Monday, 8 February 2016

মেলা বই, এবং....

প্রত্যেক বছর বইমেলা থেকে ফিরে আসার পর আমার একটা প্রগাঢ় ঝিমিয়ে পড়া দশা শুরু হয়, যার কারণ দ্বিবিধ: (১) অফিসের (বিশেষত যে মার্কামারা পিস্-টির অধীনে চাকরি করি) দশচক্র আমায় গিলে খাওয়ার জন্যে এই সময় ওত পেতে থাকে, (২) শুধু এই একটা সময়েই কলকাতায় থাকতে না পারা, ফলে আরও ক’দিন জমিয়ে আড্ডা না মারতে পারা নিয়ে আপশোস হয়| কাল ছিল মেলার দশমী, কিন্তু আমি সকালে যখন ট্যাক্সি চেপে পাতলা কুয়াশামাখা বাইপাস ধরে এয়ারপোর্ট যাচ্ছিলাম তখন মিলনমেলা প্রাঙ্গন স্বাভাবিক ভাবেই শুনশান| তারপর প্লেন লেট করে গুয়াহাটি পৌঁছনো, অফিসে যাওয়া (গত সপ্তাহে দু’দিন অফিস করতে পারিনি, ফলে টেবিল উপচে ফাইল মাটিতে পড়ার অবস্থা হয়েছিল), ফাইলপত্তর সামলে কোয়ার্টারে ফেরা, এবং প্রিয় কাজটি করা, অর্থাৎ বুকশেলফে নতুন কেনা বইগুলো ভরা| পড়া শুরু করে দিয়েছি কাল রাত থেকেই, এবং নতুন কেনা একটা বই পড়ে নিজেকে প্রকৃষ্ট লম্বকর্ণ মনে হওয়ার অনুভূতি-লাভ হয়েও গেছে (“আগুন জ্বালো” টাইপের রিভিউ আসিতেছে অবিলম্বে)| কিন্তু তার আগে এটা বরং জানানো যাক যে আমি কী কী বই কিনলাম:


প্রকাশক
ক্রমাংক
বইয়ের নাম
লেখক/সম্পাদক
সৃষ্টিসুখ
১
নিভৃতে যতনে
রূপঙ্কর সরকার
২
নামান্তর
৩
ষ্টারডাস্ট
সরিৎ চ্যাটার্জি
৪
গল্পের খোঁজে
অদিতি ভট্টাচার্য
৫
কৃতি বাঙালি বিস্মৃত বাঙালি
সব্যসাচী সান্যাল
৬
পাঁচ কথা
জয়ঢাক সংকলন
বিভা
৭
রুদ্ধশ্বাস সপ্তক
প্রসেনজিৎ বন্দোপাধ্যায়
সহজ পাঠ
৮
দাম সিং
তাপস মৌলিক
কবিতা পাক্ষিক
৯
দশ এক্কে দশ
জয়দীপ চক্রবর্তী
১০
ভূতভূতুনির গল্প
(স) –ঐ-
সী
১১
অদৃশ্য লিপির ফাঁদে
অনন্যা দাশ
কথাসত্য
১২
রক্তকস্তুরি
সৈকত মুখোপাধ্যায়
উদয়ারুণ
১৩
তিনু তান্ত্রিকের পুঁথি
১৪
সাধুডাকাত
জয়ন্ত দে
১৫
দেবদেউলের প্রহরী
বাসুদেব মালাকার
১৬
গণপতি হাজরার সোনার মেডেল
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
নিউ স্ক্রিপ্ট
১৭
নারায়ণকোটের জহরত
অমিতানন্দ দাশ
১৮
মেয়েরা যখন গোয়েন্দা
(স) নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী
সংসদ
১৯
পাথরের চোখ
শিশির বিশ্বাস

২০
সন্দেশ ১০০ গল্প একশো
(স) প্রসাদরঞ্জন রায়
মেইনস্ট্রিম
২১
চতুষ্পাঠী
অরুণিমা রায়চৌধুরী
২২
গোয়েন্দা গনেশ হালদার: ১
রাধারমণ রায়
২৩
-ঐ: ২
২৪
-ঐ-: ৩
২৫
-ঐ-: ৪
২৬
-ঐ-: ৫
পত্র ভারতী
২৭
মরণবিভা
সৈকত মুখোপাধ্যায়
২৮
কবিতা গল্প অল্প অল্প
(স) সুরজিৎ ও বন্ধুরা
২৯
হ্যাঁচ-চ্ছো
উল্লাস মল্লিক
৩০
চন্দ্রভাগার চাঁদ
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
৩১
মৃত, না জীবিত
জয়ন্ত দে
৩২
একটা খুনি চাই
৩৩
সাবধান! সাসপেন্স!
ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়
৩৪
শ্রীমান বিচ্ছু
৩৫
ক রহস্য
অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী
৩৬
গোপন বাক্স খুলতে নেই
প্রচেত গুপ্ত
৩৭
সেরা গোয়েন্দা উপন্যাস
অদ্রীশ বর্ধন
৩৮
জলের তলায় আতঙ্ক
দীপান্বিতা রায়
৩৯
ছায়ামারীচের প্রেম
নীলাঞ্জন চট্টোপাধ্যায়
৪০
শতবর্ষের সেরা রহস্য উপন্যাস: ৩
(স) অনীশ দেব
৪১
কিছু মেঘ কিছু কুয়াশা
(প) অনীশ দেব
৪২
তুষারচিতার সন্ধানে
কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়
সুচেতনা
৪৩
পংখিলালের গুহা
দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য
আনন্দ
৪৪
ইচ্ছেপলাশ
৪৫
জীবন অথবা
সৌরভ মুখোপাধ্যায়
৪৬
তবু অনন্ত জাগে
ইন্দ্রনীল সান্যাল
৪৭
পঞ্চাশটি গল্প
কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়
৪৮
পঞ্চাশটি গল্প
ঋতা বসু
৪৯
প্রবন্ধ সংকলন: ২
সুকুমার সেন
৫০
এপিঠে মজা ওপিঠে ভয়
দীপান্বিতা রায়
৫১
এক কুড়ি এক হাসির গল্প
দীপংকর বিশ্বাস
শিশুকিশোর
৫২
এক বাক্স উপন্যাস-২
তিনটি উপন্যাসের সংগ্রহ

সি.ই.এস.সি থেকে প্রিভিলেজ কার্ড আদায় করা সত্ত্বেও মানিব্যাগ যা চোট খেয়েছে, তা সামলাতে বহুদিন লাগবে| তার মধ্যেও এটা মাথায় রয়েছে যে পায়ের ছাল উঠে যাওয়ার অবস্থা হওয়ায়, কোন-কোন স্টলে সেলিব্রিটির ভিড় থাকায়, এবং পাতি ক্লান্তির বশে বেশ কয়েকটা স্টলে যেতে পারিনি| অর্থাৎ, সেই স্টল থেকে যে বইগুলো কেনার কথা ছিল, সেগুলো পরের কলকাতা সফরে কলেজ স্ট্রিটে গিয়ে কিনতে হবে| এতটাই যখন লিখলাম তখন কী বাকি রয়ে গেল সেটার ফিরিস্তিও দিই:

প্রকাশক
ক্রমাংক
বইয়ের নাম
লেখক/সম্পাদক
দে’জ
১
অ্যাডভেঞ্চার উপন্যাস সমগ্র: ১
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
২
পাঁচ মিতিন
সুচিত্রা ভট্টাচার্য
৩
খুনিরা পাঁচজন
গৌতম রায়
৪
ছায়াপুতুলের খেলা
রবিশংকর বল
৫
কুসুমে রক্তের দাগ
পার্থ বন্দোপাধ্যায়
৬
সোনার পশুপতি
৭
রহস্যের পাঁচ কাহন
চিন্ময় চৌধুরী
৮
পাঁচটি উপন্যাস
স্বপ্নময় চক্রবর্তী
উজ্জ্বল
৯
স্যার সত্যপ্রকাশ অ্যাডভেঞ্চার সমগ্র: ১
স্বপন বন্দোপাধ্যায়
প্রতিভাস
১০
রহস্যের রানি আগাথা কৃষ্টি
প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত
দেব সাহিত্য কুটির
১১
শুকতারার ১০১ ভূতের গল্প: ৩য় খণ্ড
(সংকলন)
সপ্তর্ষি
১২
আয়না মানুষ
বিশ্বদীপ দে
তালপাতা
১৩
কল্কেকাশির গল্প-সংকলন
শিবরাম চক্রবর্তী
সাহিত্যম
১৪
খুনির রং
(স) অনীশ দেব
১৫
বেলা শেষের আলো
হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্ত
১৬
গা ছমছমে ভৌতিক-অলৌকিক গল্প
মিত্র ঘোষ
১৭
একডজন চার কিশোর
কৃষ্ণেন্দু মুখোপাধ্যায়
১৮
ক্যালাইডোস্কোপ
ইন্দ্রনীল সান্যাল
১৯
আজব কারখানা
নবনীতা দেবসেন
দীপ
২০
ছ’টি গ্রাফিক নভেল
নারায়ণ দেবনাথ
বিশ্বভারতী
২১
ভারত-সংস্কৃতি
বিশ্ববিদ্যাসংগ্রহ
২২
জ্যোতির্বিজ্ঞান
২৩
গণিতবিদ্যা


এ মাসে যেহেতু ট্যাক্স কাটার ব্যাপার আছে, তাই মাসান্তে দারিদ্র্যসীমার নিচে নেমে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা থেকেই যাচ্ছে| তবু, যদি আগামী মাসে একবার কলকাতা যেতে পারি, তাহলে “মা কসম”, উপরোক্ত বইগুলো কিনবই! ব্লগ-পাঠকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার|

Friday, 29 January 2016

'সৃষ্টি' এবং গল্পের রাত

বইমেলা শুরু হওয়ার পর দিন তিনেক পেরিয়েছে| মেলা-উপলক্ষে হওয়া আড্ডার এবং জন-সমাগমের ছবি ছড়িয়ে পড়ছে ফেসবুকে| আর “আনন্দ নিয়ে গেছে ওরা সকলে, দুঃখটা থাক নয় শুধুই আমার” স্টাইলে গুয়াহাটিতে পড়ে আছি আমি| এই মন-খারাপ ভাবটা কাটানোর জন্যে কাল রাতে আমার নিত্যপাঠের (ভূত, রহস্য, রোমাঞ্চ, কল্পবিজ্ঞান, ফ্যান্টাসি) বাইরের দুটো বই তুলে নিয়েছিলাম| দুটো বই-ই আমাদের আদরের প্রকাশনা ‘সৃষ্টিসুখ’ থেকে প্রকাশিত গল্প-সংকলন, গত বইমেলার সময়ে কেনা (যেকোন গ্রন্থকীটের মতো আমারও “পড়তে হবে” বলে কেনা বইয়ের সংখ্যা “পড়া হয়েছে”-র তুলনায় অনেক বেশি) হলেও নানা রকম ‘অমনিবাস’ আর ‘সমগ্র’-র ভিড়ে ঘাপটি মেরে ছিল বলে হাতে আসেনি| বইদুটো সুমুদ্রিত, ছিমছাম, এবং শ্রদ্ধেয়া বাণী বসুকে উদ্ধৃত করে বলতে গেলে, “বাইরে শুকনো, ভেতরে মধুর বয়ামের মতো ভারী”| বইদুটো পড়ে শেষ করতে রাত তিনটে বাজল| আর তাদের পড়ে কেমন লাগল, সেই নিয়ে লেখার জন্যেই এই পোস্ট|

প্রথম বইটি হল ‘পাঁচটি নভেলা’, যাতে আছে:
(১) সৈকত মুখোপাধ্যায়-এর “বেদনার রঙ”: এই লেখকের বিশেষত্ব এটাই যে তাঁর আপাত সুখপাঠ্য এবং দ্রুতগামী অশ্বের মতো শিহরণ-জাগানিয়া গদ্য প্রায়শই আমাদের এমন অন্ধকারে নিয়ে যায় যেখানে “আছে দুঃখ, আছে মৃত্যু” ভাবটা প্রগাঢ় হয়ে ওঠে আর পাঠকের অজান্তেই তাঁর জগৎ বিষিয়ে যায় কালচে নীল রঙে| এই গল্পটি খানিকটা তেমন, তবে খানিকটা উত্তরণ-অভিমুখীও বটে| বেশ-বেশ ভালো গল্প|
(২) দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য-র “শেষ বিচার”: কল্পবিজ্ঞানের মোড়কে এই অসামান্য বড়ো গল্পটি এই বইয়ের সেরা লেখা, এবং সাম্প্রতিককালে আমার পড়া অন্যতম সেরা কাহিনিও বটে| তবে খুব-খুব আশায় আছি যে লেখক তাঁর এই কল্পকাহিনিগুলোকে একত্রিত করে গ্রন্থবদ্ধ করবেন অদূর ভবিষ্যতে|
(৩) মহুয়া মল্লিক-এর “শূন্য গর্ভ”: ঝুল|
(৪) দেবাশিস বন্দোপাধ্যায়-এর “নিভৃতে যতনে”: বোরিং|
(৫) অভীক দত্ত-র “শুরুয়াৎ”: সলিড লেখা| ওয়েবজিনে আর এখানে-ওখানে এনার যত লেখা পড়েছি, তার মধ্যে খুব উঁচু দিকে থাকবে এই গল্পটা| একটাই আক্ষেপ, এমন টানটান আর প্রায় শ্বাসরোধী গদ্য লেখার ক্ষমতা নিয়েও ইনি পলিটিক্যাল থ্রিলার (“নষ্ট সময়ের উপাখ্যান” স্মর্তব্য) আরও বেশি করে লেখেন না কেন|

দ্বিতীয় বইটি হল “সৃষ্টি গল্প প্রতিযোগিতা, সেপ্টেম্বর ২০১৩”- উপলক্ষে শীর্ষ স্থানাধিকারী এবং উল্লেখযোগ্য গল্পের সংকলন| অনেক গল্প যেখানে জমা হয় সেখানে কিছু হিট কিছু মিস থাকবেই, এই বইয়ের গল্পরাও তার ব্যতিক্রম নয়| তবে যেটা দেখে (ও পড়ে) বেশ হতাশ হলাম সেটা হচ্ছে তথাকথিত ‘টপ টেন’-এর বেশির ভাগ গল্পই খুব দুর্বল, এবং চালাকির দ্বারা মহৎ কার্য করায় (অর্থাৎ পরীক্ষানিরীক্ষার নাম ‘গল্প’ জিনিসটাকে বিসর্জন দেওয়ায়) তত্পর| এতে যেসব গল্প আছে তারা হল:
প্রথম দশ: -
১) সংহিতা মুখোপাধ্যায়-এর “সুকন্যা বৃত্তান্ত”: আহামরি নয়, কিন্তু ভালো|
২) সৌরাংশু সিংহ-র “সত্যি”: গল্পের মধ্যে গল্পটা বেশ জমেছিল, কিন্তু শেষটা কেমন হুড়মুড় করে থেমে গেল|
৩) হৃষীকেশ বাগচী-র “আর্যরক্ত”: জালি|
৪) শাশ্বতী ভট্টাচার্য-র “ডিয়ার মিস্টার কভি”: পচা|
৫) সুপ্রিয় সাহা-র “অতনুর নামগন্ধ”: পরীক্ষামূলক গল্প| আমার ভালো লাগেনি|
৬) উল্কা-র “বি-দূষকম মূড়োকাবচনম”: আরেকটি পরীক্ষামূলক এবং মূলত আঁতেল-মনস্ক গল্প, যা আমার অত্যন্ত বাজে লেগেছে|
৭) এশরার লতিফ-এর “স্ফটিক বাড়ি”: ভালো| বেশ ভালো|
৮) জয়াশীষ ঘোষ-এর “বোধন”: বেশি লম্বা, তবে শেষে চমক আছে|
৯) অভ্র পাল-এর “চিড়”: রাবিশ|
১০) শংকর সেন-এর “ঘুষ”: বোরিং|
১১) মোজাফফর হোসেন-এর “গল্পগুলো পাথরের”: এই গল্পটা এজন্যেই উল্লেখযোগ্য যে এমন রদ্দি গল্পও লেখক প্রতিযোগিতায় পাঠিয়েছেন, আর সেটা অত্যাধুনিক বিচার-পদ্ধতিতে ওপরের দিকে এসেও গেছে|
১২) মাহফুজ পারভেজ-এর “মোহনা”: যাচ্ছেতাই!

বিশেষ উল্লেখ:
১. অদিতি ভট্টাচার্য্য-র “গল্পের খোঁজে”: ভালো|
২. অনিরুদ্ধ সেন-এর “একটি ভালোমানুষের গপ্পো”: আহা, এমন ইচ্ছাপূরণের আর মন-ভালো করা আরও গল্প যদি পড়তে পেতাম!
৩. অলোকপর্ণা-র “দশ ফুট বাই দশ ফুট”: পরীক্ষামূলক, তথা আঁতেলদের জন্যে লেখা|
৪. আষিক-এর “বিড়ালমনস্কতা”: আরও একটি আঁতেলপাঠ্য লেখা|
৫. ঋষি সৌরক-এর “শু”: এই জিনিসও এখন ‘গল্প’ বলে চিহ্নিত হচ্ছে তাহলে!
৬. কিশোর ঘোষাল-এর “স্তন্যডায়িনি”: ভয়াবহ, নির্মম, নৃশংস, এবং পড়ার পর থম-মারিয়ে দেওয়া এই জিনিস থেকে আমি এমনিতে আলোকবর্ষ দূরে থাকা পাবলিক, কিন্তু “ফর দ্য আঁতেলজ, অফ দ্য আঁতেলজ, বাই দ্য আঁতেলজ” লেখার ভিড়ে এমন একটা জিনিস পেয়ে পড়তে বাধ্য হয়েছিলাম| লেখককে, এবং তাঁর অন্যান্য লেখাকে, খুঁজে বের করতে হবে এখন|
৭. প্রতীক মিত্র-র “শিবপুরাণ”: ধুস!
৮. বিতান চক্রবর্তী-র “পরলেই রাজা”: পড়া যায়, তবে ওই অবধিই|
৯. মৌ দাশগুপ্তা-র “কোনও এক গাঁয়ের কথা”: সপ্রতিভ ও বুদ্ধিমান ড্রাইভারের চালানো একটি দ্রুতগামী গাড়ির সওয়ারি হয়ে খাদে পড়লে যেমন লাগে, গল্পটা শেষ করে তেমনই লাগল|
১০. মুরাদুল ইসলাম-এর “মার্চ করে চলে যাওয়া একদল কাঠবিড়ালি ও খয়েরি ঘাসফড়িং”: দুর্বোধ্য ও আঁতেলপাঠ্য|
১১. সর্বজয়া-র “বেণুগোপালের লাঠি”: কী হইতে কী হইয়া গেল, ‘গল্প’ (?) ফুরাইল, অর্থ বুঝিলাম না| ধুত!
১২. বচন ফকির-এর “বিদূষকের প্রবেশ”: জমেও জমল না, কারণ শেষটা আরোপিত হয়েই সব ছড়িয়ে গেল|


মোদ্দা কথা, অনেক গল্প পড়েছি| কিছু-কিছু গল্প আলাদা করে রেখে দিয়েছি ফিরে-ফিরে পড়ার জন্যে| এখন এটাই দেখার যে “সৃষ্টি” গল্প-প্রতিযোগিতার পরবর্তী সংস্করণ থেকে আমরা কেমন গল্প পাই| ইতিমধ্যে মেলায় গিয়ে ৪৯৩ নম্বর স্টলে পৌঁছতে পারলে প্রথম বইটা, মানে “পাঁচটি নভেলা” (যার তিনটে লেখাতেই বইয়ের দাম উশুল হয়েও কিছু থাকবে) কিনতে ভুলবেন না: এটাই আমার বিনীত পরামর্শ| যদি দ্বিতীয়টাও কিনতে চান, তবে বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ: যে গল্পগুলো আমি বোল্ড করে দিয়েছি, তার বাইরে কিছু পড়লে দায়িত্ব আপনার|

পাঠ শুভ হোক|

Saturday, 2 January 2016

টগবগ উৎসব সংখ্যা ১৪২২: পাঠ প্রতিক্রিয়া

গত পুজোর আগে-পরে বেশ কয়েকটা পূজাবার্ষিকী কিনলেও একটা বিশেষ পত্রিকা হাতে নিয়েই মনটা ছেলেমানুষি খুশিতে ভরে গেছিল: “টগবগ উৎসব সংখ্যা ১৪২২”| পত্রিকাটির মলাট খুব সহজ অথচ রঙিন| পাতাগুলো বেশ মোটা, আর বাঁধাই চমত্কার| সর্বোপরি পত্রিকাটির লেখা পরিবেশনের পদ্ধতি অনাড়ম্বর হলেও আক্ষরিক অর্থে চোখ-জুড়োনো| ঠিক করেই রেখেছিলাম যে হুড়মুড় করে না পড়ে পত্রিকাটা পড়ার জন্যে ক’দিন অপেক্ষা করব| ২০১৬-র প্রথম দু’দিন পত্রিকাটি পড়ার সুযোগ করে দিল, আর আমিও সুযোগের সদ্ব্যবহার করে ফেললাম| তবে ফুরফুরে মনে পড়তে গিয়েও পত্রিকাটির এই বিশেষ সংখ্যা নিয়ে দুটো প্রশ্ন মাথায় ঘোরাঘুরি করেছিল:
(১) যথেষ্ট সম্ভ্রম-উত্পাদক ঐতিহ্য থাকলেও পত্রিকার এই সংখ্যাটি প্রকাশিত হচ্ছে সম্পূর্ণ নতুন রূপে, একঝাঁক সাহসী ও স্বপ্নময় মানুষের উদ্যোগে| এই পত্রিকার ওপরে আশীর্বাদ ও শুভেচ্ছা রয়েছে বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্যের সঙ্গে যুক্ত প্রায় সব মানুষের| তাঁদের, এবং প্রকাশকের প্রয়াস সফল করে আজকের ছোটোদের তেপান্তরের মাঠের ওপার থেকে কি ঘুরিয়ে আনতে পারবে ‘টগবগ’?
(২) এই পত্রিকার সম্পাদক এবং শিশুসাহিত্যের নীরব ও প্রচারবিমুখ সেবক শ্রী সরল দে আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন মাত্র কয়েক দিন আগে| এই অবস্থায় তাঁর সম্পাদনায় প্রকাশিত সম্ভবত শেষ পত্রিকাটির নির্মোহ মূল্যায়ণ করাটা কি এই মুহূর্তে উচিত হবে?

একবার মনে হয়েছিল যে খারাপ লাগা লেখাগুলো নিয়ে কিছু না লিখে শুধু ভালো লেখা নিয়ে ভালো কথা বলে ছেড়ে দিই| কিন্তু তারপর ভাবলাম যে নেভিল কার্ডাসের পদ্ধতি যেমন আজকের ক্রীড়া-সাংবাদিকতায় অচল, তেমনই ওই কৌশলী লেখা আমার মগজ থেকে বেরোবে না| অনেক ভেবে এই সিদ্ধান্তেই এলাম যে বাংলা শিশু-কিশোর সাহিত্য আবেগ বা ক্ষণিকের বিহ্বলতার চেয়ে অনেক বড়ো ব্যাপার, আর আমার ভালোবাসার সেই জায়গাটা নিয়ে সোজা কথা স্পষ্ট করে লিখে দেওয়াটাই মঙ্গল|

সম্পাদকীয় লেখা ‘ছুটছে টগবগ’ এই পত্রিকার যাত্রাপথের একটা সরলীকৃত ও আশাবাদী ছবি তুলে ধরলেও সেটা পড়ে (টার্গেট অডিয়েন্স, অর্থাৎ ছোটোরা যদি আদৌ সেটা পড়ে) বেশ হতাশ হতে হয়| বাজারে আরও গাদা-গাদা পত্রিকা থাকতেও কেন এই বিশেষ পত্রিকায় নতুন করে প্রাণপ্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হল, ঠিক কোন-কোন ভাবনা নিয়ে এই পত্রিকা অন্যদের থেকে আলাদাভাবে শিশু-কিশোরদের মনে তুফান তুলতে চায়: এসব কিছুই পেলাম না লেখাটায়|

সম্পাদকীয় পেরিয়ে মূল পত্রিকায় ঢুকেই আমি ধাক্কা খেতে শুরু করলাম| কেন?
Ø প্রথম লেখাটিই গৌরী ধর্মপাল-এর লেখা “পুরোনতুন রামায়ণ”, এবং সেটি পড়ে আমি প্রায় স্তম্ভিত হলাম এই ভেবে যে এমন একটি কিম্ভূতকিমাকার জিনিস যদি গৌরী ধর্মপালের মতো (একদা) অনাবিল রূপকথা-রচনাকার দৈবক্রমে লিখেও থাকেন, তবে এটিকে পত্রিকায় অন্তর্ভূক্ত করা হল কি শুধু লেখকের নাম ও পত্রিকার সঙ্গে তাঁর পুরনো সম্পর্কের বশে?
Ø এরপরের, এবং অত্যন্ত দুর্বল লেখাটি হল পবিত্র সরকার-এর “ব্যোমকেশবাবু ভি আই পি”| তার পরের লেখা, মানে উদয় নারায়ণ সিংহ-র “বেল পাকলে” পড়তে গিয়ে আমার মনে হল লেখক নিশ্চই কোনভাবে একটা টাইম-ওয়ার্প-এ ঢুকে পড়েছেন, ফলে তাঁর মনে হচ্ছে যে তিনি এখনও সেই সব খোকাখুকুর জন্যে লিখছেন যারা সত্তর, কি বড়োজোর আশির দশকের বাসিন্দা| এই সমস্যা প্রকটতর হয়েছে গৌর বৈরাগী-র “তৈলাক্ত বাঁশ আর বাঁদরের গল্প”, অনিরুদ্ধ চক্রবর্তী-র “জলদেবতার নৌকো”, আর অমর মিত্র-র নাটক “নিমকি বুঁদে লেডিকেনি”-তে, যে জিনিস আজকের কোন স্কুলে-কলেজে-পাড়ায় অভিনয়ের প্রসঙ্গ উঠলে “ঘুড়ায় হাসব”|

এবার আমি সেই সিরিয়াসলি মন খারাপ করে দেওয়া লেখাগুলোর প্রসঙ্গে আসছি যেগুলো পড়লে সময় নষ্ট তো হবেই, রাগে ও বিরক্তিতে দাঁতে ব্যথা, মাসল-ক্র্যাম্প, এমনকি রাত-বিরেতে প্রকাশকের উদ্দেশ্যে ঝাঁঝালো মেইল দেওয়ার বাসনা জাগতে পারে| তেমন “বিধিবদ্ধ সতর্কীকরণ”-সম্বলিত লেখাগুলো হল:
১. মুহম্মদ জাফর ইকবাল-এর “টি-রেক্সের সন্ধানে”: আমার অত্যন্ত প্রিয় লেখকের এই লেখাটা পড়ে অবধি আমি এটাই ভেবে চলেছি যে কোন যুক্তিতে এই উপন্যাস (বিশেষত এর প্রথমার্ধ) শিশু-কিশোর সাহিত্য বলে বিবেচিত হল| দ্বিতীয়ার্ধ ভালো, কিন্তু সেটিও এত দুর্বল যে তার তুলনায় অনেক ভালো লেখা অনামা পত্রিকায় ছাপা হয়ে নজরের আড়ালে চলে যায়| এটা কি বাংলাদেশের বাজার ধরার কোন কৌশল?
২. মিমি রাধাকৃষ্ণণ-এর “প্রশান্ত কুমারের প্রতিশ্রুতি”: একে তো একটা ব্যবহৃত হতে-হতে শুয়োরের মাংস হয়ে যাওয়া আধ পাতার প্লটকে ফাঁপিয়ে ৪০+পাতার উপন্যাস বানানো হয়েছে, তাতে লেখক যে ঠিক কোন পত্রিকার জন্যে লিখছেন (মানে নবকল্লোল, সানন্দা, বর্তমান, নাকি টগবগ) সেটা তিনি নিজেও জানতেন বলে মনে হয়নি| এই থার্ড ক্লাসের অধম লেখার লেখকের নাম যদি এরপর কোন সংখ্যায় সূচিপত্রে দেখি তাহলে পত্রিকার দপ্তরের বাইরে ক্যাম্পেন করতে হবে|
৩. দেবজ্যোতি ভট্টাচার্য-র “মেঘরৌদ্রের খেলা”: এটা কি পাঠকদের নিয়ে কোন বিশ্রী ঠাট্টা ছিল? ২০১৩-র পূজাবার্ষিকী আনন্দমেলায় প্রকাশিত, সৌরভ মুখোপাধ্যায়-এর লেখা যে উপন্যাস “মেঘ-ছেঁড়া রোদ” পড়ে বুকের ভেতরটা হু-হু করে উঠেছিল আর চোখের কোনটাও গেছিল ভিজে, এই দানবাকৃতি উপন্যাসটি কি তার স্পুফ? এই অদ্ভূত ও একটিও সকর্মক উদ্দীপনা-জাগরণে অক্ষম বিরাট লেখাটাও শেষ করেননি লেখক, ছেড়ে দিয়েছেন আঁধ-খেঁচড়া করে|

আর না| আর এসব রদ্দি ও অচল মাল নিয়ে ভাবব না| বরং এবার লিখি ভালো লাগা ফিচার আর গল্প গুলোর কথা: -
১. শিশির বিশ্বাস-এর “আলেকজান্ডারের শিবিরে এক আগন্তুক”: ময়ূখ চৌধুরীর ভক্তরা এই গল্পটা চট করে বুঝে নেবেন, কিন্তু তবুও লেখাটা পড়তে ভালো লাগবে|
২. মল্লিকা ধর-এর “সীমান্তপারের বন্ধু”: কল্পবিজ্ঞান নয়, বিশুদ্ধ ফ্যান্টাসি, তবে পড়তে ভালো লাগে|
৩. দেবাশিস বন্দোপাধ্যায়-এর “জঙ্গল. এর নাম জঙ্গল”: প্রেডিক্টেবল, তবে পড়তে মন্দ লাগে না|
৪. অরিন্দম বসু-র “বিশ্বরঞ্জনের ব্যথা”: মন ভালো হয়ে যায় এমন গল্প পড়লে|
৫. প্রবীরেন্দ্র চট্টোপাধ্যায়-এর “ভয়ের নাম গলগাথা”: শুধু দ্রুতগতিসম্পন্ন নয়, এই বড়োগল্পে বেশ কিছু ভাবনার খোরাক আছে যা আজকের বুদ্ধিদীপ্ত পাঠকের মনে ধরবে|
৬. বিমান নাথ-এর “প্রাচীন ভারতে শূন্য আবিষ্কার”
৭. কালীপদ চক্রবর্তী-র “সুমো কুস্তিগিরের গল্প”
৮. অপূর্ব চট্টোপাধ্যায়-এর “সত্যান্বেষণে মাছি”
৯. প্রসেনজিৎ দাশগুপ্ত-র “পুরীতে পুরাতত্ত্ব”
১০. শ্যামল চক্রবর্তী-র “ ‘আজব’ জ্যামিতির কারিগর”
১১. শ্রী শাম্ব-র কমিকস “দ্রিঘাংচু”
১১. কবিতার পাতা, যাতে অনেক পড়ার মতো ছড়া-কবিতা থাকলেও একবার পড়ুন, বারবার পড়ুন প্রকল্প ভট্টাচার্য-র কবিতাটি| কেন? পড়েই দেখুন একবার|

এবার বলি সেই লেখাগুলোর কথা যেগুলো পড়ার পর আকাশটা আরও একটু নীল মনে হবে, রোদ্দুরটাকে ঝকঝকে ঠেকবে, আর বাতাসে পাওয়া যাবে সেই শুকনো ধুনোর গন্ধটা যেটার জন্যে আমরা সারা বছর মুখিয়ে থাকি| সেই লেখাগুলো হল:
(১) দোয়েল বন্দোপাধ্যায়-এর “চিন্তাহরণ”
(২) প্রসেনজিৎ বন্দোপাধ্যায়-এর “ননিগোপালের জুতো”

এদের নিয়ে, এত অল্পে কিছু লিখলে গল্পগুলোকে অপমান করা হবে| তাই আমি এই পত্রিকার সেরা, একেবারে আল্টিমেট বেস্ট গল্পটার কথা উল্লেখ করে ইতি টানব, আর সেই গল্পটা হল: সৈকত মুখোপাধ্যায়-এর “টমটম চলছে”| এই গল্পটা, বিশেষত এর শেষ লাইনটা নিয়ে যতবার ভাবছি ততবার চোখটা ঝাপসা হচ্ছে, আবার বুকটা ভরেও উঠছে টাটকা বাতাসে| আর হ্যাঁ, সূচিপত্রে এনার নাম থাকলে আমি পত্রিকাটা কিনবই (বোধহয় অন্যরাও) ও পড়বই, তাতে যদি এর আগে আলোচিত অখাদ্য-প্রস্তুতকারকদের লেখা পিন দিয়ে স্টেপল করতে হয়, তো ভি সহি|

তাহলে শেষ বিচারে কী দাঁড়াল? পারবে কি এই পত্রিকা আজকের ছোটোদের কাছে একটা নতুন জানালা খুলে দিতে? আমার উত্তর: হ্যাঁ, পারবে| সম্পাদক যদি আরও নির্মম হন, মুদ্রণের ক্ষেত্রে এই পারিপাট্য যদি অক্ষুণ্ন রাখা যায়, আর কল্পবিজ্ঞান ও ফ্যান্টাসিকে যদি আর একটু বেশি গুরুত্ব দেওয়া যায়, তবে এই পত্রিকা শিশু-কিশোরদের ভালো লাগবে: এমনটাই আমার বিশ্বাস|

Wednesday, 30 December 2015

মহাভারত ও সৌরভ মুখোপাধ্যায়

ঠাকুর্দার মুখে শুনেছিলাম যে দেশভাগ, এবং উদ্বাস্তু হয়ে এদেশে আসার আগে, আমাদের পারিবারিক পেশা নাকি ছিল পৌরোহিত্য ও কথকতা| পরবর্তীকালে রুজির বন্দোবস্ত করার জন্যে পরিবারের সদস্যদের নানা পন্থা বেছে নিতে হলেও এটা আমি ছোটোবেলাতেও দেখেছিলাম, যে অবিভক্ত গাঙ্গুলি-পরিবারের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এমনকি রসিকতার ছলেও পৌরাণিক প্রসঙ্গ এসে যায়| খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমার হাতে, কার্যত অক্ষর-পরিচয়ের পরেই, এসেছিল উপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরীর “ছেলেদের রামায়ণ” আর “ছেলেদের মহাভারত”| প্রথমটি সেই শৈশবেই কিঞ্চিৎ সরলীকৃত (অতএব তুচ্ছ) ঠেকলেও শেষোক্ত মহাকাব্যটি আমাকে যুগপৎ কৌতূহলী ও বিস্ময়বিহবল করে তুলেছিল তার জটিলতায়, যার কাছে ঠাকুমার সঙ্গে সিনেমা (রাজা হরিশ্চন্দ্র, সীতার বনবাস, ইত্যাদি) দেখতে গিয়ে মোকাবিলা করা নানা ঘটনাক্রম নিতান্তই তুশ্চু বলে মনে হত| বয়স বাড়ার সঙ্গে প্রথমে পড়লাম ‘অমর চিত্র কথা’-য় খণ্ড-খণ্ড আকারে বিভিন্ন উপাখ্যান, আর তার কিছুদিন পরেই টেলিভিশনের পর্দায় জাঁকিয়ে বসল বি.আর.চোপড়া-র মহাভারত|

স্রেফ গল্প-পড়ার তাগিদে মহাভারতের নানা রকম সংক্ষিপ্ত ও সংক্ষিপ্ততর সংস্করণ এরপর কিনেছি ও পড়েছি, নিজের মতো করে বিভিন্ন চরিত্র ও তাঁদের পরিণতি নিয়ে ভেবেওছি| তবে, এবার ‘ব্ল্যাকবোর্ড’ পত্রিকার উত্সব সংখ্যার থিম ‘মহাভারত’ বলে তাতে লেখা পাঠানোর জন্যে, অনেক দিন পর, এই মহাকাব্যটির একটি বিশেষ অংশ নিয়ে পড়াশোনা করতে বাধ্য হই| আর তার পরেই মহাভারতের বৌদ্ধিক দিকটা নিয়ে পড়ার আগ্রহটা আমার মধ্যে ফিরে আসে, যেখানে গল্পের মাদকতার পেছনে ছোটা নেই, নেই চোখ-ধাঁধানো বর্ণনার বিলাসে ডুবে যাওয়া, কিন্তু আছে মানব জীবনের অন্তর্নিহিত অর্থের সন্ধানে স্থিতধী পথচলা|

বাজারে এমন বইয়ের অভাব নেই, যেগুলো মহাভারতের বিশ্লেষণ করে তাতে এমন অনেক লুকিয়ে থাকা মাত্রা ও তাত্পর্যের সন্ধান দিয়েছে, যা এই প্রায় দুই সহস্রাব্দী পার করা মহাকাব্যকেও সম্পূর্ণ নতুন আলোয় দেখতে সাহায্য করে| কিন্তু আমার অবস্থা তখন অঞ্জনের সেই গানের মতো:
“আমার শুধু ছিল-আছে কাঠখোট্টা বাস্তবটা, দিবারাত্রি আপোষ আর আপোষ,
রবীন্দ্র কি গণসঙ্গীত কোনটাই ঠিক দিচ্ছিল না, বুকের ভেতর রেগে ওঠার রোষ|”
তত্ত্বকথা নয়, আমার মতো পাঁড় গল্পপ্রেমী চাইছিল গল্পের মধ্য দিয়ে সত্যানুসন্ধান, আর সেটি যে কী ভীষণ কঠিন কাজ তা সবাই জানেন| এবার একে সমাপতন বলা উচিত না কপালক্রম তা জানি না, কিন্তু ঠিক তখনই ১৪২২-এর শারদীয়া দেশ-এ প্রকাশিত, আমার অত্যন্ত প্রিয় সাহিত্যিক সৌরভ মুখোপাধ্যায়-এর লেখা, একটি গল্প নিয়ে ফেসবুক তেতে উঠল|

ফেসবুক নামক চায়ের পেয়ালা এসে অবধি তর্কপ্রিয় বাঙালির তুফান তোলার মস্ত একটা জায়গা করে দিয়েছে ঠিকই, তবে এবারের আলোচনাটা ছিল প্রশংসাসূচক| শারদীয়া পড়ার ক্ষেত্রে আমি সচরাচর ‘ভূতের ভবিষ্যৎ’-এর রিকশাওয়ালার পদ্ধতি নিই, মানে শিশু-কিশোর সাহিত্যের হলে পড়তেই হবে, অন্য ক্ষেত্রে “হামি গরিব আদমি আছে”| কিন্তু এই লেখাটা নিয়ে ভালো-ভালো কথা না থেমে চলেছে-তো-চলেইছে, আর এও পড়তে পাচ্ছি যে লেখাটা মহাভারতের একটি বিশেষ মুহূর্ত নিয়ে| যখন এও জানলাম যে এই লেখাটি বিচ্ছিন্ন নয়, বরং এযাবৎ মহাভারতের কোন-না-কোন বিশেষ সময় নিয়ে লেখকের এটি তৃতীয় লেখা, তখন আর পারা গেল না| আমি এমনিতে পি.ডি.এফ-এর মাধ্যমে বই পড়ার বিরোধী হলেও এবার একে-একে ডাউনলোড করতে বাধ্য হলাম শারদীয়া আনন্দবাজার পত্রিকা ১৪২০, শারদীয়া দেশ ১৪২১, এবং শারদীয়া দেশ ১৪২২. এই তিনটি পূজাবার্ষিকীতে পড়া তিনটি ‘মহাভারতীয়’ গল্প পড়ে আমার যে প্রতিক্রিয়া, তাই নিয়েই আজকের এই ভ্যাজর-ভ্যাজর|

(১) অবরোহিণী: ২০১৩-য় প্রকাশিত এই গল্প আয়োজিত হচ্ছে মহাভারতের শেষ মুহূর্তে, যখন মহাপ্রস্থানের পথে যুধিষ্ঠির একা রয়েছেন সুমেরুর পথে, আর পতন হয়েছে বাকিদের| কিন্তু এখানেই গল্প বাঁক নিয়েছে এক নতুন দিশায়, যার সন্ধান পেতে গেলে আপনাকে লেখাটা পড়তে হবে| তবে আমার পাঠ-প্রতিক্রিয়া এরকম:
Ø শংকরের লেখায় পড়েছিলাম যে শরদিন্দু তাঁকে পরামর্শ দিয়েছিলেন, ঐতিহাসিক উপন্যাস লেখার আগে সংস্কৃত শেখার| পৌরাণিক লেখার ক্ষেত্রেও যে সেই ঋষিবাক্য কঠোরভাবে পালনীয়, সেটি অক্ষরে-অক্ষরে বুঝলাম এই লেখা পড়তে গিয়ে| এমনিতেই সৌরভ মুখোপাধ্যায়ের গদ্যভাষা নান্দনিকতার শিখর ছুঁয়েও সহজবোধ্য থাকে বলে আমি তাঁর লেখার ভক্ত| কিন্তু এই সংস্কৃত-ব্যঞ্জনায় মুখর অথচ শাণিত অসির মতো যুক্তিনির্ভর ভাষা পড়ে আমি স্রেফ স্তব্ধবাক হয়ে রইলাম| কিছুক্ষণ কথা বললাম না, ফোন ধরলাম না, স্রেফ পঠনের অভিজ্ঞতাটা ধরে রাখতে চাইলাম নিজের মনে|
Ø লেখাটি বড়ো বেশি একতরফা, এবং বিশালাকার সংলাপ-নির্ভর বলে আমার মনে হয়েছে| শিশিরকুমার দাসের “অলৌকিক সংলাপ” আমায় মুগ্ধ করেছিল এই জন্যে যে তাতে হেলেনের যুক্তিতে তীক্ষ্ণ ও ক্রোধে উত্তপ্ত প্রশ্ন বা আরোপ, এবং রাম-এর নমনীয়, স্নিগ্ধ, অথচ ভাগ্য-বিড়ম্বিত উত্তর, দুইই ছিল সংক্ষিপ্ত| এখানে সেটা না হওয়ায় রসভঙ্গ হয়েছে বলেই আমার ধারণা|
Ø সর্বোপরি, এক জনকে কুকর্মের চক্রী সাব্যস্ত না করে কথোপকথনটা চালালে তা বোধহয় এই মহাকাব্যের সঙ্গে আরও মানানসই হত| তবে গল্পের পরিণতি, কিছুটা অতিকথিত হলেও, একে এক অন্য স্তরে উত্তীর্ণ করেছে|

(২) উত্তরফাল্গুনি: ২০১৩-র কাহিনি মহাভারতের যে বিন্দুতে সংঘটিত হয়েছে, ২০১৪-র কাহিনি কিন্তু তার তুলনায় পিছিয়ে এসেছে সেই ক্ষণে, যখন দ্বারকা থেকে যাদব কুলনারীরা চলেছে হস্তিনাপুর, অর্জুনের প্রহরায়| এখানেও গল্প বেদব্যাসকে উল্লঙ্ঘন করে চলে গেছে এক অন্য পথে, আর এক্ষেত্রেও আমি পাঠককে লেখাটি পড়ে রসাস্বাদন করতে অনুরোধ করব| ভাষা নিয়ে আমার মুগ্ধতার পুনরাবৃত্তি করব না| তাছাড়া এই লেখাটি আমার কার্যত সর্বাঙ্গসুন্দর লেগেছে| চরিত্রবর্ণন, নির্মেদ ঘটনাক্রম, পরিমিত-অথচ-নির্মোহ সংলাপ, এবং পরনির্ধারিত সর্বব্যাপী অন্ধকারের মধ্যে স্বীয় ভাগ্যনির্মাণের তিমিরবিদারী প্রয়াস: একটি গল্পে লেখকের কাছ থেকে এর বেশি আর কী চাইতে পারি আমি?

(৩) শেষ সূর্যোদয়: ২০১৫-র এই কাহিনি পিছিয়ে এসেছে আরও, কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের চতুর্দশ দিনের ভোরে| জ্ঞানী পাঠক চট করে বুঝে নেবেন ঠিক কোন দিনটির সূচনালগ্ন নিয়ে লেখক এবারে আমাদের উপহার দিয়েছেন শক্তি, সাহস, ভীরুতা, প্রেম, লজ্জা, গর্ব, আর অমরত্বের অভিলাষ-পূরণের জন্যে সর্বস্ব পণ করার এক আশ্চর্য উপাখ্যান| আমার প্রতিক্রিয়া? আকাশচুম্বী গিরিশৃঙ্গ থেকে পতনোন্মুখ আরোহী যেমন ভয়ংকর সুন্দরের ডাকে মরণকে উপেক্ষা করে, আমিও তেমন এই গল্পের আপাত-অবাস্তবতা আর নারী চরিত্রটির ম্লান (এবং পার্শ্ব) উপস্থিতি ভুলে এখনও বুঁদ হয়ে আছি তার ভাষা, আর মূল চরিত্রের ট্র্যাজেডির গভীরতায়| কাল সকালে যদি নেশা কাটে, নাহয় আরও কিছু লিখব| আপাতত শুধু এটুকুই লেখার: সৌরভ, আপনার লেখার সুরভি এমনি করেই মহাভারতের বিপুল ঐশ্বর্য আমাদের মতো দীন পাঠকের মাঝে বিলিয়ে দিক, বছরের-পর-বছর|