এখানেও গল্প বেদব্যাসকে উল্লঙ্ঘন করে চলে গেছে এক অন্য পথে, আর এক্ষেত্রেও আমি পাঠককে লেখাটি পড়ে রসাস্বাদন করতে অনুরোধ করব| ভাষা নিয়ে আমার মুগ্ধতার পুনরাবৃত্তি করব না| তাছাড়া এই লেখাটি আমার কার্যত সর্বাঙ্গসুন্দর লেগেছে| চরিত্রবর্ণন, নির্মেদ ঘটনাক্রম, পরিমিত-অথচ-নির্মোহ সংলাপ, এবং পরনির্ধারিত সর্বব্যাপী অন্ধকারের মধ্যে স্বীয় ভাগ্যনির্মাণের তিমিরবিদারী প্রয়াস: একটি গল্পে লেখকের কাছ থেকে এর বেশি আর কী চাইতে পারি আমি?

(৩) শেষ সূর্যোদয়: ২০১৫-র এই কাহিনি পিছিয়ে এসেছে আরও, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের চতুর্দশ দিনের ভোরে| জ্ঞানী পাঠক চট করে বুঝে নেবেন ঠিক কোন দিনটির সূচনালগ্ন নিয়ে লেখক এবারে আমাদের উপহার দিয়েছেন শক্তি, সাহস, ভীরুতা, প্রেম, লজ্জা, গর্ব, আর অমরত্বের অভিলাষ-পূরণের জন্যে সর্বস্ব পণ করার এক আশ্চর্য উপাখ্যান| আমার প্রতিক্রিয়া? আকাশচুম্বী গিরিশৃঙ্গ থেকে পতনোন্মুখ আরোহী যেমন ভয়ংকর সুন্দরের ডাকে মরণকে উপেক্ষা করে, আমিও তেমন এই গল্পের আপাত-অবাস্তবতা আর নারী চরিত্রটির ম্লান (এবং পার্শ্ব) উপস্থিতি ভুলে এখনও বুঁদ হয়ে আছি তার ভাষা, আর মূল চরিত্রের ট্র্যাজেডির গভীরতায়| কাল সকালে যদি নেশা কাটে, নাহয় আরও কিছু লিখব| আপাতত শুধু এটুকুই লেখার: সৌরভ, আপনার লেখার সুরভি এমনি করেই মহাভারতের বিপুল ঐশ্বর্য আমাদের মতো দীন পাঠকের মাঝে বিলিয়ে দিক, বছরের-পর-বছর|

Wednesday, 3 June 2015

রুক্মিণী

খুব সম্ভবত “দক্ষিণের বারান্দা”-তেই পড়েছিলাম যে অবনীন্দ্রনাথ-এর গল্প লেখার সূত্রপাত হয়েছিল একদিন, ভাইবোনদের সঙ্গে দল বেঁধে জোড়াসাঁকোর বাড়ির বারান্দায়, স্বপ্নে দেখা গল্প লিখে| আমরাও স্বপ্নে কত গল্প দেখি| অবশ্য স্বপ্নে আমরা যা দেখি তার বেশির ভাগ গল্পই আমাদের নিজেদের নানা রকম ভয় আর দুশ্চিন্তার আরেকটু জটিল বা এলোমেলো সংস্করণ মাত্র, যাতে আমরা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাতেই অবতীর্ণ হই| আমি নিজে যেসব স্বপ্ন দেখি সেগুলো খুবই সাধারণ, এবং একান্তভাবেই ভীতিমূলক, যেগুলো, আমার ধারণা, প্রায় প্রত্যেকেই অজস্রবার নানা ভাবে দেখেছেন (রাস্তায় বেরিয়ে আবিষ্কার করছি: আমি বিবস্ত্র! ট্রেনে টিকিট চেকারের সামনে টিকিট খুঁজে পাচ্ছি না! প্লেনে চেপে বিদেশের এয়ারপোর্টে নামার আগে টের পাচ্ছি যে সঙ্গে পাসপোর্ট-ভিসা এসব কিচ্ছু নেই!)| কিন্তু কাল রাতে আমি একটা খুব ইন্টারেস্টিং স্বপ্ন দেখলাম| স্বপ্নে আমি ছিলাম না (নাকি ছিলাম? কী জানি| চিনতে পারলাম তো|), তবে একটা গোটা গল্প ছিল, একেবারে নাম-টাম সহ| সেই গল্পটা, অতি সামান্য সাজগোজের সঙ্গে পেশ করার জন্যেই এত ভ্যানতাড়া ভাঁজছিলাম|

গল্পটা একটা ছেলের আর একটা মেয়ের| তাদের আলাপ হল একটা ন্যাশনাল পার্কে, বিকেলের শেষ এলিফ্যান্ট রাইডে চড়তে গিয়ে| হাতির পিঠে গ্রুপে চড়তে হয়, আর এরা দুজনেই সেদিন পার্কে এসেছিল একা-একা| তাই, সব গ্রুপ-এর চড়া শেষ হয়ে যাবার পর একেবারে শেষ রাইডে গাইড আর মাহুতের সঙ্গে হাতির পিঠে সওয়ার হল ওরা দুজন| দুজনেই অসম্ভব মুখচোরা আর লাজুক, তাই প্রায় সিঁটিয়ে দু কোণায় যাওয়ার মত করেই বসার চেষ্টা করছিল তারা| কিন্তু হাতি কি আর ওসবের পরোয়া করে? সমুদ্রে ঢেউ তোলা জাহাজের মত করে হাতি এগিয়ে চলছিল ঘাসবন, কাদাজমি আর দূরে নীলচে পাহাড়ের পেছনে অস্তগামী সূর্যের আলোর মধ্য দিয়ে| আর তার পিঠে চাপানো বাক্সের মধ্যে বসে এর ওর গায়ে হেলে পড়তে পড়তে কখন যে ছেলেটা আর মেয়েটা একজন আর আরেকজনের সামনে সহজ হয়ে গেছে, তা তারা খেয়ালই করেনি| যাইহোক, রাইড শেষ হল| হাতি (আসলে হস্তিনী) এবং তার মাহুত ও গাইডকে বখশিস দেওয়া হল| মেয়েটা হাতির শক্ত কাঁটার মত লোমওলা মাথায় আস্তে-আস্তে হাত বুলিয়ে তাকে আদরও করল| কিন্তু পার্কের বাইরে এসেই তারা পড়ল মহা সমস্যায়|

একে তখন সন্ধে নামছে, তায় ঝমঝমিয়ে শুরু হয়েছে বৃষ্টি| শহরে ফেরার কোন গাড়ি না পেয়ে নিরুপায় হয়ে তারা দুজনে কাছাকাছি যেসব হোটেল-রেসর্ট আছে, তাতেই ঘরের সন্ধান করতে লাগল| ট্যুরিস্ট সিজনে অমন হুট করে কি আর ঘর পাওয়া যায়? শেষ অবধি একটা কমনামি রেসর্টের একটাই ঘরে ছেলেটি আর মেয়েটির ঠাঁই হল; অবশ্যই ভদ্রলোকের (ও ভদ্রমহিলার) চুক্তি মেনে ছেলেটি শোবে সোফায়, আর মেয়েটি খাটে| ইতিমধ্যে দুজনের আলাপ একটু-একটু করে জমে উঠেছে| ছেলেটা যেসব কথা কোনদিন কাউকে বলে উঠতে পারবে এমনটাই ভাবেনি, সেগুলো সে গড়গড়িয়ে মেয়েটিকে বলে ফেলেছে| মেয়েটি সেসব কথা শুনে কখনও রেগেছে, কখনও গলা খুলে হেসেছে| এসবের মধ্যে দিয়েই সারা হল ডিনার, বাইরের আলোগুলো একে-একে নিভে গেল, আর কাঁচের জানলা দিয়ে আসা বিদ্যুতের আলোয় ওরা দুজনেই দুজনের অন্ধকার অবয়বকে দূরে না রেখে শেষ অবধি একাকার হয়েই গেল|

রাত ফুরোলেও কিন্তু দুজনের মধ্যে রোমান্সটা ভোরের নরম কুয়াশার মত রয়েই গেল| লজ্জায়, ভয়ে, বা সম্পূর্ণ অন্য কোন অনুভূতির বশে ওরা কথোপকথন চালাতে পারছিল না, কথাগুলো শুরু হয়েই থেমে যাচ্ছিল, কিন্তু দুজনেরই মুখে এমন একটা অদ্ভূত আভা ছড়িয়ে ছিল যে কথাবার্তার আর দরকারই হচ্ছিল না| তারপর দুজনেই শহরে ফিরল| রাতের অত বড় একটা কান্ডের পরেও (আমার স্বপ্নে অন্তত ওটা একটা কান্ডই ছিল, সে আপনারা যাই ভাবুন নাহয়) ওদের আলাপ ফোন, আর কখনও-সখনো দেখার মধ্যেই আটকে রইল অনেক দিন ধরে| ইতিমধ্যে দুজনেই মর্মে-মর্মে বুঝে ফেলেছে যে তাদের সম্পর্কটাকে পরের ধাপে নিয়ে যাওয়া ছাড়া উপায় নেই| কিন্তু তার জন্যে যে মস্ত বড় গাঁটটা পেরোতে হবে, তার জন্যে তো ওপরমহলের অনুমতি চাই| মেয়েটা একটা মেস-এ থেকে একটা খুবই ছোট চাকরি করে| ছেলেটা নিজের বাড়িতে বাবা-মা’র সঙ্গে থেকে পড়াশোনার পাশাপাশি চাকরির পরীক্ষা দেয়| তাই লজ্জায় রাঙা হয়েও একদিন মেয়েটাই এল ছেলেটার বাড়ি “কথা” বলতে|

ছেলেটা মেয়েটাকে বাইরের ঘরে বসাল| তারপর সে ভেতরে গিয়ে অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক বাবা আর হোমমেকার মা-কে সবকিছু খুলে বলে যখন বসার ঘরে নিয়ে এল [বীরপুরুষের দ্বারা যে এই কথাগুলো আগে তার বাবা-মা’র কাছে উথ্বাপিত হয়নি, তা বলাই বাহুল্য], তখন কিন্তু মেয়েটি সেই ঘরে ছিল না| ছেলেটি খুব অবাক হয়ে ফোনে মেয়েটিকে ধরার চেষ্টা করে ব্যর্থ হল| তারপর যোগাযোগ করার অন্য চেষ্টাগুলোও একে-একে ব্যর্থ হল| ছেলেটি এক রকম হন্যে হয়ে মেয়েটির খোঁজ করার চেষ্টা করবে ভেবেও এগোতে পারছিল না, কারণ তার সব থেকে বেশি আকাংক্ষিত চাকরির পরীক্ষা তখন দরজায় কলিং বেল টিপছে| বিশাল লম্বা পরীক্ষা প্রক্রিয়া যদ্দিনে শেষ হল, তদ্দিনে ছেলেটি ফোন করে, আর সময় পেলেই মেয়েটি যে মেসে থাকত সেই মেসের অন্য বাসিন্দাদের প্রায় জেরা করে নিজের মত করে সন্ধান চালিয়েছিল| কিন্তু মেয়েটির কোন সন্ধান সে পায়নি| সে ছিল মোবাইল-পূর্ব যুগ (আহা, স্বপ্নকে আপ-টু-ডেট হতেই হবে তার কি কোন গ্যারান্টি আছে?), তাই অন্তত তাতে তোলা মেয়েটির কোন ফটোও ছিলনা ছেলেটির কাছে, যা দিয়ে অন্য কোনভাবে খোঁজখবর নেওয়া যায়| তারপর রেজাল্ট বেরোল, ছেলেটি চাকরি পেয়ে পাড়ি দিল অনেক দূরে| আর ক্যালেন্ডারের পাতাগুলো ফরফরিয়ে উল্টে গেল দিন-মাস-বছর ঘোরার ইঙ্গিত দিয়ে|

অনেক দিন কেটে গেছে| প্লেন আর এ.সি. কামরায় অভ্যস্ত ছেলেটি নেহাত দায়ে পড়ে (এই শহরে ট্র্যাফিক জ্যাম এতই কুখ্যাত যে লোকাল ট্রেনেই চলাফেরা করার পরামর্শ তাকে দিয়েছিল সবাই) সেদিন ট্রেনে করে অচেনা শহরে কোথায় যেন যাচ্ছিল| হঠাৎ উল্টোদিকে বসে থাকা এক মহিলার দিকে ছেলেটার নজর গেল| সম্পূর্ণ অপ্রত্যাশিত হলেও, এবং মনের কাঁচে বহু-বহু বছরের ধুলো পড়লেও, তার সেই হারিয়ে যাওয়া প্রেমিকাকে চিনতে পারল ছেলেটি| কিন্তু তারপরেই সে পড়ল কঠিন সমস্যায়| একদিকে তার বুকের ভেতর আগ্নেয়গিরি থেকে উৎক্ষিপ্ত লাভার মত উঠে আসতে চাইছে প্রশ্নের ঝাঁক, যাদের কাটছাঁট করলে এটাই দাঁড়ায়: “কেন? কেন? কেন?”, অন্যদিকে সে বুঝতে পারছে যে সময়, পরিবেশ, এমনকি তার নিজের পরিচয়, কোনটাই সেই উদগীরণের পক্ষে অনূকুল নয়| এমন সময় ভিড়ের ফাঁক দিয়ে একটি টিনএজার মুখ বাড়িয়ে মহিলাকে কিছু বলল, আর শেলফে রাখা একটা ব্যাগ নামাল| দাঁড়িয়ে থাকা লোকেদের চলন থেকে ছেলেটি বুঝতে পারল যে মহিলা এবার নামবেন| মহিলা উঠে দাঁড়াতেই একজন সেখানে বসার চেষ্টা করলেন, অন্যরা কেউ এগোলেন, কেউ পেছলেন, কিন্তু তার মধ্যেও ছেলেটি আর থাকতে না পেরে মেয়েটির নাম ধরে ডেকে উঠল|


মহিলাটি ভীষণ চমকে উঠে ছেলেটির দিকে তাকালেন| আর তারপর তাঁর মুখে সেই লজ্জা-বিস্ময়-ভয় মেশান হাসিটা ঝিকমিকিয়ে উঠল যেটা দেখে ছেলেটি সেই প্রথম দিন বিকেলেই তার মন দিয়ে দিয়েছিল| কিন্তু কথা বলার সময় ছিল না, কারণ ট্রেনের গতিবেগ তখন কমে আসছে, মানে স্টেশন সামনেই| মহিলা আর ছেলেটিকে বলে উঠতে পারলেন না, যে সেদিন ছেলেটির বসার ঘরে বসে তার বাবার ছবি দেখে তিনি নিজের এক মামাকে চিনতে পেরেছিলেন, আর তখনই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে তাদের সম্পর্কটা সামনে এলে প্রলয় আসবে দুটি পরিবারেই| তাই নিজের পুরনো জীবনকে পুরোপুরি বিসর্জন দিয়ে তিনি চলে এসেছিলেন অনেক-অনেক দূরে, এক নতুন জীবনের সন্ধানে| কিন্তু ছেলেটির মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি একটা কাজ করার সিদ্ধান্ত নিলেন| নিজের মেয়েকে ডেকে তিনি শুধু বললেন: “ইনি আমার খুব কাছের মানুষ| এঁকে প্রণাম করো|” টিনএজার মেয়েটি এই কথায় একটু হকচকিয়ে গেলেও মায়ের কথা মানল| ট্রেন স্টেশনে দাঁড়াল| হুড়মুড় করে নামা যাত্রীদের সঙ্গে মা-মেয়ে নেমে গেলেও ছেলেটি ভিড়ের মধ্যে তাদের খোঁজার চেষ্টা করছিল| মহিলা ট্রেনের জানলার কাছে এসে ছেলেটির চোখে চোখ রেখে বললেন, “আমার মেয়ের নাম রুক্মিণী| তুমি ভালো থেকো|” তারপর ট্রেন ছেড়ে দিল|

দুলতে থাকা ভিড়াক্কার কামরার মধ্যে হতবুদ্ধি হয়ে বসে থাকা ছেলেটি দুটো প্রশ্নের উত্তর খোঁজার চেষ্টা করছিল| প্রথমত, মেয়েটার মুখে কেমন যেন একটা চেনা আদল রয়েছে, যেটা তার মায়ের থেকে আলাদা; এমনটা কেন মনে হচ্ছে? দ্বিতীয়ত, রুক্মিণী নামটা ওদের মধ্যে, এমনকি এই প্রদেশেও, খুব একটা প্রচলিত নয়; তাহলে এমন নামকরণ কেন? এই ভাবনার ঘূর্ণিঝড়-এর মধ্যে কখন যে ছেলেটি তার গন্তব্যে পৌঁছল, তার তা মনেও নেই| কিন্তু বাথরুমে গিয়ে, চোখে-মুখে-গলায়-ঘাড়ে জলের ঝাপটা দিয়ে মুখ মুছতে গিয়ে বিদ্যুতচমকের মত একটা স্মৃতি তার মনের অন্ধকারে ঝলসে উঠল| যে হাতির পিঠে চড়ে ওরা সেদিন ন্যাশনাল পার্কে ঘুরেছিল, তার নাম ছিল রুক্মিণী| আর তখনই, আয়নার দিকে তাকিয়ে, হতাশার অন্ধকারে আরও একবার তলিয়ে যেতে-যেতে ছেলেটি বুঝতে পারল, কেন মেয়েটার মুখের কিছু অংশ তার এত চেনা লেগেছিল|