Saturday, 25 April 2015

"এইসব দিনরাত্রি" (সৌজন্যে: হুমায়ুন আহমেদ)

অনেক দিন পর আজ ব্লগ লিখতে বসলাম| এর মধ্যে চারপাশে এত কিছু হয়ে গেছে, যে সেই সব চিত্তচাঞ্চল্যকর ঘটনাবলির মধ্যেও শুধু সাম্প্রতিকতম-গুলোর এক ঝলক তুলে ধরার লোভ সামলানো গেল না: -
Ø পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য নির্বাচন কমিশনের মাস্টারমশাই-ত্ব প্রাপ্তি (ফলে সেখানকার বড়-মেজ-সেজ কর্তারা কলকাতা পৌরসভা নির্বাচনের দিন কিছুই দেখলেন না);
Ø অগ্নিকন্যা কর্তৃক বাংলার একাধিক শহর বা তার উপকন্ঠে নির্মীয়মান টাউনশিপের নামকরণ, এবং তার পরিপ্রেক্ষিতে ফেসবুকে প্রচুর মনিমুক্তার সমাবেশ, যা সবই আমাদের মত অসহায় বাঁদরদের গলায় বা পেজে ঝুলবে (আসল ক্ষমতা যাঁদের হাতে তাঁরা তো সারদা-মারফৎ সর্বস্বান্ত হয়েও চিত্রতারকাদের ভোট দিচ্ছি ভেবে চোর-ডাকাত-দেরই জিতিয়ে চলেছেন);
Ø মেটাফরিক নয়, আক্ষরিক ভূমিকম্প!
আর নয়, এই সব ব্যাপারস্যাপার নিয়ে পড়ে থাকলে লেখাটা এ.বি.পি.লাইভের ওয়েবসাইট-এর মত দেখাবে| তাই নিজের কথায় আসি|

এ বছরের ফেব্রুয়ারি মাসের ৯ তারিখ কলকাতা থেকে ফিরে অফিসে যোগ দেওয়ার পর পেশাগত ক্ষেত্রে আমি এমন একটা সাংঘাতিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছিলাম, যে প্রায় মাস-খানেক সোশ্যাল মিডিয়া থেকেই দূরে চলে গেছিলাম| কিন্তু একটা সময়ের পর লোকে প্রায় সব কিছুতেই অভ্যস্ত হয়ে যায়, আর আমার ক্ষেত্রে যে জিনিসটা নিজেকে রুটিনমাফিক জীবনে ফিরিয়ে এনেছিল সেটা হল আমার একাকিত্ব| এ এমন জিনিস, যে অফিসে ফাইল, ফোন, মেইল আর অফিস-পরবর্তী বই বা সিনেমার মধ্যে নিজেকে হারিয়ে ফেলার চেষ্টা করেও এর থেকে রেহাই পাওয়া যায় না| আর কাজ এমনই বালাই যে মার্চ মাস এসে যাওয়ার সঙ্গে-সঙ্গে আমার বর্ণান্তর হল! শূদ্র থেকে উত্তরণ হয়ে একেবারে ক্ষত্রিয় বনে গেলাম আমি প্ল্যান-প্রোজেক্ট আর ইয়ার-এন্ডিং-এর শেষ বাজারে| ফলে, সেই বিপর্যয় কালো মেঘের মত আমার আকাশের একটা বড় অংশকে আচ্ছন্ন করে রাখলেও, আমি যথাসম্ভব নিজের মত করে ভালো থাকার রুটিনে ফিরে গেছি| প্রচুর সিনেমা দেখেছি, প্রচুরতর বই পড়েছি, গান শুনেছি, আর ফেসবুক-এর মাধ্যমে নতুন করে খুঁজে পেয়েছি এমন বেশ কিছু মানুষকে যাঁদের প্রজ্ঞা, রসবোধ, জীবনশক্তি, প্রতিভা আর উপস্থিতি (ভার্চুয়াল হলেই বা) থেকে “চরৈবেতি” শব্দটার মানে ঠিকঠাক বোঝা যায়| কিন্তু নিজের কথা আর নয়, বরং একটা সত্যি ঘটনা লিখে আজকের মত পালাই|

কাল আমি যখন তেজপুরে পৌছেছিলাম, তখন বেশ রাত হয়েছে| তবু, ডিনার সেরে, বাকি সব গুছিয়ে, শুতে যাবার আগে মনে হল, একবার স্নান না করলে ঠিক শান্তি হচ্ছে না| যে হোটেলে উঠেছিলাম, সেখানকার বিশাল ব্যাপার| বাথরুমে ঘ্যামা একখানা টব, আর মাথার ওপর শাওয়ার, দিশি বালতি-ফালতির কোনো সিনই নেই! নেই যখন, তখন শাওয়ারই ভরসা| স্নান করার সঙ্গে সঙ্গে ঘুমে চোখ জড়িয়ে এল, আমি এ.সি-টা পছন্দসই তাপমানে ফিট করে কম্বলের তলায় ডাইভ দিলাম| বেশ কিছুক্ষণ পর, সেটা কতক্ষণ তা ঠিক করে বলতে পারব না, আমার ঘুম ভাঙলো জল পড়ার আওয়াজে| এটা ঠিক বেসিনে জল পড়ে যাওয়ার, বা কল থেকে ফোঁটা-ফোঁটা জল পড়ার আওয়াজ ছিল না| বরং আধো ঘুমের মধ্যে আওয়াজটা শুনে ঠিক এটাই মনে হয়েছিল যেন কেউ শাওয়ার চালিয়ে স্নান করছে, অর্থাৎ পুরোদমে জল পড়া, তারপর থামা, তারপর আবার পুরোদমে জল পড়া| ঘুম ভেঙে যাওয়ার পর বেশ কয়েকটা অনুভূতি এক সঙ্গে মাথায় এসে হল্লা করল| প্রথমেই বুঝলাম যে ঘরটা প্রচণ্ড ঠাণ্ডা হয়ে গেছে| তার সঙ্গে এটাও বুঝলাম যে আমার চোখের পাতাগুলো কেউ যেন আঠা দিয়ে সেঁটে দিয়েছে, ফলে মন ও কান সক্রিয় হলেও ওই ইন্দ্রিয়টি অচল| আরও বুঝলাম যে হোটেলে আর কোন ফ্লোরে তখনও হইচই চলছে, অর্থাৎ রাত খুব বেশি হয়নি| তারই মধ্যে আমি আবার শাওয়ার থেকে জল পড়ার আওয়াজ পেলাম| এর পর আর কম্বলের তলায় পড়ে থাকা যায়না, আমিও উঠলাম| অতি কষ্টে চোখ খুলে, বাথরুমের আলো জ্বালিয়ে, ভেতরে গিয়ে দেখলাম: জলে ভিজে আছে শাওয়ারের নিচের ফ্লোরটা, তবে বাথরুমে সেই মুহূর্তে আমি ছাড়া কেউ নেই| এই অবস্থায় কীই বা করা যায়? আমি মুখে-চোখে জলের ঝাপটা দিলাম, ঘরে এসে এ.সি-টা নিয়ে খুটখাট করলাম, এবং আবার শুয়ে পড়লাম| ঘুম ভাঙল ভোর ছ’টায়, আর তারপর শুরু হয়ে গেল আজকের দিনটা|


কী বুঝলেন? আমি তেজ্পুরের সিনিয়র সুপারিন্টেন্ডেন্টকে বলে রেখেছি পরের বার আমি তেজপুর এলেও যেন ওই ঘরটাই বুক করা হয়| আপনাদের জন্যেও কি তেমনটাই বলব?

Monday, 9 March 2015

একটি জ্বরাক্রান্ত দিন এবং দোয়েল বন্দোপাধ্যায়

গত সপ্তাহ-দুয়েক ধরে ভোগান গুজ্গুজে জ্বর (যাকে লোকে ‘সফি’ ভাষায় ভাইরাল ফিভার বলে)-টা আজ এমন চেহারা নিল যে সকালের রুটিনটা বরবাদ করে বিছানায় ধপাস হওয়া ছাড়া উপায় রইল না| এদিকে এমন পোড়ার চাকরি করি যে ছুটি-ফুটি পাওয়ার চান্স-ও নেই! অগত্যা সিদ্ধান্ত নিলাম যে ছোটবেলার ওষুধটা প্রয়োগ করব, অর্থাৎ কিছু ভালো বই, কি নিদেনপক্ষে গল্প পড়ে বাকি দিনটা কাটাবার মত শক্তি সঞ্চয় করে নেব| হাতের কাছে থাকা পুরনো আনন্দমেলার শেষ বান্ডিলটা নামালাম (যার কিছুদিন পরেই আনন্দমেলার সঙ্গে আমার “কাট্টি” হয়ে গেছিল), যাতে ২০১৩-য় প্রকাশিত সংখ্যাগুলো ছিল| এদিক-সেদিক দেখে বেশ কিছু ভালো লেখা আবার পড়লাম, তবে মন ভালো করে দেওয়া লেখাগুলোর মধ্যে দোয়েল বন্দোপাধ্যায়-এর (‘রঙবেরঙ’-এর ১৪২১ শারদ সংখ্যায় যাঁর লেখা “পাবলো ও পিথাগোরাস” পড়ে আমি স্রেফ ফিদা হয়ে গেছিলাম) যে লেখাগুলো মনে ছাপ রেখে গেল, সেগুলোর কথা আলাদাভাবে লিখতেই হচ্ছে: -

১. জলপাহাড়ের খোঁজে (৫ই জুলাই ২০১৩): আধুনিক রূপকথা লিখে, খুব বড় কথাগুলো ছোটদের খুব সহজে বলার কাজটা ইদানিং অনেক সাহিত্যিক করার চেষ্টা করছেন| এই গল্পটাও সেই ধারায়, এবং খুব ভালোভাবে লেখা হয়েছে|
২. গণেশ নিরুদ্দেশ (২০শে অক্টোবর ২০১৩): এর আগের গল্প-টায় লেখিকা যে দুই ভাইবোন (ভেলকি আর ফুলকি)-এর সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলেন, এই গল্পটাও তাদের নিয়েই, কিন্তু এটা নিখাদ মজার গল্প, যেটা দীপান্বিতা রায়ের “বাহনের বায়নাক্কা”-র কথা মনে করিয়ে দেয়|
৩. ইতিহাসে পাতিহাঁস (২০শে নভেম্বর ২০১৩): অ..সা..ধা..র..ণ একটি মজার গল্প, যা না পড়লে, হে পাঠক, আপনি জানিবেন না আপনি কী হারাইতেছেন|

এরপর যা হয় আর কী, আমি দোয়েল-এর আরও লেখা খুঁজে বের করতে সচেষ্ট হলাম| ওই ২০১৩-র আনন্দমেলা-তেই আমি ওনার লেখা গোটা দুই ভালো নন-ফিকশন পিস খুঁজে পেলাম, যেগুলো ছোটদের মনে আরও পড়ার, আরও জানার আগ্রহ তৈরি করার পক্ষে একেবারে আদর্শ| সেই লেখাগুলো হল: -
১) কারাগার থেকে পালানো (২০শে অগস্ট ২০১৩)
২) পুরাণ ও মহাকাব্যের অমর চরিত্ররা (৫ই ডিসেম্বর ২০১৩)

অতঃপর আরও অনুসন্ধান, এবং শেষে লেখিকার সৌজন্যে (এই বাজারে স্রেফ পড়তে চাইছি বললেই কি আর গল্প পড়তে পাওয়া যায়, তাও আবার “ফ্রি-ফ্রি-ফ্রি”??) পাওয়া আরও তিনটি লেখা পাঠ| এর মধ্যে নন-ফিকশন পিস একটিই: কড়ি দিয়ে চিনলাম, যা ভারতে মুদ্রার ইতিহাসের একটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, অথচ কৌতূহল-উদ্দীপক বিবরণ| অন্য দুটো বাংলা ‘ফেমিনা’ পত্রিকায় প্রকাশিত ফিকশন, যাদের নাম: -
১. মির্চ (জুন ২০১৪): সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়-এর “রসেবশে” ঘরানার উত্তরসূরী এই লেখাকে ছোটদের লেখা বলা যাবেনা, (তবে ছোটরা তো এখন অনেক বড় হয়ে গেছে!), কিন্তু এই গল্প যে অনুভূতির জন্ম দেয় তার কথা ভেবেই বোধহয় ‘হালকা হাসি, চোখের জল’ (আবার সঞ্জীব চট্টোপাধ্যায়-এর কাছেই হাত পাততে হল)-গোত্রটির উদ্ভব|
২. ঘরে ফেরার গান (জানুয়ারি ২০১৫): মধ্যবিত্ত ঊর্ধ্বগামী বাঙালির সংসারের এক কঠোর ও কটু বাস্তব দিকের সঙ্গে লেখিকা আমাদের আরও একবার পরিচয় করিয়ে দিলেন এই গল্পে| তবে আমার এই গল্পটা ভালো লাগেনি|

এছাড়াও দোয়েলের লেখা গল্প আছে “জয়ঢাক”-এ, “কাকলী”-তে, এবং সাম্প্রতিকতম “রঙবেরঙ”-এ| সেগুলো এখনো পড়া হয়নি বলে এখনো কিছু লিখতে পারলাম না| কিন্তু আমার অনুরোধ: দয়া করে লেখা চালিয়ে যান দোয়েল| আমাদের জীবনে হাসি আর মজার বড্ড অভাব| সেই অভাব মেটানোর জন্যে আমরা কিন্তু আপনার মত লেখকদের দিকেই তাকিয়ে আছি|

Sunday, 8 February 2015

বইমেলা ২০১৫: ফিরে দেখা

আজ বেলা পৌনে দুটো নাগাদ যখন বইমেলা থেকে বেরোচ্ছি, তখন সবক'টা গেট দিয়ে জনস্রোত মেলায় ঢুকছে। মনে হল, "নবমী নিশি গো, পোহায়ো না আর" ব্যাপারটা বাঙালি এখন মেলার শেষ দিনেই সবচেয়ে বেশি করে টের পায়। এমনকি আমার মত একাচোরা পাবলিকের কাছেও এই শেষ দিনের টানটা অমোঘ বলে মনে হচ্ছিল। কিন্তু সেটা ঠিক কেন? একে তো বইমেলার তুলনায় কলেজ স্ট্রিটে সারা বছর বেশি ছাড় পাওয়া যায়। তার ওপর এক ঝলকের রাগি নজরে বইমেলাকে বই-এর বদলে খাবারের মেলা বলেই মনে হয়। সারদা আর রোজ ভ্যালি কি এম.পি.এস-এর তরফে টাকা তোলার উদ্যোগ স্বাভাবিক ভাবেই এবার ছিল না, যেটা ভালো। কিন্তু সেই "ক্ষতি" পূরণ করার জন্যে খাবারের স্টলগুলো, আর তার সামনে ভিড় জমান জনতাই কাফি ছিল। তাহলে কেন এই মেলা শেষ হয়ে যাওয়ার দুঃখটা একেবারে টনটনিয়ে উঠছে? ভেবে চিন্তে যে কারণগুলো মাথায় এল তারা হল: -

১) বইমেলা উপলক্ষে সারা বছর ফেসবুক আর অন্য নানা মাধ্যমে টুকটাক যোগাযোগ (সেও ভার্চুয়াল) হওয়া নামগুলো বাস্তব মানুষ হয়ে সামনে আসে। দশচক্রে ভূতায়িত আমরা তখন টের পাই, আড্ডার শেকড়টা কত গভীরে বিস্তৃত, অথচ সেই আড্ডাটা জমাট বাঁধার আগেই ভেঙে যায়, কারণ কেউ যাবে নর্থে, কেউ সাউথে, কেউ রাজ্যের বাইরে, কেউবা দেশের বাইরে।
২) ধর্ষণ, শিশুহত্যা, মৌলবাদ, রাজনীতি, সানি লিওন, ভিরাট কোহলি, আর জ্যান্ত দুর্গার শ্রীবচনের বাইরেও যে একটা বিশাল ভুবন আছে, তার আভাস আমরা পাই এই ক'টা দিন বই (সঙ্গে প্রেমিকা কি বন্ধুবান্ধব থাকলে তো কেস জমে ক্ষীর) নিয়ে মেতে উঠে।
৩) অচল টাকার অপ্রতিরোধ্য ঠেলায় ভালো টাকার সরে যাওয়ার মত করে, বাজার আর মামাটিমানুস-এর ধাক্কায় বই-এর জগতেও রসসিক্ত অথচ বুদ্ধিদীপ্ত (বিশেষত একটু অন্য ধারার, একটু ক্রিটিক্যাল) লেখাগুলো হারিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু বইমেলায় এলে "সৃষ্টিসুখ", "গুরুচণ্ডা৯", আর অন্যান্য স্বাধীনচেতা প্রকাশনা সংস্থাগুলোর স্টলে গেলে মনে হয় যে মননশীল বাংলা লেখার প্রত্যাবর্তন নিয়ে এখনো আশাবাদী হওয়া যায়।

আমি এবারো, যথারীতি, কাছা খুলে এবং ব্যাগ ফাটিয়ে বই কিনেছি। সবথেকে বেশি কিনেছি সৃষ্টিসুখ, সংসদ, মেইনস্ট্রিম, কোরক, গুরুচণ্ডা৯, আর নানা ছোটখাটো সংস্থা থেকে। কিছু সংস্থা যথারীতি ঝুলিয়েছে, মানে বই প্রকাশ করে উঠতে পারেনি। এছাড়া কিছু সংস্থার বই পাওয়াই যায়নি, অর্থাৎ কলেজ স্ট্রিটে সেগুলো যোগাড় করতে হবে পরে। আর নামজাদা ও পায়াভারী সংস্থাগুলোর বই আমি কলেজ স্ট্রিটের দোকান থেকেই কিনি, তাই তাদের কথা আলাদা। কিন্তু এবারের মেলাটা শেষ হয়ে যাওয়ার পরেও অনেকদিন এর রেশ আমার মনে থেকে যাবে। সমুদ্রের স্বাদ পাওয়া মানুষ যেমন প্যাচপেচে ঘেমো অফিসে বসে ঢেউয়ের গর্জন শুনতে পায়, আমিও আমার অর্ধোন্মাদ সাইকোটিক বসের কথা শুনতে-শুনতে বইমেলার এই ভিড় আর হাসিঠাট্টার কথা ভাবব, আর অপেক্ষা করব সামনের বছরের জন্যে।

Sunday, 28 December 2014

রাজভাষা, রাজধানী আর ঢেঁকি ও ধান

প্রায় মাসখানেক ধরে গুয়াহাটি তথা অফিসের ঘানি পিষতে পিষতে যখন নিজেকে বেশ একটা গার্হস্থ্য আর বাণপ্রস্থের মাঝামাঝি স্তরের আশ্রমিক ভাবতে শুরু করেছি, তখনই সমন (শমনও বলা চলে) এসে পৌঁছল ক'দিন আগে। রাজভাষা (একে নিছক হিন্দি বললে চলবে না। হিন্দি বলা হয় বলিউডি মশলাদার সিনেমায়। সরকারি কাজে যে দুর্বোধ্য এবং কার্যত অর্থহীন ভাষাটি ব্যবহার করতে কেন্দ্রীয় সরকারের দপ্তর এবং প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাধ্য করা হয়, এ হল সেই ভাষা।) বিষয়ক সংসদীয় সমিতি আগামীকাল ২৯শে ডিসেম্বর আরও পাঁচটি সংস্থার সঙ্গে আমাদের অফিসেও কাজকর্মে রাজভাষার ব্যবহার নিয়ে নিরীক্ষণ (হুঁ হুঁ বাবা, গোদা ভাষায় ইন্সপেকশন বললে কি আর এমন একটা শিরদাঁড়া-দিয়ে-হিমেল-স্পর্শ গোছের অনুভূতি হত?) করবেন। তবে সাংসদদের দয়ার শরীর, তার ওপর অসম এই মুহূর্তে বেড়াবার পক্ষে মোটেই সুবিধের নয়। তাই এই নিরীক্ষণ হবে রাজধানী-তে। অতঃপর বাঙালের রাজধানী আগমন, সকাল থেকে কুয়াশা আর শীত উপেক্ষা করে বধ্যভূমি (মানে কাল যেখানে যেতে হবে) খুঁজে বের করা এবং মিটিং করা। এই সব করতেই বেলা দু'টো বাজলো। লাঞ্চ সেরে মনে হল যে হোটেলে পড়ে থেকে কচু হবে। তারপর, দস্যু মোহনের ভাষ্য ঝেড়ে বললে: "কী হইতে কী হইয়া গেল!", দেখলাম যে আমি বেঙ্গল এসোসিয়েশন দ্বারা আয়োজিত চতুর্দশ বইমেলার সামনে পৌঁছে গেছি। আর তারপর যা হবার তাই হল। দু হাতে মোট সাতটা প্যাকেট আর মুখে লাজুক হাসি (আজ্ঞে হ্যাঁ, জলে-স্থলে-অন্তরীক্ষে, সর্বত্র বই কিনলে আমার একটু লজ্জা করে, বাড়িতে গিয়ে শ্রীমতীর সামনে পড়ার সম্ভাবনা থাকলে ভয়ও করে) নিয়ে যখন গাড়িতে বসলাম, তখন আমার সঙ্গে থাকা প্রবীণ অ্যাসিস্টেন্ট ডাইরেক্টর আব্দুল হাই একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। আগের বার বুকশেলফ গুলো ওনার পরিচিত দোকান থেকেই নিয়েছিলাম তো......।

তবে, যদিও এই মেলায় আমার এই প্রথম আসা, মেলাটার বেশ কয়েকটা বিশেষত্ব আমার নজরে পড়ল। ভুল হবার সম্ভাবনা খুব বেশি, তবু আমার মনে হল: -
১) কলকাতার মেলা যদিও তৃণমূলের একটা শিবিরে পরিণত হয়েছে গত কয়েক বছর ধরে, এই মেলার চরিত্রটা কিন্তু এখনও বামপন্থী রয়েছে। এই বামপন্থা সি.পি.এম বা ফরোয়ার্ড ব্লকের শেষ দিককার ধান্দাবাজি আর লুম্পেন-ভিত্তিক রাজনীতি নয়, বরং মুক্তচিন্তা আর সংস্কৃতি-নির্ভর সেইসব চিন্তার কম্পন বহন করছে, একসময় আমরা যার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম।
২) এই মেলায় বিভিন্ন স্টলের দায়িত্ব যাঁদের কাছে ছিল, তাঁরা পেশাদার বিক্রেতা নন। তাই স্টলের তুলনায় অনেক সময়েই তাঁদের মনোযোগ কেড়ে নিচ্ছিল পাশের মঞ্চে চলতে থাকা ক্যুইজ, যাতে বাঙালির একেবারে প্রাণের বিষয় নিয়ে চলছিল প্রশ্নোত্তর। তবে আমার সেটা ভালই লাগছিল, কারণ আমি নিজেও সোৎসাহে কান পেতেছিলাম ওই দিক তাক করেই। মাঝে যখন "এই পথ যদি না শেষ হয়" গানটা কোন সিনেমার, এই প্রশ্নের উত্তর দিতে বেশ কয়েকটি দল ব্যর্থ হল, তখন "নামিয়ে দিন" বলে আমিও চেঁচিয়েছিলাম।

যাইহোক, বইমেলার উদ্দেশ্যে তো আর "আবার এসো মা" বলা যায়না। তাই বইগুলো ব্যাগে ভরি (প্লেনে এই অতিরিক্ত ওজনটা কীভাবে চেক-ইন্ করানো যায়, সেটাও ভাববার বিষয়), আর আজকের দুপুর-গড়িয়ে-সন্ধে কাটান সময়টা মনে রেখে দিই।

Wednesday, 3 December 2014

দাড়ি-গোঁফ এবং ডিসেম্বর রাতের স্বপ্ন

ছেলে/পুরুষ-এর যদি দাড়ি-গোঁফ না থাকে, তবে তার অবস্থা যে কি করুণ হয়, তা সকলেই জানেন| কোথাও একটা পড়েছিলাম যে ভীমসেন [জোশি নন, মধ্যম পাণ্ডব-এর কথা বলছি (অবশ্য তিনিও যথেষ্ট ‘জোশি’ ছিলেন বলেই জানা যায়)] মাকুন্দ ছিলেন| তারপরেও যে তিনি শুধু দুর্যোধন-দুঃশাসন-কীচক প্রমুখের ওপরেই নিজের বাহুবল দেখিয়েছিলেন, কোনো মাস-মার্ডারার হয়ে যাননি, এ থেকেই তাঁর সংযমের প্রভূত পরিচয় পাওয়া যায় [এও বোঝা যায় যে মহাপ্রস্থানের পথে তাঁর পতন তাঁর অতিভোজনের জন্যে নয়, অন্য কোনো কারণে হয়েছিলো| সি.বি.আই না এস.আই.টি? হমমমম...]| কিন্তু একবার গজালে, এবং গজাতে থাকলে, দুটি বস্তুই ‘কাফি তকলিফ’-দেয়| গোঁফ-কে অনেক যত্নে রাখতে হয়, যাতে তার একদিকের দৈর্ঘ্য/প্রস্থ অন্যদিকের থেকে আলাদা না হয়, যাতে তাতে ক্রমে দৃশ্যমান হওয়া সাদা/ধূসর কেশ (অন্য কী টার্ম ব্যবহার করা যায় তা বুঝে পেলাম না| মাননীয়া মুখ্যমন্ত্রী যা খুশি বলতে পারেন, কিন্তু আমরা...) খুব বাজে একটা এফেক্ট না আনে, ইত্যাদি-ইত্যাদি| আর দাড়ি মানে এক বিদিকিচ্ছিরি ব্যাপার| রোজ সকালে ফেনা-জল-সময়ের শ্রাদ্ধ করে ওটিকে নির্মূল না করলে গাল কুটকুট করবেই; একমাত্র রেহাই মিলতে পারে যদি ওটিকে নির্বিবাদে বাড়তে দেওয়ার অভ্যাসটি বজায় রাখা যায়| অনেক মুসলিমকে দেখেছি এই সমস্যাটার মোকাবিলা করার জন্যে গোঁফ উড়িয়ে শুধু দাড়ি লম্বা করতে (এর পেছনে কি কোনো ধর্মীয় কারণ আছে? হতেও পারে| একাধিক মানুষের মুখে শুনেছি যে ইসলাম নাকি সবথেকে বিজ্ঞানসম্মত ধর্ম| তাতে হয়তো পুরুষের এই দ্বিবিধ সমস্যার এই বিশেষ সমাধান করে দেওয়া আছে|), কিন্তু আমার যেহেতু ওই লুক-টা অসহ্য লাগে, তাই ওই বিশেষ সমাধানটাও আমার কোনোকালেই মনঃপূত হয়নি| এদিকে শীতের সকালে রোজ এই হাঙ্গামা আর পোষাচ্ছিলো না| তাই কাল রাতে শুতে যাওয়ার আগে এর সমাধান ভাবার চেষ্টা করছিলাম|

আমার এয়ারফোর্স প্রত্যাগত বাবা এই সমস্যার সমাধান করেছিলেন দাড়ি ও গোঁফ দুইই কামিয়ে| সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়, উত্তম কুমার, সৌরভ গাঙ্গুলি: এঁরা প্রত্যেকেই সেই পথেই হেঁটেছেন| কিন্তু এঁদের মুখের এমন একটা ব্যাক্তিত্ব আছে যে গোঁফ ছাড়াও এঁদের ভালো লাগে| আমি গোঁফ কামালে নিজেই নিজের মুখের দিকে তাকাতে পারবো না, বাকিরা যে কী পরিমাণ হাসাহাসি করবে তা তো সহজেই অনুমেয়| অতঃপর একটিই উপায়: গোঁফ ও দাড়ি দুটিকেই অবাধে বাড়তে দেওয়া| এই সমাধানটা আমার বেশ পছন্দ হলো| একদিকে রবীন্দ্রনাথের শান্ত-সৌম্য মুখ, অন্যদিকে আমার একগাল দাড়ি দেখে শ্রীমতীর মেজাজ কেমন হবে, এই নিয়ে ভেবে বেশ মুচকি-মুচকি হেসে ঘুমের সাধনা করলাম| কিন্তু তারপর....?

কোনো একটা বই-এ পড়েছিলাম (এইসব নাম মনে রাখতে পারলে ফুটনোট-টীকা সহযোগে এগুলোকে প্রবন্ধ বানানো যেতো, কিন্তু আমার আলসেমি নিয়ে আর কীই বা বলার আছে?) যে স্বপ্নে নাকি অবচেতন মন আমাদের এমন অনেক সত্যের সন্ধান দেয়, যা আমরা সচেতন ভাবে ভাবতে পারিনা| ঠিক তাইই হলো কাল রাতের স্বপ্নে| আমার ক্রম-পশ্চাদগামী কেশরেখা (গোদা বাংলায়: রিসিডিং হেয়ারলাইন)-র কথাটা আমি খেয়াল রাখিনি বা রাখতে চাইনি| স্বপ্নে দেখলাম যে আমাকে দেখতে রবীন্দ্রনাথ নয়, শুভাপ্রসন্নের মতো দেখাচ্ছে!

ঘুম ভাঙার পর যে টুথব্রাশ-এর বদলে শেভিং রেজর হাতে উঠেছিলো, একে কি অস্বাভাবিক বলা যায়?

Monday, 1 December 2014

কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান: পূজাবার্ষিকী ২০১৪

আমাদের ছোটবেলায় সবথেকে সম্ভ্রমের চোখে যে শারদীয়া সংখ্যাটাকে দেখা হতো, সেটা হলো “কিশোর জ্ঞান বিজ্ঞান”| এখনকার ছোটরা এই পত্রিকাটিকে ঠিক কী চোখে দেখে তা আমার জানা নেই, কারণ, খুবই দুঃখের সঙ্গে হলেও স্বীকার করতেই হচ্ছে যে আমার চেনা-পরিচিতের মধ্যে আমি একটিও ‘ছোটো’ মানুষকে চিনি না (আমার মেয়ে সহ) যে পূজাবার্ষিকী পড়ে| তবে এই পত্রিকার এবছরের পূজাবার্ষিকী পড়ে আমার মতামত নিচে পেশ করলাম:
1.      যে পত্রিকার সবথেকে আকর্ষণীয় বিষয় হলো সতজিত রায়-এর “স্বপ্নদ্বীপ” (সুচিপত্রে তাও আবার ভুল বানানে ছাপা হয়েছে), সিদ্ধার্থ ঘোষ-এর “ঝন্টুমামার ছাঁকনি” আর সুধীন্দ্র সরকার-এর “প্রফেসর ব্রহ্ম ও কালোচিতা” [দুটিই এই পত্রিকার বছর ত্রিশেক পুরনো সংস্করণ থেকে নিয়ে আবার ছাপানো], তার অবস্থা নিয়ে নতুন কিছু বলার নেই|
2.      নতুন লেখকদের মধ্যে শান্তনু বসু-র “অনাদি অধিকারীর একোয়াস্কোপ” আর নবকুমার দাস-এর “বক্সা রহস্য” সম্পাদকীয় স্পর্শ পেলে আরও উপভোগ্য হতো, এবং এঁদের আরও লেখা পড়ার ইচ্ছে রইলো|
3.      রাজেশ বসু-র নানা “গুণ”-এর কথা এর আগে অন্যান্য লেখকদের কাছ থেকে জেনেছি, তবে যেটা সত্যিই কৌতূহল উদ্রেক করে সেটা হলো: কোন লবির জোরে এই লোকটির লেখা বাংলার প্রায় সব ক’টি পাবলিশিং হাউস ছেপেই চলে, যেখানে সত্যিকারের ভালো এবং পাঠক-সমাদৃত লেখা পড়ে থাকে ছাপাখানা আর সম্পাদকের টেবিলের মাঝের ব্ল্যাক হোল-এ?
4.      পার্থজিত গঙ্গোপাধ্যায় (ইনিও আর একজন “শক্তিশালী” লেখক, যাঁর সম্পূর্ণভাবে খড়-ভুষি-তুল্য লেখাও পত্র ভারতী থেকে বই আকারে প্রকাশিত)-কে খুব ঠান্ডা মাথায় বোঝানো দরকার যে মাধ্যমিকের জন্যে লেখা রচনা ছাপাতে হলে (এই সব বিদ্বদজনের যা লবি থাকে তাতে এঁদের ধোপার জন্যে বানানো তালিকাও ছাপা হবে) তাকে “বিজ্ঞানভিত্তিক উপন্যাস” বলে মিথ্যা-ভাষণের কোনো প্রয়োজন নেই| বাংলার অভাগা খোকাখুকুরা রচনা-জ্ঞানেই ওই লেখা পড়ে ফেলবে|

সামগ্রিকভাবে আমি এই কথাই বলবো যে গত বছরের শারদীয়া সংখ্যাতেও রাবিশ বোঝাই ছিলো, তবে সৈকত মুখোপাধ্যায়-এর নিপুণ “সোনালি পশম” আর অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী-র “নিয়ম যখন ভাঙে” পড়ে মুখ থেকে বেরিয়েছিলো: “বাঃ”| এবারের সংখ্যাটি পড়ে যা বেরিয়েছে তা লেখার কোনো প্রয়োজন নেই| আমি এই পত্রিকাটির শারদীয়া সংখ্যা আর পড়বো না|

Thursday, 20 November 2014

কিশোর ভারতী: শারদীয়া ১৪২১

এবারের শারদীয়া কিশোর ভারতী পত্রিকাটা অনেকদিন ধরে, বেশ ঠাণ্ডা মাথায় পড়ে, আজ শেষ করলাম|

পত্রিকাটির যে লেখাগুলো খুব-খুব ভালো লেগেছে সেগুলোর নাম এবং মন্তব্য আগে দেওয়া যাক: -

1.      ডাঃ সায়ন পালের গ্রাফিক নভেল “বঙ্কু ডাক্তার আর দক্ষিন রায়”: কিশোর ভারতীর মাধ্যমে পরিচিত হওয়া চরিত্রগুলোর এই দুর্দান্ত এডভেঞ্চার সত্যিই উপভোগ্য|
2.      ত্রিদিবকুমার চট্টোপাধ্যায়-এর “দ্বীপের নাম কালাডেরা”: জগুমামার আর একটি দুর্দান্ত এডভেঞ্চার যাতে বিজ্ঞান, রহস্য, আর হিংস্রতা মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে|
3.      অনুরূপ চক্রবর্তীর ছবি ও গল্পে স্রেফ ফাটাফাটি কমিক্স “মৌমাছি হইতে সাবধান”|
4.      অভিজ্ঞান রায়চৌধুরী-র “রহস্য যখন মাইক্রোস্কপিক”: কল্পবিজ্ঞান, সন্ত্রাসবাদ, রোমাঞ্চ, এবং প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে মানুষের লড়াই, এই চারটি রঙের সুতো দিয়ে যে ঠাসবুনোট নকশাটি লেখক তাঁর সহজ অথচ স্মার্ট ভাষায় গেঁথেছেন, তার বর্ণনা দিতে পারবো না, শুধু সব্বাইকে এটি পড়তে বলবো|
5.      হিমাদ্রিকিশোর দাশগুপ্তের “কত কক্ষে কাগজ পোড়ে”: এডভেঞ্চার সাহিত্যের জন্যে যে লেখকের এমন নামযশ, তাঁর কলমে ভারতের ইতিহাসের এক রক্তক্ষয়ী এবং বিভীষিকাময় অধ্যায় এতোটাই সজীব ও বাস্তব হয়ে চোখের সামনে ফুটে উঠছিলো এই উপন্যাসটি পড়ার সময়, যে মাঝে-মাঝে সংশয় জাগছিলো, ইনিই সেই লেখক কি না| অতুলনীয় লেখা|
6.      ডাঃ শ্যামল চক্রবর্তী-র “বাঙালি ডাক্তারের ওষুধ আবিষ্কার”: এক অবহেলিত ও উপেক্ষিত বাঙালির বিজ্ঞান সাধনা ও তাঁর আবিষ্কারকে ধুলো ঝেড়ে আমাদের সবার সামনে আনার জন্যে লেখকের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাই| এই লেখাটি সব্বার পড়া উচিত| তরুণ বন্দোপাধ্যায়ের “বিজ্ঞানী সন্ন্যাসী”-ও একই কারণে বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য|

এবার বলি সেগুলোর কথা যেগুলো ভালো লেগেছে, কিন্তু বারবার পড়ার মতো বলে মনে হয়নি: -
1.      শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়-এর “অষ্টাঙ্গপুরের বৃত্তান্ত”: পুরোপুরি না হলেও শীর্ষেন্দু এই গল্পের মাধ্যমে তাঁর জাদুকরি কলমের কিছুটা ঝলক আবার দেখিয়েছেন| আশা করা যায় যে ওনার কলম এবার পুরনো ফর্ম খুঁজে পাবে|
2.      চন্ডী লাহিড়ীর কমিক্স “জিরাফ কথা বললো”|
3.      ছড়া-কবিতা: এই অংশটা যদিও খুব ছোটদের কথা ভেবেই সাজানো হয় (যদিও আজকের ছোটরা ছড়া পড়ে কি না, সেই নিয়ে আমার প্রভূত সংশয় আছে), কিন্তু এর লেখাগুলোয় এমন একটা সরল আর অকৃত্রিম খুশির ভাব আছে, যেটা রক্ত আর হিংস্রতার মাঝে আমার বড্ড ভালো লেগেছে|
4.      তপন বন্দোপাধ্যায়-এর “সন্ন্যাসীস্যার ও ঘোড়াভূত”|
5.      জুরান নাথের চিত্রকাহিনি “বগলা এন্ড কোং”|
6.      সৈকত মুখোপাধ্যায়-এর “জিংকো একা জঙ্গলে”|
7.      বিনোদ ঘোষাল-এর “ভেকুর কেরামতি”|
8.      স্বপন বন্দোপাধ্যায়-এর “দীপেশ এবং তার দিদি”|
9.      নির্বেদ রায়-এর “জন্মদিনের ‘উপহার’”|
10.  সুদর্শন সেনশর্মা-র “দেড় কিলো রাবড়ি, পাঁচটি আনারস এবং...”|
11.  কমলবিকাশ বন্দোপাধ্যায়-এর “11 -এর জালে নিল আর্মস্ট্রং”|
12.  কৌশিক মজুমদার-এর “এক অবিশ্বাস্য সংকেত”|
13.  জয়ন্ত দে-র “খড়ের বাছুর”|
14.  অশোককুমার সেনগুপ্তের “চরণদাসের গৃহত্যাগ”|
15.  ঝিমলি মুখার্জি পাণ্ডে-র “রাজরহস্য”|
16.  দীপান্বিতা রায়-এর “ডুপ্লিকেট চাবি”|
কুমকুম সমাদ্দারের “ভাসা গুড়গুড়ের লাটের পথে” গল্পটি সুলিখিত, কিন্তু আজ থেকে তিরিশ বছর আগের কোনো শারদীয়া পত্রিকাতেই লেখাটি মানাতো|

পত্রিকাটির যে লেখাগুলো পড়ে তাদের লেখক/লেখিকাদের বয়কট করার বাসনা জেগেছে সেগুলো নিয়ে আমি আলাদা করে কোনো মন্তব্য করবো না| লেখাগুলোর প্রসঙ্গে একটাই কথা বলার আছে: সম্পাদক যদি লেখকদের নাম বা খুঁটির জোর ছাড়া, অন্য কোনো কারণে এই লেখাগুলোকে এই পত্রিকার অন্তর্ভুক্ত করে থাকেন, তাহলে তাঁর অবিলম্বে কিছুদিনের জন্যে বনবাসে গিয়ে মাথা সাফ করে আসা অত্যন্ত প্রয়োজন| এই লেখাগুলো হলো: -
1.      সমরেশ মজুমদারের “অর্জুন এবং কৌটোর প্রেত”|
2.      প্রফুল্ল রায়ের “রামভরোসার মোটরগাড়ি” (দ্বিতীয় ভাগ)|
3.      কাবেরী রায়চৌধুরীর “রাসেলের বাণিজ্যযাত্রা”|
4.      অনীশ দেব-এর “গোলাপি, নরম এবং ঠান্ডা”|
5.      শান্তিপ্রিয় বন্দোপাধ্যায়-এর “মৃত্যুপুরী”|
6.      কিন্নর রায়-এর “সামিটের আগে”|
7.      বিকাশ মুখার্জি-র “অভিজ্ঞতা”|

যে লেখাগুলো পড়ে ভালো বা মন্দ, কোনো রকম ভাবনাই আলাদাভাবে মনে আসেনি, সেগুলোর কথা লিখছি না| এছাড়া যে লেখাগুলো ঘোষিত ভাবেই সংশ্লিষ্ট লেখকদের [যাঁদের ‘সেলিব্রিটি’ নাম দিয়ে ভূষিত করা হয়েছে] নামের জোরে (এবং খুব সম্ভবত আজকের কর্কটরোগাক্রান্ত বাংলায় ভাঙচুরের হাত থেকে সুসজ্জিত শো-রুমটিকে বাঁচাতে) এই বই-এ স্থান পেয়েছে এবং যেগুলো না পড়লে কিছুমাত্র ক্ষতি হবে না, সেগুলোর কথাও উল্লেখ করার দরকার নেই|


তাহলে শেষ বিচারে আমার মূল্যায়ণ কী? অচল মুদ্রার তুলনায় যে পত্রিকায় সচল টাকা বেশি, যার মাঝে কয়েকটি বার-বার পড়ার মতো মণিমুক্তো-ও, সেই পত্রিকাকে মন খুলেই ভালো বলা উচিত| আমিও বলছি: শারদীয়া কিশোর ভারতী আমার ভালো লেগেছে, তবে ২০১৬-র পরেও যদি ‘সেলিব্রিটি’-ঘেঁষা ‘সাহিত্য’ (??) এই পত্রিকায় দেখি তবে আর পত্রিকা না কিনে বইমেলায় বই-আকারে আলাদা ভাবেই ভালো লেখাগুলো কিনতে হবে|