Saturday, 25 April 2015
"এইসব দিনরাত্রি" (সৌজন্যে: হুমায়ুন আহমেদ)
Monday, 9 March 2015
একটি জ্বরাক্রান্ত দিন এবং দোয়েল বন্দোপাধ্যায়
Sunday, 8 February 2015
বইমেলা ২০১৫: ফিরে দেখা
আজ বেলা পৌনে দুটো নাগাদ যখন বইমেলা থেকে বেরোচ্ছি, তখন সবক'টা গেট দিয়ে জনস্রোত মেলায় ঢুকছে। মনে হল, "নবমী নিশি গো, পোহায়ো না আর" ব্যাপারটা বাঙালি এখন মেলার শেষ দিনেই সবচেয়ে বেশি করে টের পায়। এমনকি আমার মত একাচোরা পাবলিকের কাছেও এই শেষ দিনের টানটা অমোঘ বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু সেটা ঠিক কেন? একে তো বইমেলার তুলনায় কলেজ স্ট্রিটে সারা বছর বেশি ছাড় পাওয়া যায়। তার ওপর এক ঝলকের রাগি নজরে বইমেলাকে বই-এর বদলে খাবারের মেলা বলেই মনে হয়। সারদা আর রোজ ভ্যালি কি এম.পি.এস-এর তরফে টাকা তোলার উদ্যোগ স্বাভাবিক ভাবেই এবার ছিল না, যেটা ভালো। কিন্তু সেই "ক্ষতি" পূরণ করার জন্যে খাবারের স্টলগুলো, আর তার সামনে ভিড় জমান জনতাই কাফি ছিল। তাহলে কেন এই মেলা শেষ হয়ে যাওয়ার দুঃখটা একেবারে টনটনিয়ে উঠছে? ভেবে চিন্তে যে কারণগুলো মাথায় এল তারা হল: -
১) বইমেলা উপলক্ষে সারা বছর ফেসবুক আর অন্য নানা মাধ্যমে টুকটাক যোগাযোগ (সেও ভার্চুয়াল) হওয়া নামগুলো বাস্তব মানুষ হয়ে সামনে আসে। দশচক্রে ভূতায়িত আমরা তখন টের পাই, আড্ডার শেকড়টা কত গভীরে বিস্তৃত, অথচ সেই আড্ডাটা জমাট বাঁধার আগেই ভেঙে যায়, কারণ কেউ যাবে নর্থে, কেউ সাউথে, কেউ রাজ্যের বাইরে, কেউবা দেশের বাইরে।
২) ধর্ষণ, শিশুহত্যা, মৌলবাদ, রাজনীতি, সানি লিওন, ভিরাট কোহলি, আর জ্যান্ত দুর্গার শ্রীবচনের বাইরেও যে একটা বিশাল ভুবন আছে, তার আভাস আমরা পাই এই ক'টা দিন বই (সঙ্গে প্রেমিকা কি বন্ধুবান্ধব থাকলে তো কেস জমে ক্ষীর) নিয়ে মেতে উঠে।
৩) অচল টাকার অপ্রতিরোধ্য ঠেলায় ভালো টাকার সরে যাওয়ার মত করে, বাজার আর মামাটিমানুস-এর ধাক্কায় বই-এর জগতেও রসসিক্ত অথচ বুদ্ধিদীপ্ত (বিশেষত একটু অন্য ধারার, একটু ক্রিটিক্যাল) লেখাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বইমেলায় এলে "সৃষ্টিসুখ", "গুরুচণ্ডা৯", আর অন্যান্য স্বাধীনচেতা প্রকাশনা সংস্থাগুলোর স্টলে গেলে মনে হয় যে মননশীল বাংলা লেখার প্রত্যাবর্তন নিয়ে এখনো আশাবাদী হওয়া যায়।
আমি এবারো, যথারীতি, কাছা খুলে এবং ব্যাগ ফাটিয়ে বই কিনেছি। সবথেকে বেশি কিনেছি সৃষ্টিসুখ, সংসদ, মেইনস্ট্রিম, কোরক, গুরুচণ্ডা৯, আর নানা ছোটখাটো সংস্থা থেকে। কিছু সংস্থা যথারীতি ঝুলিয়েছে, মানে বই প্রকাশ করে উঠতে পারেনি। এছাড়া কিছু সংস্থার বই পাওয়াই যায়নি, অর্থাৎ কলেজ স্ট্রিটে সেগুলো যোগাড় করতে হবে পরে। আর নামজাদা ও পায়াভারী সংস্থাগুলোর বই আমি কলেজ স্ট্রিটের দোকান থেকেই কিনি, তাই তাদের কথা আলাদা। কিন্তু এবারের মেলাটা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও অনেকদিন এর রেশ আমার মনে থেকে যাবে। সমুদ্রের স্বাদ পাওয়া মানুষ যেমন প্যাচপেচে ঘেমো অফিসে বসে ঢেউয়ের গর্জন শুনতে পায়, আমিও আমার অর্ধোন্মাদ সাইকোটিক বসের কথা শুনতে-শুনতে বইমেলার এই ভিড় আর হাসিঠাট্টার কথা ভাবব, আর অপেক্ষা করব সামনের বছরের জন্যে।
Sunday, 28 December 2014
রাজভাষা, রাজধানী আর ঢেঁকি ও ধান
প্রায় মাসখানেক ধরে গুয়াহাটি তথা অফিসের ঘানি পিষতে পিষতে যখন নিজেকে বেশ একটা গার্হস্থ্য আর বাণপ্রস্থের মাঝামাঝি স্তরের আশ্রমিক ভাবতে শুরু করেছি, তখনই সমন (শমনও বলা চলে) এসে পৌঁছল ক'দিন আগে। রাজভাষা (একে নিছক হিন্দি বললে চলবে না। হিন্দি বলা হয় বলিউডি মশলাদার সিনেমায়। সরকারি কাজে যে দুর্বোধ্য এবং কার্যত অর্থহীন ভাষাটি ব্যবহার করতে কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তর এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্য করা হয়, এ হল সেই ভাষা।) বিষয়ক সংসদীয় সমিতি আগামীকাল ২৯শে ডিসেম্বর আরও পাঁচটি সংস্থার সঙ্গে আমাদের অফিসেও কাজকর্মে রাজভাষার ব্যবহার নিয়ে নিরীক্ষণ (হুঁ হুঁ বাবা, গোদা ভাষায় ইন্সপেকশন বললে কি আর এমন একটা শিরদাঁড়া-দিয়ে-হিমেল-স্পর্শ গোছের অনুভূতি হত?) করবেন। তবে সাংসদদের দয়ার শরীর, তার ওপর অসম এই মুহূর্তে বেড়াবার পক্ষে মোটেই সুবিধের নয়। তাই এই নিরীক্ষণ হবে রাজধানী-তে। অতঃপর বাঙালের রাজধানী আগমন, সকাল থেকে কুয়াশা আর শীত উপেক্ষা করে বধ্যভূমি (মানে কাল যেখানে যেতে হবে) খুঁজে বের করা এবং মিটিং করা। এই সব করতেই বেলা দু'টো বাজলো। লাঞ্চ সেরে মনে হল যে হোটেলে পড়ে থেকে কচু হবে। তারপর, দস্যু মোহনের ভাষ্য ঝেড়ে বললে: "কী হইতে কী হইয়া গেল!", দেখলাম যে আমি বেঙ্গল এসোসিয়েশন দ্বারা আয়োজিত চতুর্দশ বইমেলার সামনে পৌঁছে গেছি। আর তারপর যা হবার তাই হল। দু হাতে মোট সাতটা প্যাকেট আর মুখে লাজুক হাসি (আজ্ঞে হ্যাঁ, জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে, সর্বত্র বই কিনলে আমার একটু লজ্জা করে, বাড়িতে গিয়ে শ্রীমতীর সামনে পড়ার সম্ভাবনা থাকলে ভয়ও করে) নিয়ে যখন গাড়িতে বসলাম, তখন আমার সঙ্গে থাকা প্রবীণ অ্যাসিস্টেন্ট ডাইরেক্টর আব্দুল হাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আগের বার বুকশেলফ গুলো ওনার পরিচিত দোকান থেকেই নিয়েছিলাম তো......।
তবে, যদিও এই মেলায় আমার এই প্রথম আসা, মেলাটার বেশ কয়েকটা বিশেষত্ব আমার নজরে পড়ল। ভুল হবার সম্ভাবনা খুব বেশি, তবু আমার মনে হল: -
১) কলকাতার মেলা যদিও তৃণমূলের একটা শিবিরে পরিণত হয়েছে গত কয়েক বছর ধরে, এই মেলার চরিত্রটা কিন্তু এখনও বামপন্থী রয়েছে। এই বামপন্থা সি.পি.এম বা ফরোয়ার্ড ব্লকের শেষ দিককার ধান্দাবাজি আর লুম্পেন-ভিত্তিক রাজনীতি নয়, বরং মুক্তচিন্তা আর সংস্কৃতি-নির্ভর সেইসব চিন্তার কম্পন বহন করছে, একসময় আমরা যার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম।
২) এই মেলায় বিভিন্ন স্টলের দায়িত্ব যাঁদের কাছে ছিল, তাঁরা পেশাদার বিক্রেতা নন। তাই স্টলের তুলনায় অনেক সময়েই তাঁদের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছিল পাশের মঞ্চে চলতে থাকা ক্যুইজ, যাতে বাঙালির একেবারে প্রাণের বিষয় নিয়ে চলছিল প্রশ্নোত্তর। তবে আমার সেটা ভালই লাগছিল, কারণ আমি নিজেও সোৎসাহে কান পেতেছিলাম ওই দিক তাক করেই। মাঝে যখন "এই পথ যদি না শেষ হয়" গানটা কোন সিনেমার, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে বেশ কয়েকটি দল ব্যর্থ হল, তখন "নামিয়ে দিন" বলে আমিও চেঁচিয়েছিলাম।
যাইহোক, বইমেলার উদ্দেশ্যে তো আর "আবার এসো মা" বলা যায়না। তাই বইগুলো ব্যাগে ভরি (প্লেনে এই অতিরিক্ত ওজনটা কীভাবে চেক-ইন্ করানো যায়, সেটাও ভাববার বিষয়), আর আজকের দুপুর-গড়িয়ে-সন্ধে কাটান সময়টা মনে রেখে দিই।